বাংলাদেশের প্রতিটি শহর, উপজেলা এমনকি গ্রামের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, মোবাইল অপারেটর, ই-কমার্স, হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় সবার বিজ্ঞাপনের প্রধান ভরসা এখন মেটার (ফেসবুক-ইনস্টাগ্রাম) ও গুগলের (ইউটিউব-সার্চ) ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম। প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার বিজ্ঞাপন বিল বাংলাদেশ থেকে বিদেশে পরিশোধ হচ্ছে। এসব লেনদেনের বিপরীতে সরকার ভ্যাটও আদায় করছে। কিন্তু রূপালী বাংলাদেশের কয়েক মাসের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এক বিস্ময়কর বাস্তবতা।
সরকার জানে মেটা ও গুগল কত ভ্যাট দেয়, কিন্তু তারা বাংলাদেশে প্রকৃতপক্ষে কত টাকার ব্যবসা করছে, বিজ্ঞাপন থেকে কত আয় করছে কিংবা বছরে ঠিক কত বৈদেশিক মুদ্রা দেশ থেকে এসব প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচ্ছে তার কোনো নির্ভুল ও সমন্বিত সরকারি হিসাব নেই।
বাংলাদেশ ব্যাংক, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর), বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি), কর বিশেষজ্ঞ, বিজ্ঞাপন সংস্থা এবং প্রযুক্তি খাতের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দেখা গেছে, তথ্য বিভিন্ন সংস্থার কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকলেও কোনো একক প্রতিষ্ঠান দেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারের প্রকৃত আকার, বিদেশি প্ল্যাটফর্মগুলোর প্রকৃত আয় কিংবা সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ চিত্র তুলে ধরতে পারে না। কর বিশেষজ্ঞদের মতে, এই তথ্যগত শূন্যতা শুধু কর প্রশাসনের নয়; বরং বৈদেশিক মুদ্রা ব্যবস্থাপনা, প্রতিযোগিতা নীতি এবং ডিজিটাল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ।
আন্তর্জাতিক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিশ্লেষণকারী প্রতিষ্ঠান ডিমান্ডসেজ ও নেপোলিয়নক্যাটের ২০২৬ সালের জুন মাসের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে ফেসবুকের সম্ভাব্য ব্যবহারকারী প্রায় ৭ কোটি ৭০ লাখ, ইউটিউবের প্রায় ৭ কোটি, টিকটকের ৫ কোটি ৬২ লাখ এবং ইনস্টাগ্রামের প্রায় ১ কোটি ১৪ লাখ।
গুগল বাংলাদেশে তাদের ব্যবহারকারীর সংখ্যা প্রকাশ না করলেও দেশের ইন্টারনেট ব্যবহারকারী এবং সার্চ ইঞ্জিনের বাজার হিস্যা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে গুগলের সক্রিয় ব্যবহারকারী আনুমানিক ৮ থেকে ১০ কোটির মধ্যে। এসব পরিসংখ্যানই প্রমাণ করে, ব্যক্তি থেকে করপোরেট সব পর্যায়ে বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ব্যবহার এবং নির্ভরতা দ্রুত বেড়েছে। কিন্তু এসব প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশ থেকে বছরে ঠিক কত আয় করছে বা কত বৈদেশিক মুদ্রা বাইরে নিয়ে যাচ্ছে, তার কোনো একক সরকারি বা আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যান নেই। বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) কিংবা অন্য কোনো আন্তর্জাতিক সংস্থা দেশভিত্তিক এ ধরনের তথ্য প্রকাশ করে না। এর কারণ, মেটা, গুগলসহ অধিকাংশ বহুজাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান তাদের আর্থিক প্রতিবেদন দেশভিত্তিক নয়; বরং অঞ্চলভিত্তিক (যেমন এশিয়া-প্যাসিফিক) প্রকাশ করে। ফলে বাংলাদেশ থেকে তাদের প্রকৃত আয় নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে মেটা প্রতিবছর অঞ্চলভিত্তিক ‘অ্যাভারেজ রেভিনিউ পার ইউজার’ বা ব্যবহারকারীপ্রতি গড় আয়ের তথ্য প্রকাশ করে।
সেই তথ্য, বাংলাদেশের ব্যবহারকারীর সংখ্যা এবং একাধিক ডিজিটাল মার্কেটিং বিশেষজ্ঞ ও বিজ্ঞাপন সংস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাংলাদেশ থেকে মেটার (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) আনুমানিক বার্ষিক বিজ্ঞাপন আয় ১৪ থেকে ১৮ কোটি মার্কিন ডলার (প্রায় ১,৭০০ থেকে ২,১০০ কোটি টাকা) হতে পারে। সে হিসাবে বাংলাদেশে মেটার ব্যবহারকারীপ্রতি গড় বার্ষিক আয় প্রায় ২ দশমিক ৫ মার্কিন ডলারের কাছাকাছি।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) ভ্যাট রিটার্ন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মেটা সরাসরি ব্যাংকিং চ্যানেলে যে ভ্যাট দেয়, সেই আইনি হিসাব অনুযায়ী তাদের আয় অনেক কম। বাংলাদেশ থেকে ভ্যাট নিবন্ধন (বিন) নেওয়ার পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ অর্থবছরে মেটা (তৎকালীন ফেসবুক আয়ারল্যান্ড লিমিটেড) প্রায় ৩২ কোটি ৪০ লাখ টাকা ভ্যাট জমা দেয়। ওই অর্থবছরে গুগল, অ্যামাজন, নেটফ্লিক্সসহ সব বড় টেক জায়ান্ট মিলে মোট ভ্যাট দিয়েছিল ৫৩ কোটি টাকা। ২০২২-২৩ থেকে পরবর্তী অর্থবছরগুলোতে মেটার ভ্যাট প্রদানের হার কিছুটা বেড়ে গড়ে ৪০ কোটি থেকে ৫০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়। অর্থাৎ এই তথ্যের মাধ্যমে মাত্র ৩০০-৪০০ কোটি টাকার ব্যবসার ইঙ্গিত দেয় মেটা।
অনুসন্ধানে একাধিক বিজ্ঞাপন সংস্থা, ব্যাংকার ও কর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, মেটার বিজ্ঞাপন বিলের একটি অংশ বৈধ আন্তর্জাতিক কার্ড ও অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলে পরিশোধ হলেও, কিছু লেনদেন বিদেশি এজেন্সি, তৃতীয় পক্ষের অ্যাকাউন্ট বা অবৈধ উপায়ে (যেমন হুন্ডি) সম্পন্ন হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এ ধরনের লেনদেনের পরিমাণ সম্পর্কে কোনো সরকারি পরিসংখ্যান নেই।
ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের বাজারের বড় অংশ মেটা ও গুগলের দখলে
বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেস (বেসিস), বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় মিডিয়া বায়িং এজেন্সি এবং ডিজিটাল বিজ্ঞাপন খাতসংশ্লিষ্টদের তথ্য বিশ্লেষণ করে রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে দেখা যায়, বর্তমানে দেশের ডিজিটাল বিজ্ঞাপন বাজারের আকার প্রায় ৫,০০০ থেকে ৬,০০০ কোটি টাকা। এই বাজারের বড় অংশই নিয়ন্ত্রণ করছে মেটা (ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রাম) এবং অ্যালফাবেটের মালিকানাধীন গুগল (সার্চ, ইউটিউব, ডিসপ্লে ও ইন-অ্যাপ বিজ্ঞাপন)।
একাধিক বিজ্ঞাপন সংস্থা ও বাজারসংশ্লিষ্টদের মতে, ইউটিউব বিজ্ঞাপন, গুগল সার্চ, ডিসপ্লে বিজ্ঞাপন এবং মোবাইল অ্যাপভিত্তিক প্রচারণার কারণে বাংলাদেশে গুগলের বার্ষিক বিজ্ঞাপন আয় আনুমানিক ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ কোটি টাকার মধ্যে হতে পারে। তবে এই হিসাব কোম্পানির প্রকাশিত কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য নয়; বরং বাজার বিশ্লেষণ ও শিল্পসংশ্লিষ্টদের মূল্যায়নের ভিত্তিতে করা অনুমান।
অন্যদিকে, ২০২১ সালে বাংলাদেশে ভ্যাট নিবন্ধন নেওয়ার পর থেকে গুগল নিয়মিত ভ্যাট রিটার্ন দাখিল করছে। তবে এনবিআরের নথিতে প্রতিফলিত করযোগ্য লেনদেনের পরিমাণ বাজারের আনুমানিক আকারের তুলনায় অনেক কম।
এক লাখ ডিজিটাল গ্রাহক হলেই করযোগ্য উপস্থিতি
বিদেশি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত আয় নির্ধারণ এবং করের আওতায় আনতে বড় ধরনের আইনি পরিবর্তন এনেছে সরকার। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এখন মেটা, গুগল, অ্যামাজনসহ আন্তর্জাতিক ডিজিটাল সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম পর্যালোচনায় বিশেষ ভ্যাট অডিট এবং তথ্য যাচাইয়ের উদ্যোগ নিয়েছে। ২০২৬ সালের অর্থ আইনের মাধ্যমে আয়কর আইনে ‘স্থায়ী প্রতিষ্ঠানের’ সংজ্ঞা সম্প্রসারণ করা হয়েছে।
নতুন বিধান অনুযায়ী, বাংলাদেশে কোনো বিদেশি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের এক লাখ বা তার বেশি ডিজিটাল গ্রাহক বা অনলাইন সাবস্ক্রাইবার থাকলে, তাদের বাংলাদেশে করযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে বলে বিবেচনা করা হবে। চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে এই বিধান কার্যকর হয়েছে।
কর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এসএমএসি অ্যাডভাইজরি সার্ভিসেসের পরিচালক স্নেহাশীষ বড়ুয়া রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ থেকে ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের পেছনে প্রতিবছর বিপুল অর্থ ব্যয় হলেও টেক জায়ান্টগুলোর জমা দেওয়া ভ্যাট রিটার্নে তার পুরো প্রতিফলন দেখা যায় না’। তার ভাষ্য, অনুমোদিত ব্যাংকিং চ্যানেলের পাশাপাশি বিদেশি এজেন্সি, তৃতীয় পক্ষের পেমেন্ট বা অবৈধ চ্যানেলের (যেমন হুন্ডি) মাধ্যমে কিছু লেনদেন সম্পন্ন হওয়ায় এসব অর্থের একটি অংশ সরকারি নথিতে প্রতিফলিত হয় না।
এ বিষয়ে এনবিআরের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের সহায়তায় অনুমোদিত ডিলার (এডি) ব্যাংকের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক কার্ডে সম্পন্ন হওয়া লেনদেনের তথ্য বিশ্লেষণ করা হচ্ছে, যাতে ফেসবুক, ইউটিউবসহ বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের প্রকৃত বিজ্ঞাপন ব্যয় নির্ধারণ করা যায়। একই সঙ্গে ওএইসিডিসহ আন্তর্জাতিক কর কাঠামো পর্যালোচনা করে বাংলাদেশে সরাসরি অফিস না থাকলেও উল্লেখযোগ্য ডিজিটাল উপস্থিতির ভিত্তিতে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ওপর আয়কর আরোপের বিষয়টি বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে’।
তবে শতভাগ ডিজিটাল রাজস্ব করের আওতায় আনতে শুধু ভ্যাট আদায় যথেষ্ট নয়; এর জন্য কার্যকর তথ্য বিনিময়, ব্যাংকিং চ্যানেলের স্বচ্ছতা এবং আন্তর্জাতিক কর সহযোগিতা জোরদার করাও প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।
বিপুল অর্থ ব্যয় করছে বাংলাদেশি কোম্পানিগুলো
বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশি করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে ঠিক কত টাকা ব্যয় করছে তার কোনো সরকারি তথ্য নেই। এই হিসাব বের করতে দেশের শীর্ষস্থানীয় কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক প্রতিবেদন, ডিজিটাল মার্কেটিং সংস্থার তথ্য, মেটার অ্যাড লাইব্রেরি এবং সংশ্লিষ্ট খাতের একাধিক বিশেষজ্ঞের সঙ্গে কথা বলেছে রূপালী বাংলাদেশ।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, বাণিজ্যিক গোপনীয়তার কারণে ইউনিলিভার, গ্রামীণফোন, প্রাণ-আরএফএল, স্কয়ার, বিকাশ কিংবা নগদের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের বার্ষিক প্রতিবেদনে ফেসবুক বা গুগলে কত অর্থ ব্যয় করে, তার আলাদা হিসাব প্রকাশ করে না। বরং এসব ব্যয় সেলস অ্যান্ড মার্কেটিং, বিজ্ঞাপন ও প্রচার বাবদ খরচ শিরোনামে একত্রে দেখানো হয়। ফলে কোন অংশ দেশীয় গণমাধ্যমে এবং কোন অংশ বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ব্যয় হচ্ছে, তা সরকারি বা প্রকাশ্য নথি থেকে নির্ণয় করা সম্ভব নয়।
তবে একাধিক ডিজিটাল মার্কেটিং এজেন্সি, মিডিয়া বায়িং প্রতিষ্ঠান এবং করপোরেট মার্কেটিং কর্মকর্তাদের তথ্য বিশ্লেষণে রূপালী বাংলাদেশের হিসাব বলছে, দেশের বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো এখন তাদের বিজ্ঞাপন বাজেটের উল্লেখযোগ্য অংশই ফেসবুক, ইউটিউব ও গুগল অ্যাডসে ব্যয় করছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া আনুমানিক হিসাব অনুযায়ী, গ্রামীণফোন বছরে প্রায় ২০-৩০ কোটি, রবি ১২-১৮ কোটি, বাংলালিংক ৮-১২ কোটি, ইউনিলিভার বাংলাদেশ ১৫-২২ কোটি, প্রাণ-আরএফএল ১৮-২৫ কোটি, স্কয়ার গ্রুপ ১৫-২২ কোটি, নগদ ১৫-২৫ কোটি, বিকাশ ১২-২০ কোটি টাকা ব্যয় করছে। শুধু এই কয়েকটি প্রতিষ্ঠানই বছরে শত শত কোটি টাকা বিদেশি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে বিজ্ঞাপনের জন্য ব্যয় করছে।
অথচ এসব অর্থের কত অংশ বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশে যাচ্ছে, কত অংশের ওপর ভ্যাট ও কর আদায় হচ্ছে কিংবা কত অংশ অনিয়ন্ত্রিত লেনদেনের মাধ্যমে পরিশোধ করা হচ্ছে- তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি হিসাব নেই।
এ বিষয়ে গ্রামীণ ফোনের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসির আজমান বলেন, ‘আমরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে শুধু বিজ্ঞাপনের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে দেখি না। এটি গ্রাহকসেবা এবং নতুন ডিজিটাল সেবা মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম।’
প্রাণ-আরএফএল গ্রুপের চেয়ারম্যান ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আহসান খান চৌধুরী বলেন, ‘গ্রাম থেকে শহর সব জায়গায় এখন স্মার্টফোন ব্যবহারকারী রয়েছে। তাই নতুন পণ্যের প্রচারে ফেসবুক ও ইউটিউব সবচেয়ে কার্যকর এবং দ্রুত মাধ্যম হয়ে উঠেছে।’
উত্তর দেয়নি গুগল-মেটা
বাংলাদেশে বর্তমানে মেটার বিজ্ঞাপনসেবা দুটি প্রধান চ্যানেলের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। এর একটি হলো মেটার ম্যানেজড পার্টনার রোর গ্লোবাল, যারা তাদের স্থানীয় সহযোগী প্রতিষ্ঠান রোর বাংলার মাধ্যমে বাংলাদেশি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানকে স্থানীয় মুদ্রায় (টাকায়) বিলিং সুবিধাসহ বিজ্ঞাপনসেবা দিয়ে থাকে। এ ছাড়া মার্কেটের বিডি, এনজিটালসহ কয়েকটি ডিজিটাল মার্কেটিং প্রতিষ্ঠান মেটার সার্টিফায়েড বিজনেস পার্টনার হিসেবে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে বিজ্ঞাপন ক্যাম্পেইন পরিচালনা করে।
জানতে চাইলে রোর গ্লোবালের চিফ মার্কেটিং অফিসার উমাইর ওয়ালিদ রূপালী বাংলাদেশকে জানান, বাংলাদেশ থেকে মেটার মোট আয় বা রাজস্বের কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
বাংলাদেশে মেটা বছরে কত ভ্যাট পরিশোধ করে- এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এ বিষয়ে সঠিক তথ্য জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) দিতে পারবে’।
তিনি আরও বলেন, আন্তর্জাতিক ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ডলারে বিজ্ঞাপন বুস্ট করার ক্ষেত্রে সরকারের নির্ধারিত ভ্যাট ও প্রযোজ্য কর যথাযথভাবে পরিশোধ না করলে অ্যাকাউন্ট ব্লক হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তাই বৈধ ব্যাংকিং চ্যানেল ও অনুমোদিত পার্টনারের মাধ্যমে বিজ্ঞাপন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ থেকে মেটার বার্ষিক আয়, বিজ্ঞাপন রাজস্ব, ভ্যাট পরিশোধ এবং ব্যবহারকারীভিত্তিক ব্যবসার আকার সম্পর্কে জানতে চেয়ে মেটার এশিয়া-প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলের জনসংযোগ (পিআর) টিমের কাছে একাধিকবার ই-মেইল পাঠানো হলেও প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।
অন্যদিকে, বাংলাদেশে গুগল অ্যাডস এবং গুগলের বৈশ্বিক অ্যাড নেটওয়ার্কের স্থানীয় বিলিং ও পেমেন্ট ক্লিয়ারেন্সে অন্যতম অফিসিয়াল পার্টনার হিসেবে কাজ করছে আলেফ গ্রুপ। তাদের মাধ্যমে বাংলাদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো স্থানীয় ব্যাংকিং চ্যানেল ব্যবহার করে ভ্যাট ও কর পরিশোধ সাপেক্ষে গুগলে বিজ্ঞাপনের অর্থ পাঠাতে পারে। তবে গুগলের সঙ্গে নন-ডিসক্লোজার অ্যাগ্রিমেন্ট (এনডিএ) বা গোপনীয়তা চুক্তির কারণে বাংলাদেশ থেকে গুগলের মোট আয় বা লেনদেনের তথ্য প্রকাশে রাজি হয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বাংলাদেশে গুগলের বিজ্ঞাপন আয়, মোট ব্যবসা, কর ও ভ্যাট পরিশোধের তথ্য জানতে গুগলের সিঙ্গাপুরভিত্তিক জনসংযোগ টিমের কাছেও প্রশ্ন পাঠানো হয়। জবাবে গুগল জানায়, বাংলাদেশভিত্তিক আয় বা বিজ্ঞাপন রাজস্বের কোনো পৃথক পাবলিক অডিট রিপোর্ট তারা প্রকাশ করে না। অর্থাৎ, কয়েক মাসের অনুসন্ধানে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা, অনুমোদিত পার্টনার এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কথা বলেও বাংলাদেশ থেকে মেটা ও গুগল বছরে ঠিক কত আয় করছে তার নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ হিসাব পাওয়া যায়নি।

