ঢাকা বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ওয়াশিংটনের নজর এখন মিয়ানমারের খনিজ সম্পদের দিকে

বিশ্ব ডেস্ক
প্রকাশিত: জুন ৩, ২০২৬, ০১:৩৭ এএম
ছবি : সংগৃহীত

মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পক্ষে দীর্ঘদিনের মার্কিন অবস্থান এখন পরিবর্তনের মুখে। বিশ্লেষকদের মতে, দেশটির বিরল খনিজ সম্পদের প্রতি আগ্রহ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পৃক্ততার নতুন প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে।

১৯৮৮ সালে মিয়ানমারের ছাত্র আন্দোলনকারীরা সামরিক শাসক নে উইনের সরকারের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করলে একটি গুজব ছড়িয়ে পড়ে যে যুক্তরাষ্ট্রের নৌবাহিনী তাদের সহায়তায় একটি যুদ্ধজাহাজ পাঠাবে। অনেক আন্দোলনকারী সেই আশায় প্রস্তুতি নেন। কেউ নৌকা ভাড়া করেন, কেউ বোমা আশ্রয়কেন্দ্র খনন করেন, আবার কেউ মার্কিন সেনাদের স্বাগত জানাতে প্ল্যাকার্ডও তৈরি করেন। তবে প্রত্যাশিত সহায়তা কখনোই আসেনি। যে জাহাজটির কথা বলা হচ্ছিল, সেটি সম্ভবত একটি মার্কিন বিমানবাহী রণতরী ছিল, যা কেবল নিয়মিত যাত্রাপথে ওই অঞ্চলের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল।

যদিও যুক্তরাষ্ট্র কখনো সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করেনি, তবু কয়েক দশক ধরে দেশটির রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় প্রশাসনই মিয়ানমারের গণতন্ত্রপন্থী শক্তিগুলোর প্রতি সমর্থন জানিয়ে এসেছে। ১৯৯৭ সাল থেকে বিভিন্ন পর্যায়ে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়, যার ফলে মিয়ানমার থেকে আমদানি এবং দেশটিতে মার্কিন বিনিয়োগ কার্যত বন্ধ হয়ে যায়।

একই সময়ে, যুক্তরাষ্ট্রের অর্থায়নে পরিচালিত গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা ও মানবিক সংগঠনগুলো দেশটির গণতন্ত্রপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে কাজ করে একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সমর্থন নেটওয়ার্ক গড়ে তোলে।

২০১০ সালের দিকে মিয়ানমার আধা-বেসামরিক শাসনে রূপান্তরিত হলে আন্তর্জাতিক মহলে আশাবাদ সৃষ্টি হয়। বিদেশি বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, পোশাকশিল্প সম্প্রসারিত হয়, শ্রমিক ইউনিয়ন বৈধতা পায় এবং বহু রাজনৈতিক বন্দী মুক্তি লাভ করেন।

২০১১ সালে তৎকালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিলারি ক্লিনটনের মিয়ানমার সফরকে অনেক নির্বাসিত নাগরিক দেশে ফেরার নিরাপদ সংকেত হিসেবে দেখেন। সে সময় গণতন্ত্রপন্থী নেত্রী অং সান সু চির সঙ্গে ক্লিনটনের সাক্ষাৎ ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পরবর্তীতে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ব্যক্তিত্বও মিয়ানমার সফর করেন, যা দেশটির রাজনৈতিক পরিবর্তনের প্রতি বৈশ্বিক সমর্থনের প্রতীক হিসেবে দেখা হয়।

তবে এই আশাবাদের মধ্যেও জাতিগত সংঘাত অব্যাহত ছিল। কাচিন ও রাখাইন অঞ্চলে সংঘর্ষ চলতে থাকে এবং রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সহিংসতার ফলে প্রায় সাত লাখ মানুষ বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়।

২০২১ সালে সামরিক বাহিনী নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করলে দেশজুড়ে ব্যাপক গণআন্দোলন শুরু হয়। একই সময়ে বিভিন্ন জাতিগত সশস্ত্র সংগঠন শক্তিশালী হয়ে ওঠে এবং জান্তাবিরোধী প্রতিরোধ আরও বিস্তৃত হয়।

পরবর্তী সময়ে যুক্তরাষ্ট্র মিয়ানমারের সীমান্তবর্তী এলাকায় সহায়তা পুনর্নির্দেশ করে। মার্কিন অর্থায়নে পরিচালিত সংবাদমাধ্যমগুলো সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে সংঘটিত ঘটনাগুলো তুলে ধরতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

এছাড়া হাজার হাজার আন্দোলনকর্মীকে শরণার্থী পুনর্বাসন, নিরাপদ আশ্রয় এবং অস্থায়ী সুরক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া হয়।

বিশ্লেষকদের মতে, বর্তমান মার্কিন প্রশাসন মিয়ানমার নীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এনেছে। মানবিক সহায়তা ও গণতন্ত্র-প্রচারমূলক বিভিন্ন কর্মসূচি সীমিত বা বন্ধ করা হয়েছে এবং মিয়ানমার-সংশ্লিষ্ট বহু বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তাকে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে।

ইয়াঙ্গুনে যুক্তরাষ্ট্রের দূতাবাসের সাবেক মিশন প্রধান সুসান স্টিভেনসনের ভাষ্য অনুযায়ী, বৈদেশিক সহায়তার বাজেটে বড় ধরনের কাটছাঁট করা হয়েছিল, যদিও পরে এর কিছু অংশ পুনর্বহাল করা হয়।

মার্কিন সহায়তা কমে যাওয়ার ফলে শরণার্থী শিবিরগুলোতে খাদ্য সরবরাহ আরও সীমিত হয়ে পড়ে। অনেক স্থানীয় ক্লিনিক বন্ধ হয়ে যায়, যার ফলে চিকিৎসাসেবার ওপর নির্ভরশীল শরণার্থীরা মারাত্মক সংকটে পড়েন।

অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত আন্তর্জাতিক সম্প্রচারমাধ্যমগুলোর কার্যক্রম সীমিত হয়ে যাওয়ায় স্বাধীন সংবাদপ্রবাহও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি, থাইল্যান্ডে কর্মরত মিয়ানমারের অভিবাসী শ্রমিকদের আইনি সুরক্ষা প্রদানকারী কিছু কর্মসূচিও বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।

পর্যবেক্ষকদের মতে, মিয়ানমারের বিরল খনিজ সম্পদ এখন যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্রে চলে এসেছে। ফলে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের প্রশ্নের পাশাপাশি অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থও মার্কিন নীতিনির্ধারণে ক্রমশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

অনেকের ধারণা, এই পরিবর্তনের ফলে সামরিক জান্তার সঙ্গে সম্পর্কের নতুন সমীকরণ তৈরি হতে পারে। একসময় যেখানে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছিল ওয়াশিংটনের প্রধান অগ্রাধিকার, সেখানে এখন খনিজ সম্পদ ও কৌশলগত স্বার্থকে ঘিরে নতুন বাস্তবতা সামনে আসছে।