‘পদোন্নতি না পেয়ে’ চাকরি ছাড়ার আবেদন করেছেন সিআইডির ভারপ্রাপ্ত প্রধান (ডিআইজি) আলি আকবর খান। সিআইডির ডিআইজি (অর্গানাইজ ক্রাইম) আলি আকবর খান গত ১ জুন সংস্থার ভারপ্রাপ্ত প্রধানের দায়িত্ব পান। এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জোরালো আলোচনা চলছে। তবে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো বক্তব্য দেয়নি পুলিশ সদর দপ্তর। বিসিএস ১৫ ব্যাচের এই কর্মকর্তা আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর চাকরিচ্যুত হন। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর চাকরি ফিরে পাওয়াসহ পদোন্নতি পেয়ে ডিআইজি হন। বর্তমান পুলিশ মহাপরিদর্শক ও ডিএমপি কমিশনার তার ব্যাচমেট।
আলি আকবর খানের স্বাক্ষরিত আবেদনে বলা হয়েছে, ২০০৮ সালের নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের সময়ে ২০০৯ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পুলিশের প্রথম সদস্য হিসেবে বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হন এবং ২০২২ সালের ৭ এপ্রিল তিনি চাকরিচ্যুত হন। প্রায় ১৬ বছর চাকরির বাইরে থাকার পর আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর ২০২৪ সালের ১০ সেপ্টেম্বরে তিনি পুনর্বহাল হন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, জুলাই আন্দোলনে ছাত্র-জনতার আত্মত্যাগের মাধ্যমে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হওয়ায় চাকরিতে ফেরার সুযোগ পেয়েছেন। এ জন্য তিনি নিহত ও আহত ছাত্র-জনতার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে ১৯৯৫ সালের ১৫ নভেম্বর চাকরিতে যোগদানের পর থেকে সততা, দক্ষতা ও সম্মানের সঙ্গে দায়িত্ব পালনের কথাও উল্লেখ করেন। তিনি আরও বলেন, ৪ জুন জারি করা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পদোন্নতির প্রজ্ঞাপনে তার নাম না থাকায় তিনি মনে করছেন, কোনো জানা-অজানা অযোগ্যতার কারণে তিনি আবারও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন। এ অবস্থায় নিজের অযোগ্যতা নিয়ে সরকারের বোঝা না হয়ে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করতে চান। আবেদনে তিনি আগামী মাসের ২ জুলাই থেকে চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর এবং ওই তারিখ থেকে এক বছরের পিআরএল (প্রি-রিটায়ারমেন্ট লিভ) মঞ্জুরের জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের কাছে অনুরোধ জানান।
পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, পদোন্নতির তালিকায় নিজের নাম না দেখে আকবর খান ক্ষুব্ধ হন। এর পরই তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব বরাবর চাকরি ছাড়ার আবেদন করেন। গত সপ্তাহের শেষ দিন বৃহস্পতিবার পাঁচজন ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে পদোন্নতি দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। তারা হলেন, সিলেট রেঞ্জের ডিআইজি মুশফেকুর রহমান, এনএসআইয়ের পরিচালক মোশাররফ হোছাইন, চট্টগ্রাম রেঞ্জের ডিআইজি মনিরুজ্জামান, র্যাবের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফারুক আহমেদ এবং ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি রেজাউল করিম মল্লিক।
পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার (প্রশাসন) এ এ এম হুমায়ুন কবীর স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে আলি আকবর খানের আবেদন যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়। এতে বলা হয়, আলি আকবর খান স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ এবং ২ জুলাই ২০২৬ থেকে এক বছরের পিআরএল মঞ্জুরের জন্য আবেদন করেছেন। তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারি চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৪ ধারা অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অনুরোধ জানানো হয়েছে।
একাধিক সূত্রের দাবি, ডিআইজি আলি আকবর খানকে পদোন্নতি দিয়ে অতিরিক্ত আইজিপি হিসেবে সিআইডির প্রধান করার প্রস্তাব প্রশাসনিক পর্যায় থেকে পাঠানো হয়েছিল। তবে শেষ পর্যন্ত তার পদোন্নতি হয়নি। একই সঙ্গে আলি আকবর খানের পিআরএল আবেদন গ্রহণ করা হয়েছে কি না এবং তিনি আদৌ দায়িত্ব ছাড়ছেন কি না, সে বিষয়েও এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি ঘোষণা আসেনি। বৃহস্পতিবার পুলিশের পাঁচজন ডিআইজিকে অতিরিক্ত আইজিপি (গ্রেড-২) হিসেবে পদোন্নতি দেওয়া হয়। পদোন্নতিপ্রাপ্তদের তালিকায় আলি আকবর খানের নাম না থাকায় তার ভবিষ্যৎ দায়িত্ব নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এ অবস্থায় তিনি পিআরএলের আবেদন করেছেন।
২০০৬ সালে চট্টগ্রামে একটি আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ম্যাচের সময় সাংবাদিক পিটিয়ে আলোচনায় আসেন তৎকালীন সিএমপির উপ-কমিশনার আলি আকবর খান। আওয়ামী লীগ শাসনামলে তাকে কাজের বাইরে রাখা হয়। ৫ আগস্টের পট পরিবর্তনের পর তিনি চাকরি ফিরে পান। ১৯৯৫ সালে ১৫তম বিসিএস (পুলিশ) ক্যাডারের মাধ্যমে বাংলাদেশ পুলিশে যোগদানকারী আলি আকবর খান ১৯৬৭ সালের ২১ সেপ্টেম্বর চাঁদপুর জেলায় জন্মগ্রহণ করেন। বাংলাদেশ পুলিশের এই কর্মকর্তা তার দীর্ঘ কর্মজীবনে রেঞ্জ পুলিশ, বাংলাদেশ পুলিশ অধিদপ্তর এবং স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইউনিটে নিষ্ঠা, দক্ষতা ও অকৃত্রিম সততার সঙ্গে কর্ম সম্পাদন করে সর্বমহলে প্রশংসা অর্জন করেছেন। পেশাগত উৎকর্ষ সাধনের লক্ষ্যে তিনি দেশ-বিদেশে বিভিন্ন প্রশিক্ষণ, সেমিনার ও কর্মশালায় অংশগ্রহণ করেছেন। এর মধ্যে ইতালিতে অনুষ্ঠিত নিয়মিত ও আইনগত অভিবাসনের প্রচার, মানব পাচার প্রতিরোধ, অনিয়মিত অভিবাসনকে নিরুৎসাহিত করা এবং অনিয়মিত অভিবাসীদের প্রত্যাবাসন এবং অভিবাসীদের চোরাচালান (টিআইপি/এসওএম) দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ডেটা সংগ্রহ শীর্ষক কর্মশালা উল্লেখযোগ্য। এ ছাড়া বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের মাধ্যমে তিনি তার পেশাগত জ্ঞান ও দক্ষতা সমৃদ্ধ করেছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন