তেহরানের সঙ্গে উচ্চ পর্যায়ের আলোচনা শেষ হয়েছে আমেরিকার। তবে আলোচনার আগেই ইরানে অবস্থানরত নিজেদের নাগরিকদের ‘অবিলম্বে দেশ ত্যাগের’ নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
শুক্রবার (৬ ফেব্রুয়ারি) ভোরে ইরানে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের ভার্চুয়াল দূতাবাস এক নিরাপত্তা সতর্কতায় এ আহ্বান জানায়।
নির্দেশনায় বলা হয়, মার্কিন নাগরিকরা যেন যুক্তরাষ্ট্র সরকারের সহায়তার ওপর নির্ভর না করে নিজ উদ্যোগে দ্রুত প্রস্থান পরিকল্পনা গ্রহণ করেন।
ওমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে নির্ধারিত আলোচনার ঠিক আগমুহূর্তে এই সতর্কতা জারি করা হয়।
এদিকে আজ শুক্রবার ওমানের রাজধানী মাসকটে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ আলোচনায় অংশ নেন। গত বছরের জুনে ইসরায়েলের সঙ্গে ১২ দিনব্যাপী যুদ্ধের পর এটিই দুই দেশের মধ্যে প্রথম আনুষ্ঠানিক কূটনৈতিক যোগাযোগ।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফ-এর প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রায় ছয় ঘণ্টাব্যাপী এই আলোচনা শেষে ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, ‘এই মুহূর্তের জন্য আলোচনা শেষ হয়েছে।’ ভবিষ্যতে আলোচনা কবে এবং কোথায় হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি।
তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনকে দেওয়া বক্তব্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি বলেন, উভয় পক্ষ আলোচনা চালিয়ে যাওয়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। তিনি এটিকে ‘ভালো সূচনা’ হিসেবে উল্লেখ করেন।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের প্রতিনিধিদের মধ্যে সরাসরি মুখোমুখি বৈঠকের কোনো ইঙ্গিত পাওয়া যায়নি। ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রকাশিত ছবিতে দেখা যায়, দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী বদর বিন হামাদ আল-বুসাইদি উভয় পক্ষের সঙ্গে আলাদা বৈঠক করেন।
ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, কূটনৈতিক ও তথ্যভিত্তিক আলোচনার মাধ্যমে ভবিষ্যতে চুক্তির ভিত্তি তৈরির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
এই আলোচনার পটভূমিতে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পারস্য উপসাগরে বিমানবাহী রণতরী আব্রাহাম লিংকনের নেতৃত্বে একটি বড় নৌবহর পাঠিয়েছেন, যাকে তিনি ‘বিশাল আর্মাডা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, আলোচনার ফল ব্যর্থ হলে সামরিক সংঘাতের ঝুঁকি বাড়তে পারে। র্যাপিডান এনার্জি গ্রুপের সভাপতি বব ম্যাকন্যালি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, আগামী দিন বা সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক শত্রুতায় জড়ানোর সম্ভাবনা প্রায় ৭৫ শতাংশ।
ওয়াশিংটনের প্রধান দাবি হলো, ইরানকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচি বন্ধ করতে হবে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত ধ্বংস করতে হবে, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করতে হবে, হামাস ও হিজবুল্লাহসহ আঞ্চলিক সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তা বন্ধ করতে হবে,
মার্কিন প্রেস সেক্রেটারি ক্যারোলিন লেভিট জানিয়েছেন, আলোচনার মূল লক্ষ্য হচ্ছে ইরানের ‘শূন্য পারমাণবিক সক্ষমতা’ নিশ্চিত করা।
অন্যদিকে, ইরান এসব দাবিকে তাদের সার্বভৌমত্বের ওপর ‘অগ্রহণযোগ্য হস্তক্ষেপ’ হিসেবে উল্লেখ করেছে। দেশটি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, যেকোনো সামরিক হামলার কঠোর জবাব দেওয়া হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের লক্ষ্যবস্তুতে পাল্টা আঘাত হানা হতে পারে।
ইরানের প্রধান মিত্র চীন জানিয়েছে, তারা তেহরানের অবস্থানকে সমর্থন করে এবং যুক্তরাষ্ট্রের ‘একতরফা আধিপত্যের’ বিরোধিতা করবে।
দীর্ঘ আট মাস আলোচনায় বিরতির কারণে দুই দেশের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে বলে মন্তব্য করেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তার মতে, এই অবিশ্বাস কাটিয়ে ওঠাই ভবিষ্যৎ সংলাপের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বিশ্লেষকদের ধারণা, আলোচনার ফলাফল অনিশ্চিত থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে উত্তেজনা ছড়াতে পারে।

