ইরানের রাজধানী তেহরান থেকে গত ডিসেম্বরের শেষ দিকে শুরু হওয়া বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার’ ইরানি নিহত হয়েছেন বলে সম্প্রতি স্বীকার করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। তার এই স্বীকারোক্তিকে অনেকে আবার ‘অস্বাভাবিক’ বলছেন। কারণ অতীতে ইরানে হওয়া বিভিন্ন বিক্ষোভে নিহতের সংখ্যা নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরতই থেকেছেন খামেনি।
দেশটিতে চলমান অস্থিরতা, বিক্ষোভে ঠিক কী ঘটেছে এবং সামনে কী হতে পারে এসব বিষয়ে ইরান সরকার, বিদেশভিত্তিক বিরোধী গোষ্ঠী, বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বর্ণনায় বড় ধরনের পার্থক্য দেখা গেছে।
সার্বিক বিষয় নিয়ে সোমবার (১৯ জানুয়ারি) বিস্তারিত এক প্রতিবেদন করেছে সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
এখন পর্যন্ত যা যা জানা যাচ্ছে
অর্থনৈতিক অসন্তোষের জেরে গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাণিজ্যিক এলাকায় শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েক দিনের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে বড় ও ছোট শহরগুলোতে। পরবর্তীতে তা রূপ নেয় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা এবং গণমাধ্যম ছাড়াও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন সংবাদ সংস্থা ও প্রত্যক্ষদর্শীদের মতে, ৮ ও ৯ জানুয়ারির রাত ছিল সবচেয়ে ‘রক্তক্ষয়ী’।
ইরানের ফরেনসিক মেডিসিন সংস্থার প্রধান আব্বাস মাজেদি আরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমকে বলেন, নিহতদের মধ্যে অনেককে খুব কাছ থেকে বা ছাদ থেকে মাথা ও বুকে গুলি করা হয়, যার উদ্দেশ্য ছিল হত্যা নিশ্চিত করা। অন্য অনেককে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। নিহতদের বেশিরভাগই তরুণ ইরানি, যাদের অনেকের বয়স কুড়ির কোটায় ছিল বলেও জানা যায়।
৮ জানুয়ারির রাতে ইরানি কর্তৃপক্ষ ইন্টারনেট এবং মোবাইল সংযোগ পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করে দেয়, ফলে জরুরি পরিস্থিতিতেও উদ্ধারকারী সংস্থায় ফোন করা সম্ভব হয়নি।
আল জাজিরা বলছে, প্রায় দুই সপ্তাহের নজিরবিহীন ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের পর রোববার (১৮ জানুয়ারি) থেকে ধীরে ধীরে কিছু সংযোগ ফিরতে শুরু করে। তবে ৯ কোটিরও বেশি জনসংখ্যার দেশটির বেশিরভাগ মানুষ এখনো অনিশ্চয়তার মধ্যে আছেন।
এ ছাড়া রাস্তায় বিক্ষোভ এখন অনেকটাই স্তিমিত। নিরাপত্তা বাহিনীর ভারী অস্ত্রধারী হাজার হাজার সদস্য ইরানজুড়ে টহল ও চেকপোস্ট বসিয়েছে, বিশেষ করে তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের মতো স্পর্শকাতর এলাকায়।
রাষ্ট্র কী বলছে?
ইরানের রাজনৈতিক, সামরিক ও বিচার বিভাগীয় নেতারা প্রতিদিনই জোর দিয়ে বলছেন যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল এই বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে এবং তারা বিরোধীদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করেছে।
ইরানের সর্বোচ্চ নেতা খামেনি বলেন, ট্রাম্প একজন ‘অপরাধী’, যিনি একাধিকবার সরাসরি এই অস্থিরতায় সম্পৃক্ত হয়েছেন।
ইরান সরকারের দাবি, হাজার হাজার মানুষের মৃত্যুর জন্য রাষ্ট্রীয় বাহিনী নয়, বরং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের পক্ষে কাজ করা সশস্ত্র ও প্রশিক্ষিত ‘সন্ত্রাসীরা’ দায়ী। তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব গোষ্ঠী শান্তিপূর্ণ আন্দোলন ভণ্ডুল করতে মানুষকে গুলি ও ছুরিকাঘাত করেছে।
বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তারা বলেছেন, ‘দাঙ্গায়’ অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের দ্রুত বিচার করা হবে এবং কোনো ধরনের দয়া দেখানো হবে না। সুপ্রিম কোর্ট ও প্রসিকিউটর জেনারেলের দপ্তরর বিক্ষোভ-সংক্রান্ত মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য একটি যৌথ টাস্কফোর্স গঠনেরও ঘোষণা দিয়েছে।
বিদেশি পর্যবেক্ষকরা কী বলছেন?
বিদেশে অবস্থানরত সরকারবিরোধী ইরানি এবং পর্যবেক্ষক সংস্থাগুলোর দাবি, রাষ্ট্রীয় বাহিনীর হাতে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারী নিহত হয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্টস নিউজ এজেন্সি জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি মৃত্যুর ঘটনা নিশ্চিত হয়েছে এবং আরও ৪ হাজার ৩০০ জনের মৃত্যু তদন্তাধীন।
সংস্থাটি আরও বলেছে, বিক্ষোভে ২ হাজার ১০৭ জন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং ২৪ হাজারের বেশি মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
সংবাদ সংস্থা রয়টার্স একজন আঞ্চলিক ইরানি কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে জানিয়েছে, অন্তত পাঁচ হাজার মানুষ বিক্ষোভে নিহত হয়েছেন, যার মধ্যে প্রায় ৫০০ জন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য। প্রতিবেদনে বলা হয়, অধিকাংশ মৃত্যু উত্তর-পশ্চিম ইরানের কুর্দি-অধ্যুষিত এলাকায় ঘটেছে। তবে এসব তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি আল জাজিরা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গণমাধ্যমে আরও দাবি করা হয়েছে, নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে নিহতদের দাফনের অনুমতি দিতে পরিবারগুলোর কাছ থেকে তথাকথিত ‘বুলেট মানি’ দাবি করা হচ্ছে অথবা তাদের দিয়ে এমন নথিতে স্বাক্ষর করানো হচ্ছে যাতে উল্লেখ আছে যে নিহতরা বিক্ষোভকারী নয়, বরং আইআরজিসির বাসিজ বাহিনীর সদস্য ছিলেন। যদিও ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কী বলছে?
গত কয়েক মাস ধরে, বিশেষ করে গত জুনে হওয়া ১২ দিনের যুদ্ধের সময় থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের কর্মকর্তারা প্রকাশ্যে তেহরানের ধর্মীয় শাসনব্যবস্থা উৎখাতের কথা বলে আসছেন।
সাম্প্রতিক বিক্ষোভের চূড়ান্ত সময়ে ট্রাম্প ইরানিদের রাস্তায় থাকার আহ্বান জানান এবং ঘোষণা দেন যে ‘সহায়তা আসছে’। পরে অবশ্য ৮০০-এর বেশি বিক্ষোভকারীর পরিকল্পিত মৃত্যুদণ্ড স্থগিত হওয়ায় তিনি ইরানি নেতৃত্বের প্রতি ‘গভীর শ্রদ্ধা’র কথা জানান।
ট্রাম্পের এই দাবির প্রতিক্রিয়ায় তেহরানের প্রসিকিউটর আলি সালেহি শনিবার (১৭ জানুয়ারি) বলেন, ‘মার্কিন প্রেসিডেন্ট অনেক আজগুবি কথা বলেন’। ইরানের জবাব ‘দ্রুত ও প্রতিরোধমূলক’ হবে বলেও সতর্ক করেন তিনি।
তবে নিজের মন্তব্য থামাননি ট্রাম্প। শনিবার তিনি আবার খামেনির ৩৭ বছরের শাসনের অবসান দাবি করেন এবং তাকে ‘অসুস্থ মানুষ’ বলেও আখ্যা দেন।
এদিকে ইরানের বিক্ষোভ নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করা থেকে বিরতই আছেন ইসরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু।
সূত্র: আল জাজিরা

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন