ইরানের রাজধানী তেহরানে বড় হয়ে ওঠা এক কিশোরী একসময় স্বপ্ন দেখতেন লেখক হওয়ার। কিন্তু সেই কিশোরীই পরে গণিতের জগতে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তিনি হলেন, মেরিয়াম মিরজাখানি, যিনি ২০১৪ সালে বিশ্বের অন্যতম মর্যাদাপূর্ণ গণিত পুরস্কার ফিল্ডস মেডেল জিতে প্রথম নারী হিসেবে নতুন ইতিহাস গড়েন।
১৯৭৭ সালের ৩ মে তেহরানে জন্মগ্রহণ করেন মেরিয়াম মিরজাখানি। ছোটবেলায় তিনি বই পড়তে খুব ভালোবাসতেন এবং ভবিষ্যতে লেখক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন। তবে স্কুলজীবনে ধীরে ধীরে গণিতের জটিল সমস্যার প্রতি তার আগ্রহ বাড়তে থাকে। পরে তিনি বুঝতে পারেন, গণিতের সমস্যা সমাধান করা যেন এক ধরনের ধাঁধা সমাধানের মতো আনন্দ দেয়।
তরুণ বয়সেই তার অসাধারণ প্রতিভার পরিচয় মেলে। ১৯৯৪ ও ১৯৯৫ সালে তিনি আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক জয় করেন। এর মধ্যে ১৯৯৫ সালে তিনি পূর্ণ নম্বর অর্জন করেন, যা তাকে বিশ্বের অন্যতম প্রতিভাবান তরুণ গণিতবিদ হিসেবে পরিচিত করে তোলে।
পরে তিনি তেহরানের শরীফ ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি থেকে গণিতে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন। উচ্চশিক্ষার জন্য এরপর যুক্তরাষ্ট্রে যান এবং ২০০৪ সালে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গণিতে পিএইচডি সম্পন্ন করেন।
পিএইচডি শেষ করার পর তিনি গবেষক হিসেবে কাজ শুরু করেন এবং পরে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষকতা করেন। প্রথমে প্রিন্সটন বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন এবং পরে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে গণিতের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন। এখানেই তিনি তার গুরুত্বপূর্ণ গবেষণাগুলো পরিচালনা করেন।
মিরজাখানির গবেষণা মূলত জ্যামিতি, টপোলজি এবং ডায়নামিক্যাল সিস্টেম নিয়ে ছিল। বিশেষ করে বাঁকানো পৃষ্ঠ বা জটিল জ্যামিতিক কাঠামোর গতি ও গঠন নিয়ে তার গবেষণা গণিতের জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। এই কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০১৪ সালে তাকে ফিল্ডস মেডেল প্রদান করা হয়, যা গণিতের ক্ষেত্রে ‘নোবেল পুরস্কার’ হিসেবে পরিচিত।
পুরস্কার পাওয়ার পর মিরজাখানি আশা প্রকাশ করেছিলেন, তার এই অর্জন বিশ্বের তরুণী বিজ্ঞানী ও গণিতবিদদের অনুপ্রাণিত করবে।
দুঃখজনকভাবে, মাত্র ৪০ বছর বয়সে ২০১৭ সালে স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন এই প্রতিভাবান গণিতবিদ। তবে তার গবেষণা ও সাফল্য আজও গণিতের জগতে গভীর প্রভাব রেখে চলেছে।
মেরিয়াম মিরজাখানি শুধু একজন অসাধারণ গণিতবিদ নন, তিনি নারী বিজ্ঞানীদের জন্য অনুপ্রেরণার এক শক্তিশালী প্রতীক। তার জীবন দেখিয়ে দিয়েছে, কৌতূহল, অধ্যবসায় এবং সৃজনশীল চিন্তা থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন