ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন উদ্যোগ নিয়ে রাশিয়ার আলোচনার দিনদুয়েক আগে মস্কোতে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্টর অরবান। ইউরোপে পুতিনের সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত অরবান বহুদিন ধরেই ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) অবস্থানকে চ্যালেঞ্জ করে রুশবিরোধী সংহতি দুর্বল করে আসছেন।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি এ খবর জানিয়েছে।
রুশ রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের সম্প্রচারে দেখা গেছে, পুতিন অরবানকে বলেছেন, ইউক্রেন পরিস্থিতিতে আপনার ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান আমরা জানি।
বুদাপেস্টকে সম্ভাব্য যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া শীর্ষ বৈঠকের স্থল হিসেবে প্রস্তাব দেওয়ার জন্য তিনি অরবানকে ধন্যবাদ জানান। পুতিন দাবি করেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এ প্রস্তাবে সম্মতি জানিয়েছেন। গত মাসে বুদাপেস্টে এ ধরনের একটি ‘শান্তি সম্মেলন’-এর চিন্তা সামনে এলেও রুশপক্ষ আপসহীন অবস্থান নেওয়ায় তা স্থগিত হয়ে যায়।
এপ্রিলের নির্বাচনে অরবানের ফিদেজ পার্টি ১৫ বছরে প্রথমবারের মতো পরাজয়ের ঝুঁকিতে রয়েছে। ট্রাম্প-পুতিন বৈঠক আয়োজন করতে পারলে তার পুনর্নির্বাচন সম্ভাবনা বাড়তে পারে। অরবান সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাইয়ে মস্কো সফর করেছিলেন। তিনি নিয়মিতভাবে ইইউর রুশ জ্বালানি নিষেধাজ্ঞার প্রচেষ্টা ঠেকিয়ে দিয়েছেন এবং এই সফরকে স্লোভাকিয়া ও সার্বিয়াসহ হাঙ্গেরির শীতকালীন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিতের কূটনৈতিক প্রচেষ্টার দ্বিতীয় ধাপ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
এ মাসের শুরুতে ওয়াশিংটনে তিনি রুশ জ্বালানির ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা থেকে ছাড় পেয়েছেন। তবে শর্ত হলো তিনি ক্ষমতায় থাকাকালীনই এ সুবিধা কার্যকর থাকবে। ২০২২ সালে রাশিয়ার পূর্ণমাত্রার আগ্রাসন শুরুর পর থেকেই অরবান দাবি করে আসছেন, তিনি ‘শান্তির পক্ষে’। হাঙ্গেরিয়ান রেডিওকে তিনি বলেন, ইউরোপ ইউক্রেনে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
তিনি ট্রাম্পের ২৮ দফা শান্তি পরিকল্পনাকে দৃঢ়ভাবে সমর্থন করে চলেছেন। তার সরকার ও ঘনিষ্ঠ গণমাধ্যমগুলো ইউরোপীয় নেতাদের বিরুদ্ধে ‘যুদ্ধোত্তেজনা’ ছড়ানোর অভিযোগ তুলেছে। কারণ তারা ইউক্রেনের আপত্তি বিবেচনায় নিয়ে পরিকল্পনাটি সংশোধন করতে চান।
ক্রেমলিনের বৈঠকে অরবান ও পুতিনের সঙ্গে ছিলেন রুশ প্রেসিডেন্টের শীর্ষ সহযোগী ইউরি উশাকভ। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় রাশিয়ার প্রতিনিধি দলের প্রধান সদস্য।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্ট উরসুলা ফন ডার লিয়েনের কাছে পাঠানো এক চিঠিতে অরবান অবিলম্বে শর্তহীন শান্তি আলোচনার আহ্বান জানান এবং ইইউকে মস্কোর সঙ্গে সরাসরি আলাপ শুরুর পরামর্শ দেন। তিনি ইউক্রেনের জন্য নতুন ইইউ তহবিলের বিরোধিতা করেন এবং ইউক্রেনের প্রতিরক্ষা সহায়তায় রুশ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করে ব্যবহার করার প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
রাশিয়ার সঙ্গে আপোসের কোনও ইঙ্গিত না থাকায় এখন অরবানের মনোযোগ জ্বালানি নিরাপত্তায়। ওয়াশিংটনে যুক্তরাষ্ট্রের তরল প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) এবং মার্কিন পারমাণবিক জ্বালানি কেনার বিষয়ে চুক্তি করে তিনি রাশিয়ার ওপর নির্ভরতা কিছুটা কমিয়েছেন, যা রুশ স্বাগতিকদের বিরক্ত করতে পারে। তার যুক্তি, যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়া উভয় পক্ষের সঙ্গে চুক্তি না হলে পরের মাসে হাঙ্গেরিতে গরমের খরচ তিনগুণ হয়ে যাবে।
ইইউ চাপ দিচ্ছে ২০২৭ সালের মধ্যে রুশ জ্বালানি আমদানি বন্ধ করতে। মস্কো সফরের যেকোনও চুক্তিকেই ব্রাসেলসের নির্দেশনার বিপরীতে দাঁড়ানোর পথে ব্যবহার করতে পারেন অরবান। বর্তমানে হাঙ্গেরি রাশিয়া থেকে নেয় ৮০ শতাংশের বেশি তেল-গ্যাস এবং ১০০ শতাংশ পারমাণবিক জ্বালানি। যা রুশ বাজেটে বছরে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার অবদান রাখে।
মস্কোতে ‘চুক্তি’ করা খুব কঠিন নয় বলেই মনে করা হচ্ছে। ট্রাম্পের মতোই পুতিনও চান আগামী নির্বাচনে অরবান জিতুন। অরবানের আরেকটি কূটনৈতিক ‘সাফল্য’ তাই উভয় পক্ষের স্বার্থের পক্ষেই যাবে। গত সেপ্টেম্বর সোচির ভালদাই ফোরামে পুতিন অরবানকে প্রশংসা করে বলেন, ইউরোপে ‘জাতীয়তাবাদী রাজনৈতিক শক্তি’ শক্তিশালী হচ্ছে। পুতিনের ভাষায়, ইউরোপে এসব শক্তি আরও বাড়লে ইউরোপ পুনর্জন্ম লাভ করবে।




সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন