বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম নতুন চালিকাশক্তি ই-কমার্স খাত। বিগত এক দশকে এ খাত দেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি (ঝগঊ) উদ্যোক্তাদের স্বাবলম্বী করার সবচেয়ে বড় মঞ্চে পরিণত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট খাতের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ই-কমার্স বাজারের বার্ষিক আকার প্রায় ২২ হাজার কোটি টাকা, যার ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভর করছে ৫ লক্ষাধিক উদ্যোক্তা এবং ২০ লক্ষাধিক মানুষের কর্মসংস্থান।
বর্তমান সরকারের মূল রূপকল্প এবং পরম সদিচ্ছাই হলোÑ ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতিকে সমুন্নত রেখে দেশে ব্যবসা-বাণিজ্যের একটি সম্পূর্ণ সুন্দর, স্বচ্ছ, আধুনিক ও বৈষম্যহীন পরিবেশ সৃষ্টি করা। সরকার দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে, বেসরকারি খাতের বাধাগুলো দূর করতে পারলে তরুণ ও নতুন উদ্যোক্তাদের হাত ধরে দেশে কর্মসংস্থান আরও ব্যাপক হারে বৃদ্ধি পাবে। সরকারের এই ইতিবাচক ও সংস্কারমুখী অর্থনৈতিক চেতনার সঙ্গে তাল মিলিয়ে দেশের ডিজিটাল অর্থনীতিকেও আজ বিশ্বমঞ্চে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। অথচ, এই বিশাল ও গতিশীল খাতের একমাত্র রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতিপ্রাপ্ত শীর্ষ বাণিজ্য সংগঠন ‘ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ’ (ই-ক্যাব) গত দীর্ঘ সময় ধরে এক গভীর নেতৃত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
বাণিজ্য সংগঠন আইন এবং প্রশাসক নিয়োগের প্রশাসনিক প্রেক্ষাপট : নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার সীমাবদ্ধতা ই-ক্যাবের বর্তমান প্রশাসনিক কাঠামো বাণিজ্য মন্ত্রণালয় কর্তৃক নিযুক্ত প্রশাসকের মাধ্যমে পরিচালিত হচ্ছে। কার্যনির্বাহী কমিটির ধারাবাহিকতা ভেঙে পড়ার প্রেক্ষিতে সরকারের বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের বাণিজ্য সংগঠন অনুবিভাগ ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২২’-এর বিধান অনুযায়ী এই প্রশাসক নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। এই আইনের মূল ভিত্তি হলোÑ কোনো নিবন্ধিত বাণিজ্য সংগঠনের কার্যনির্বাহী কমিটি যদি অকার্যকর হয়ে পড়ে কিংবা সুনির্দিষ্ট মেয়াদের মধ্যে নির্বাচন সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হয়, তবে সরকার সেখানে অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসক নিয়োগ করতে পারে। প্রশাসকের মূল ম্যান্ডেট থাকে একটি নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে ত্রুটিমুক্ত ভোটার তালিকা প্রণয়ন করে নির্বাচন সম্পন্ন করা।
তবে সরকারি দপ্তরের আমলাতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতি এবং অন্যান্য প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রাধিকারের কারণে এই সময়সীমার মধ্যে নির্বাচন আয়োজন করা সম্ভব হয়নি, যা নির্বাচন প্রক্রিয়াকে প্রথম দফায় পিছিয়ে দেয়।
‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২৫’ : সরকারের যুগান্তকারী সংস্কার বনাম অপপ্রয়োগ ও মন্ত্রণালয়ের আইনি নিষ্ক্রিয়তা।
ই-ক্যাবসহ দেশের সমস্ত বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচন ও পরিচালনায় শতভাগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনা এবং সংগঠনগুলোকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক সিন্ডিকেটে বা পকেট সংগঠনে রূপান্তর হওয়া থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে বর্তমান সরকার সম্প্রতি অত্যন্ত সময়োপযোগী, দূরদর্শী ও সংস্কারমুখী ‘বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২৫’ প্রণয়ন করেছে। এই আইনটি দেশের ই-কমার্স খাতের দীর্ঘমেয়াদি শৃঙ্খলার জন্য এবং সাধারণ ব্যবসায়ীদের অধিকার রক্ষায় সরকারের একটি অত্যন্ত ইতিবাচক ও প্রশংসনীয় পদক্ষেপ।
সরকারের শুভ উদ্দেশ্য : নতুন এই আইনের মাধ্যমে সরকার বছরের পর বছর নির্বাচন না দিয়ে অন্তর্বর্তীকালীন কমিটি বা প্রশাসক দিয়ে সংগঠন চালানো বন্ধ করতে চায়। ভোটার তালিকা শতভাগ ডিজিটাল, নির্ভুল ও স্বচ্ছ করা এবং প্রকৃত অর্থে সক্রিয় তৃণমূল ব্যবসায়ীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাই সরকারের মূল লক্ষ্য। এটি প্রকৃত সৎ ব্যবসায়ীদের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি শক্তিশালী আইনি ঢাল।
যেখানে তৈরি হয়েছে প্রতিবন্ধকতা ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা : সরকারের উদ্দেশ্য সম্পূর্ণ ব্যবসা-বান্ধব ও ইতিবাচক হলেও, আইনের এই কঠোর ধারাগুলোকেই নিজেদের স্বার্থে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে এক ধরনের আইনি মারপ্যাঁচে সময়ক্ষেপণের খেলা শুরু করেছে স্বার্থসংশ্লিষ্ট কিছু পক্ষ। নতুন আইনের অধীনে যখন ভোটার তালিকা সম্পূর্ণ পরিচ্ছন্ন ও ডিজিটাল পদ্ধতিতে যাচাই-বাছাই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়, তখনই শুরু হয় আইনি প্রক্রিয়ার অপব্যবহার। সাধারণ ও সক্রিয় মেম্বারদের পক্ষ থেকে অভিযোগ তোলা হয় যে, বিগত সময়গুলোতে প্রণীত ভোটার তালিকায় অনেক ‘ডামি’ বা নিষ্ক্রিয় বা লাইসেন্সবিহীন প্রতিষ্ঠানের নাম রয়ে গেছে, আবার অনেক প্রকৃত ও তৃণমূল উদ্যোক্তা ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হতে পারেননি।
আইনগতভাবে, আদালত যখন কোনো নির্বাচনি প্রক্রিয়া বা ভোটার তালিকার ওপর স্থগিতাদেশ জারি করেন, তখন প্রশাসকের পক্ষে পরবর্তী নির্বাচনি তপশিল ঘোষণা করা আপাতদৃষ্টে কঠিন হয়ে পড়ে। কিন্তু এখানে সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি হয়েছে নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে স্বয়ং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের ও প্রশাসকের নিজস্ব আইনি তৎপরতার অভাবে।
স্বার্থের দ্বন্দ্ব এবং কৌশলগত আইনি প্রতিবন্ধকতা
বাণিজ্য সংগঠনের নির্বাচনে সব পক্ষের প্রস্তুতি বা সমীকরণ সবসময় এক থাকে না। যখনই কোনো পক্ষ মনে করে যে বর্তমান ভোটার তালিকা বা বর্তমান পরিস্থিতিতে নির্বাচন হলে তাদের প্যানেল বা প্রার্থীরা সুবিধাজনক অবস্থানে থাকবে না, তখনই তারা নতুন আইনের বিভিন্ন উপধারা, নিয়মকানুনের অজুহাত বা ভোটার তালিকার ত্রুটি তুলে আইনি আশ্রয় নেন। ফলে, সরাসরি কেউ নির্বাচনের বিরোধিতা না করলেও, আইনি মারপ্যাঁচে ফেলে নির্বাচনকে ঝুলিয়ে রাখার এই কৌশলগত প্রবণতা পুরো প্রক্রিয়াকে একটি অন্তহীন গোলকধাঁধায় পরিণত করেছে। এতে সরকারের ব্যবসা ও বিনিয়োগ-বান্ধব পরিবেশ তৈরির সংস্কারমুখী চেতনাও ব্যাহত হচ্ছে।
নির্বাচিত কমিটির অনুপস্থিতি : নীতিগত দরকষাকষির অভাব ও সদস্য ভোগান্তি
ই-ক্যাবের নির্বাচন না হওয়ার সবচেয়ে বড় খেসারত দিতে হচ্ছে এই খাতের সাধারণ সদস্যদের। একটি নির্বাচিত, প্রতিনিধিত্বশীল এবং জবাবদিহিমূলক কার্যনির্বাহী কমিটি না থাকার কারণে সরকারের উচ্চপর্যায়ে ই-কমার্স খাতের পক্ষে কথা বলার বা নীতিগত সংলাপ ও দরকষাকষি করার মতো কোনো কার্যকর প্ল্যাটফর্ম এখন নেই।
প্রতি বছর জাতীয় বাজেট প্রণয়নের সময় কিংবা সরকারের রাজস্ব নীতি নির্ধারণের ক্ষেত্রে ই-কমার্স খাতের জন্য বিশেষ প্রণোদনা, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য কর রেয়াত, কিংবা ক্যাশলেস পেমেন্ট ব্যবস্থার প্রসারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে সমন্বয়নের মতো বিষয়গুলোতে জোরালো ভূমিকা রাখার কেউ নেই। বর্তমান সরকার যেখানে প্রতি মুহূর্তে ব্যবসার পরিবেশ সহজ করতে চাচ্ছে, সেখানে একজন সরকারি প্রশাসকের পক্ষে কখনোই একজন প্রকৃত ব্যবসায়ীর মতো করে নীতিগত জায়গায় গিয়ে সেই সুযোগগুলো আদায় করে নেওয়া সম্ভব নয়।
সাধারণ সদস্যদের মাঝে আস্থার সংকট
অনেকে নির্বাচন না হওয়াকে ‘সদস্যদের অনাগ্রহ’ হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করেন, যা সম্পূর্ণ ভুল ব্যাখ্যা। সাধারণ সদস্যদের মাঝে অনাগ্রহ নেই, যা আছে তা হলোÑ তীব্র হতাশা। যখন একজন ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা দেখেন যে তার ব্যবসা টিকিয়ে রাখার সংকটে বা নীতিগত সমস্যায় অ্যাসোসিয়েশন কোনো দৃশ্যমান ভূমিকা রাখতে পারছি না, তখন তিনি মেম্বারশিপ নবায়ন বা অ্যাসোসিয়েশনের কার্যক্রমে অংশ নেওয়ার আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এই আস্থার সংকট মূলত দীর্ঘদিনের নেতৃত্বহীনতার ফল, কোনোভাবেই কারণ নয়।
উত্তরণের পথ ও সুনির্দিষ্ট কিছু প্রস্তাবনা
২২ হাজার কোটি টাকার এই বিশাল সম্ভাবনাময় বাজারকে অভিভাবকহীন রেখে স্মার্ট ইকোনমি বা বৈষম্যহীন বাংলাদেশের লক্ষ্য অর্জন সম্ভব নয়। ব্যবসা-বাণিজ্যের পরিবেশ সহজ করে লাখ লাখ নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে বর্তমান সরকারের যে সদিচ্ছা, তাকে সফল করতে এই অচলাবস্থা ভাঙা অত্যন্ত জরুরি। এর জন্য নি¤েœাক্ত পদক্ষেপগুলো নেওয়া যেতে পারে:
মন্ত্রণালয়ের বিশেষ আইনি সেল গঠন : বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং ই-ক্যাবের বর্তমান প্রশাসকের উদ্যোগে উচ্চ আদালতে চলমান রিটগুলো দ্রুত নিষ্পত্তি করার জন্য একটি বিশেষ ও শক্তিশালী আইনি দল গঠন করা প্রয়োজন, যারা অগ্রাধিকার ভিত্তিতে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আইনি লড়াই লড়বে এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা হিসেবে মন্ত্রণালয়ের আগের নিষ্ক্রিয়তা দূর করে সংস্কার প্রক্রিয়া গতিশীল করবে।
নতুন আইনের আলোকে স্বচ্ছ ডিজিটাল স্ক্রিনিং : বাণিজ্য সংগঠন আইন, ২০২৫-এর ইতিবাচক ও ব্যবসা-বান্ধব নির্দেশনা মেনে যৌথ মূলধন কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর (জঔঝঈ), ই-ক্যাবের নিজস্ব ডেটাবেজ এবং ট্রেড লাইসেন্স যাচাইয়ের মাধ্যমে একটি সম্পূর্ণ স্বচ্ছ ও ডামি-মুক্ত ডিজিটাল ভোটার তালিকা দ্রুত প্রণয়ন করতে হবে, যেন কোনো পক্ষেরই পরবর্তীতে রিট করার বা সরকারের ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করার সুযোগ না থাকে।
ই-ক্যাবকে একটি কার্যকর বাণিজ্যিক সংগঠন হিসেবে বাঁচিয়ে রাখতে এবং ৫ লাখ উদ্যোক্তার অধিকার রক্ষা করতে আইনি ও আমলাতান্ত্রিক বেড়াজাল ছিঁড়ে দ্রুততম সময়ে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন আয়োজন করাই এখন এই খাতের অস্তিত্ব রক্ষার একমাত্র দাবি। বর্তমান সরকারের কর্মসংস্থানমুখী ও ব্যবসা-বান্ধব নীতিমালার প্রকৃত সুফল পেতে ই-ক্যাবের গণতান্ত্রিক রূপান্তর এবং নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থার জোরালো আইনি ভূমিকা এখন সময়ের দাবি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন