মাদ্রাসা ও কারিগরিসহ দেশের ১১টি শিক্ষাবোর্ডের অধীনে আজ মঙ্গলবার থেকে সারা দেশের তিন হাজার ৮৮৫টি কেন্দ্রে একযোগে শুরু হচ্ছে চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। করোনার কারণে পঞ্চম শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত দীর্ঘ সময়ে বড় ধরনের শিখন ঘাটতি নিয়েই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে এবারের পরীক্ষার্থীরা। এদিকে এই শিখন ঘাটতিসহ নানা কারণে এবার কমে গেছে মোট পরীক্ষার্থীর সংখ্যাও। অন্যদিকে রাজধানীতে এখনো তেমন আঁচ না লাগলেও সারা দেশে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং। এসএসসি পরীক্ষা সামনে রেখে এই লোডশেডিং শিক্ষার্থীদের নিরবচ্ছিন্ন প্রস্তুতিতে ব্যাপক বিঘœ তৈরি করছে। শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. এহছানুল হক মিলন এরই মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন। দ্রুত এই লোডশেডিং সমস্যার সমাধান না হলে এসএসসি পরীক্ষার দিনগুলোতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি বাড়বে বলে আশঙ্কা রয়েছে। শিক্ষক ও শিক্ষার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে এই মতামত জানা গেছে।
শিখন ঘাটতি নিয়ে এসএসসিতে শিক্ষার্থীরা : এবারের এসএসসি পরীক্ষায় যে পরীক্ষার্থীরা অংশ নিচ্ছে ২০২১ সালে তারা ছিল ষষ্ঠ শ্রেণির শিক্ষার্থী। ২০২০ সালে বৈশি^ক করোনা মহামারির কারণে দীর্ঘ সময় শ্রেণিশিক্ষা কার্যক্রমের বাইরে ছিল শিক্ষার্থীরা। করোনার কারণে এই শিক্ষার্থীরা পঞ্চম শ্রেণির প্রাথমিক সমাপনি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেনি। ফলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে বড় ধরনের ‘শিখন ঘাটতি’ তৈরি হয়। পরবর্তী সময়ে এই শিক্ষার্থীরা অষ্টম শ্রেণির সমাপনি পরীক্ষাও দিতে পারেনি। ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০১২ সালের কারিকুলামে বিভাগভিত্তিক পরীক্ষা পদ্ধতির পড়াশোনায় ফিরে যায়। ফলে ২০২৪ সালে নবম শ্রেণিতে থাকা শিক্ষার্থীদের চলতি বছরের এসএসসি (২০২৫-২৬) পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য ২০১২ সালের নবম-দশম শ্রেণির দুই বছরের সিলেবাস এক বছরে শেষ করার বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) দুই বছরের পড়া একবছরে শেষ করার মতো উপযোগী করার জন্য সিলেবাসকে সংক্ষিপ্ত করে। সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করায় স্বাভাবিকভাবে পাঠ্যসূচিও কমে আসে। এতে ২০২৫ সালে দশম শ্রেণিতে পড়–য়া এই শিক্ষার্থীরা চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে যখন উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে যাবে তখন তাদের বড় সিলেবাস পড়তে হবে। অর্থাৎ করোনা মহামারির সময় থেকে যে শিখন ঘাটতি শুরু হয়েছিল তার ধারাবাহিকতা নিয়েই এবারের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে সেই শিক্ষার্থীরা।
রাজধানীর সরকারি-বেসরকারি স্কুলের একাধিক শিক্ষক বিষয়টির সঙ্গে একমত পোষণ করে বলেছেন, এই শিখন ঘাটতির কথা বিবেচনায় নিয়েই জ¦ালানি সংকটে শিক্ষামন্ত্রীর অনলাইনে শিক্ষা কার্যক্রম চালানোর বিষয়ে তারা একমত হতে পারেননি। তারা বলেন, মাধ্যমিকের তুলনায় উচ্চ মাধ্যমিকের সিলেবাস এমনিতেই বড়, তার ওপর মাধ্যমিকের দুই বছরের সিলেবাস একবছরে শেষ করায় শিক্ষার্থীদের অনেক বিষয়ই পড়া হয়ে ওঠেনি।
রাজধানীর ক্যামব্রিয়ান স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মাহবুব হাসান লিংকন বলেন, ‘শিখন ঘাটতি তো অবশ্যই হবে। কারণ, এই এসএসসি পরীক্ষার্থীরা যখন এইচএসসিতে যাবে তখন তাদের অনেক বড় সিলেবাস পড়তে হবে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেনÑ যেমন এসএসসির একজন শিক্ষার্থীকে পূর্ণ সিলেবাসে পদার্থবিদ্যা বিষয়ে ১২টি অধ্যায় পড়তে হয়। কিন্তু সিলেবাস সংক্ষিপ্ত করায় এবারের এসএসসি পরীক্ষার্থীরা ৭টি অধ্যায় পড়েই পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। ফলে বাকি অধ্যায়ের পড়ায় তাদের শিখন ঘাটতি রয়েই যাচ্ছে।
সংক্ষিপ্ত সিলেবাস তৈরিতে যুক্ত এনসিটিবির সাবেক সদস্য (কারিকুলাম) প্রফেসর ড. রবিউল কবীর চৌধুরী বলেন, ‘এ বিষয়ের দুটি দিক রয়েছেÑ বড় পরিসরে চিন্তা করলে শিখন ঘাটতি হবে না, তবে কন্টেন্টের পরিপ্রেক্ষিতে বিবেচনা করলে ঘাটতি হবে।’ তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, এসএসসি পরীক্ষার যে শিক্ষার্থীরা বিদেশে পড়তে যায় তাদের ক্ষেত্রে টোফেল, স্যাট ইত্যাদি বিষয়ে কতটা পারদর্শী সেটা দেখা হয়, তাই বাংলা বিষয়ের পাঠ্যসূচিতে একটি বা দুটি কবিতা কম পড়লে শিক্ষার্থীর শিখন ঘাটতি তৈরি হওয়ার কথা নয়। ‘কিন্তু আমাদের দেশে যেহেতু পাঠ্যসূচিতেই বেশি ফোকাস থাকে, তাই সেক্ষেত্রে শিখন ঘাটতির বিষয়টি আসে’ বলেন এই শিক্ষাবিদ।
এদিকে গতকাল সোমবার দুপুরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মাহ্দী আমিন বলেন, ‘আমরা খুব ভালোভাবে অবহিত আছি যে এবারের এসএসসি ব্যাচ করোনাজনিত কারণে প্রাথমিক ও জুনিয়র উভয় বৃত্তি পরীক্ষা বঞ্চিত হয়েছে; ফলে এবারের এসএসসি পরীক্ষা তাদের জীবনের প্রথম পাবলিক পরীক্ষা। সে-কারণে পরীক্ষার হল যেন পরীক্ষার্থীবান্ধব থাকে সেটা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
কমেছে পরীক্ষার্থী : এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা প্রতিবছরই কমছে বলে বোর্ডের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে। এজন্য করোনাকালের শিখন ঘাটতিসহ নানা বিষয় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের সাবেক চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. নিজামুল করিম।
চলতি বছরের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় অংশগ্রহণকারী পরীক্ষার্থীর সংখ্যা গত বছরের তুলনায় কমেছে ৭১ হাজার ৬২৬ জন। গত বছর দেশের সাধারণ ৯টি শিক্ষা বোর্ডসহ ১১টি শিক্ষা বোর্ডে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা ছিল ১৯ লাখ ২৮ হাজার ৯৭০ জন। এবার এই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জনে। এর আগে ২০২৪ সালে ২০ লাখ ২৪ হাজার ১৯২ জন; ২০২৩ সালে ২০ লাখ ৭২ হাজার ১৬৩ জন; ২০২২ সালে ১৯ লাখ ৯৪ হাজার ১৩৭ এবং ২০২১ সালে ২২ লাখ ২৭ হাজার ১১৩ জন শিক্ষার্থী এই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল। সেই হিসাবে ২০২৩ সালে আগের বছরের তুলনায় পরীক্ষার্থী কিছু বাড়লেও অন্য বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কমেছে পরীক্ষার্থীর সংখ্যা। ২০২১ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত ছয় বছরের ব্যবধানে এই পরীক্ষার্থীর সংখ্যা কমেছে তিন লাখ ৬৯ হাজার ৭৬৯ জন।
এ প্রসঙ্গে প্রফেসর ড. নিজামুল করিম বলেন, ‘আমি দায়িত্বে থাকার সময়ও বিষয়টি খেয়াল করেছি। পরীক্ষায় ছাত্রীদের অংশগ্রহণ বাড়লেও ছাত্রদের সংখ্যা কমছে। এ বিষয়ে আমার পর্যবেক্ষণে মনে হয়, সাধারণ বোর্ডের অনেক পরীক্ষার্থী মাদ্রাসা বোর্ডে চলে যায়। এ ছাড়া করোনাকালে কিছু শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে, অনেকে শিখন ঘাটতির কারণে পড়াশোনা এগিয়ে নিতে পারেনি। এছাড়া প্রতিষ্ঠান প্রধানরা বলেছেন, শিক্ষার্থীরা ফেল করলে গণমাধ্যমে প্রচুর লেখালেখি হয়, তাদের ওপর চাপ পড়ে, এজন্য কোনো শিক্ষার্থী টেস্ট পরীক্ষায় ফেল করলে তারা আর পরীক্ষা দিতে পাঠায় না।’
লোডশেডিং ভয়ংকর : এদিকে বৈশাখের প্রথম সপ্তাহ পার না হতেই তীব্র গরমে পুড়ছে সারা দেশ। গরমের তীব্রতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে বিদ্যুতের চাহিদা। চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ কম হওয়ায় পরীক্ষার এ সময়ে সারা দেশে চলছে ভয়াবহ লোডশেডিং।
জানা গেছে, বর্তমানে পিক আওয়ারে (সন্ধ্যা) বিদ্যুতের চাহিদা প্রায় ১৫ হাজার মেগাওয়াট। তবে চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন না হওয়ায় প্রায় দুই হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত ঘাটতি হচ্ছে। রাজধানীতে না হলেও নারায়ণগঞ্জ, সাভার ও গাজীপুরের পরীক্ষার্থীদের প্রতিদিনই লোডশেডিংয়ের যন্ত্রণা সহ্য করতে হচ্ছে। মফস্বলে এই যন্ত্রণা আরও তীব্র। কোথাও কোথাও দিনে ৪-৫ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং হচ্ছে।
পিডিবির দক্ষিণাঞ্চলীয় জোনের চট্টগ্রামে পিক আওয়ারে দৈনিক বিদ্যুতের চাহিদা এক হাজার ৪৪৫ দশমিক ৫০ মেগাওয়াট। প্রায় একই সময়ে লোডশেডিং করতে হয়েছে ১০৭ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ।
রাজধানীর কাঁটাবন অফিসে দায়িত্বরত ডিপিডিসির সুপারিনটেন্ডেন্ট ইঞ্জিনিয়ার মো. রুহুল আমিন ফকির বলেন, ‘রাজধানীতে লোডশেডিং শিডিউল নেই। আজ (গতকাল) আমাদের বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৯৫৫ মেগাওয়াট, তাই সরবরাহ হয়েছে।’
লোডশেডিংয়ের এমন পরিস্থিতি বিবেচনায় বিদ্যুৎ সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। গতকাল শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে এসএসসি পরীক্ষা নিয়ে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে মন্ত্রী বলেন, ‘বর্তমান বিদ্যুৎ পরিস্থিতি সম্পর্কে আমরা অবহিত। তাই পরীক্ষার সময় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ রাখার জন্য কর্তৃপক্ষকে প্রয়োজনীয় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
লোডশেডিং প্রসঙ্গে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. খোন্দকার এহসানুল কবির বলেন, ‘এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রী সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে বৈঠক করে বিষয়টি সমাধানে নির্দেশনা দিয়েছেন। আশা করি শিক্ষার্থীদের সমস্যা হবে না।’
আজ বাংলা প্রথমপত্র বিষয়ের মাধ্যমে শুরু হচ্ছে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষা। এসএসসির লিখিত পরীক্ষা শেষ হবে ২০ মে। ৭ জুন থেকে শুরু হবে ব্যবহারিক পরীক্ষা, যা চলবে ১৪ জুন পর্যন্ত।
এবারের পরীক্ষায় ৩০ হাজার ৬৬৬টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মোট ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ পরীক্ষার্থী অংশ নিচ্ছে। এর মধ্যে ৯টি সাধারণ শিক্ষা বোর্ডে ১৪ লাখ ১৮ হাজার ৩৯৮ জন। মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ডে ৩ লাখ ৪ হাজার ২৮৬ জন ও কারিগরি শিক্ষা বোর্ডে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৬৬০ জন অংশ নিচ্ছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন