ভারতের পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের পর নতুন করে আলোচনায় এসেছে রাজনীতি, অপরাধ ও সম্পদের সমীকরণ। নির্বাচন পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘গণতান্ত্রিক সংস্কারের জন্য সমিতি’ (এডিআর) ও পশ্চিমবঙ্গ নির্বাচন ওয়াচের সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে উদ্বেগজনক নানা তথ্য।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে জয়ী ২৯৩ জনের মধ্যে ২৯২ জনের হলফনামা বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা গেছে, নির্বাচিত বিধায়কদের মধ্যে ১৯০ জনের বিরুদ্ধে কোনো না কোনো ফৌজদারি মামলা রয়েছে। অর্থাৎ নতুন বিধানসভার প্রায় ৬৫ শতাংশ সদস্যই অপরাধমূলক অভিযোগে অভিযুক্ত।
এর মধ্যে ১৭০ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে রয়েছে গুরুতর অপরাধের মামলা। এডিআরের ভাষ্য অনুযায়ী, যেসব অপরাধে পাঁচ বছর বা তার বেশি কারাদণ্ড হতে পারে, সেগুলোকে গুরুতর অপরাধ হিসেবে ধরা হয়েছে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে—খুন, খুনের চেষ্টা, অপহরণ, নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, দুর্নীতি ও জনস্বার্থবিরোধী অপরাধ।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ১৪ জন বিধায়কের বিরুদ্ধে খুনের মামলা রয়েছে। এ ছাড়া ৫৪ জনের বিরুদ্ধে খুনের চেষ্টার অভিযোগ রয়েছে। নারী নির্যাতনসংক্রান্ত মামলায় অভিযুক্ত ৬৩ জন বিধায়কের তথ্যও উঠে এসেছে প্রতিবেদনে। তাদের মধ্যে দুজনের বিরুদ্ধে ধর্ষণের অভিযোগ রয়েছে।
দলভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিজেপির নির্বাচিত ২০৬ জন বিধায়কের মধ্যে ১৫২ জনের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা রয়েছে। গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত বিজেপি বিধায়কের সংখ্যা ১৪১।
অন্যদিকে, তৃণমূল কংগ্রেসের ৮০ জন নির্বাচিত বিধায়কের মধ্যে ৩৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা রয়েছে এবং গুরুতর অভিযোগ রয়েছে ২৫ জনের বিরুদ্ধে। কংগ্রেসের নির্বাচিত দুই বিধায়কের বিরুদ্ধে কোনো মামলা নেই বলেও জানিয়েছে এডিআর।
এডিআর বলছে, ২০২০ সালে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট রাজনৈতিক দলগুলোকে নির্দেশ দিয়েছিল, অপরাধমূলক অতীত থাকা কাউকে প্রার্থী করলে তার কারণ প্রকাশ করতে হবে। পাশাপাশি কেন পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির কাউকে বেছে নেওয়া হয়নি সেটিও জানাতে হবে। তবে বাস্তবে রাজনৈতিক দলগুলো এখনো সেই সংস্কৃতি থেকে বের হতে পারেনি।
প্রতিবেদনে আরও উঠে এসেছে সম্পদের বৈষম্যের চিত্র। নতুন বিধানসভায় ১৭৮ জন বিধায়কের সম্পদের পরিমাণ ১ কোটি রুপির বেশি। অর্থাৎ প্রায় ৬১ শতাংশ বিধায়ক কোটিপতি। ২০২১ সালে এই হার ছিল ৫৪ শতাংশ।
সব বিধায়কের মোট ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ প্রায় ১ হাজার ৯১ কোটি রুপি। গড়ে প্রত্যেক বিধায়কের সম্পদের পরিমাণ প্রায় ৩ কোটি ৭০ লাখ রুপি। সবচেয়ে ধনী বিধায়ক হিসেবে উঠে এসেছে বিজেপির দিরিপ সাহার নাম। তার ঘোষিত সম্পদের পরিমাণ ৪৩ কোটির বেশি।
দলভিত্তিক গড় সম্পদের হিসাবেও রয়েছে বড় পার্থক্য। তৃণমূল কংগ্রেসের বিধায়কদের গড় সম্পদ প্রায় ৫ কোটি ৩০ লাখ রুপি। বিজেপি বিধায়কদের ক্ষেত্রে তা প্রায় ২ কোটি ৯০ লাখ রুপি। আর কংগ্রেসের দুই বিধায়কের গড় সম্পদ প্রায় ১৭ কোটি ৯০ লাখ রুপি।
শিক্ষাগত যোগ্যতার দিক থেকে ৬৩ শতাংশ বিধায়ক স্নাতক বা তার বেশি ডিগ্রিধারী। তবে নারী প্রতিনিধিত্বের চিত্র খুব একটা আশাব্যঞ্জক নয়। বিশ্লেষিত ২৯২ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ৩৭ জন নারী, যা মোট সদস্যের প্রায় ১৩ শতাংশ। ২০২১ সালের তুলনায় নারী প্রতিনিধিত্ব সামান্য কমেছে।
এডিআর মনে করছে, ভারতীয় রাজনীতিতে অপরাধ ও অর্থের প্রভাব ক্রমেই বাড়ছে। সংস্থাটি ভোটারদের প্রার্থীদের হলফনামা যাচাই করে সচেতনভাবে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন