× UCB Sticker Card
রবিবার, ০৭ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম

ক্ষুধার নতুন মানচিত্রে বিশ্ব

আরিয়ান স্ট্যালিন

প্রকাশিত: জুন ৭, ২০২৬, ০৬:৫৭ এএম

ক্ষুধার নতুন মানচিত্রে বিশ্ব

যুদ্ধ কখনো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ থাকে না। বিস্ফোরণের শব্দ থেমে গেলেও তার অভিঘাত পৌঁছে যায় বহুদূরের মানুষের ঘরে, রান্নাঘরে, বাজারে এবং শেষ পর্যন্ত তাদের খাবারের থালায়। পশ্চিম এশিয়ার চলমান সংঘাতও ঠিক তেমনই এক বৈশ্বিক সংকটে পরিণত হয়েছে। যে সংঘাতের কেন্দ্র হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে, তার প্রভাব এখন বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের দৈনন্দিন জীবনে স্পষ্ট হয়ে উঠছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচি সতর্ক করে জানিয়েছে, জ্বালানি ও পরিবহন ব্যয়ের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি, সরবরাহব্যবস্থার ব্যাঘাত এবং মানবিক সহায়তায় তীব্র অর্থ সংকটের কারণে বিশ্ব নতুন এক খাদ্য বিপর্যয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। তাদের পূর্বাভাস অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের দাম দীর্ঘ সময় ব্যারেলপ্রতি একশ ডলারের আশপাশে থাকলে প্রায় সাড়ে চার কোটি মানুষ তীব্র খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মুখে পড়তে পারে। সংস্থাটির আশঙ্কা, সেই পরিস্থিতি ইতিমধ্যেই বাস্তবে রূপ নিতে শুরু করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে ইরানকে ঘিরে শুরু হওয়া আঞ্চলিক সংঘাত দ্রুত পারস্য উপসাগর থেকে লেবানন পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। এর ফলে হরমুজ প্রণালিসহ গুরুত্বপূর্ণ নৌপথগুলোতে জাহাজ চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। নিরাপত্তাজনিত ঝুঁকির কারণে অনেক জাহাজকে দীর্ঘ ও বিকল্প পথে চলতে হচ্ছে। এতে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ।

বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা এবং পণ্য পরিবহনের শৃঙ্খল ভেঙে পড়তে শুরু করেছে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করছে দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলো। আফগানিস্তান, সোমালিয়া এবং শ্রীলঙ্কার মতো রাষ্ট্রগুলো ইতিমধ্যেই ভয়াবহ চাপের মুখে পড়েছে। খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চ ব্যয়, মানুষের আয় কমে যাওয়া এবং আমদানি ব্যাহত হওয়ায় সাধারণ মানুষ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে হিমশিম খাচ্ছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির তথ্য অনুযায়ী, আগামী বছরে শুধু সোমালিয়াতেই প্রায় পঁয়ষট্টি লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য সংকটের মুখে পড়তে পারে, যা দেশটির মোট জনসংখ্যার প্রায় এক-তৃতীয়াংশ। আফগানিস্তানে এই সংখ্যা পৌঁছাতে পারে এক কোটি চুয়াত্তর লাখে। বর্তমান পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আরও লাখো মানুষ ন্যূনতম খাদ্য সংগ্রহের সামর্থ্য হারাবে। সংকটের আরেকটি বড় কারণ হলো, সার ও জ্বালানির বৈশ্বিক বাজারে অস্থিরতা। আধুনিক কৃষি অনেকাংশেই নির্ভরশীল রাসায়নিক সারের ওপর।

ফসল উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রধান উপাদানগুলোর মধ্যে নাইট্রোজেন ও ফসফরাস উৎপাদনে উপসাগরীয় অঞ্চলের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। যুদ্ধের কারণে জ্বালানি সরবরাহ বিঘিœত হলে সারের উৎপাদন ও রপ্তানিও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে তারা প্রয়োজনীয় পরিমাণ সার কিনতেই পারেন না। খাদ্য উৎপাদনের প্রতিটি ধাপেই জ্বালানির প্রয়োজন। জমি প্রস্তুত করা, সেচ দেওয়া, ফসল কাটা, প্রক্রিয়াজাত করা, সংরক্ষণ করা কিংবা বাজারে পৌঁছে দেওয়াÑ সব ক্ষেত্রেই জ্বালানির ব্যয় জড়িত। তেলের দাম বেড়ে গেলে সেই অতিরিক্ত ব্যয় শেষ পর্যন্ত ভোক্তার ঘাড়েই এসে পড়ে। ফলে খাদ্যের দাম বাড়ে, অথচ মানুষের আয় একই থাকে কিংবা কমে যায়। যেসব দেশ খাদ্য ও জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরশীল, তাদের পরিস্থিতি আরও নাজুক। আফগানিস্তানে ত্রাণ পরিবহনের খরচ কয়েক গুণ বেড়ে গেছে। আগে যে সহায়তা পৌঁছাতে দশ দিন সময় লাগত, এখন তা পৌঁছাতে দুই মাসেরও বেশি সময় লাগছে। সোমালিয়ায় দুর্গম অঞ্চলে ত্রাণ পরিবহনের বিমান পরিষেবার ব্যয় এতটাই বেড়েছে যে মানবিক সহায়তা কার্যক্রম হুমকির মুখে পড়েছে। এদিকে আন্তর্জাতিক সহায়তাব্যবস্থাও তীব্র অর্থ সংকটে ভুগছে।

প্রয়োজন বাড়লেও অর্থের জোগান কমছে। ফলে বহু ত্রাণ সংস্থা বাধ্য হয়ে সহায়তার পরিধি সংকুচিত করছে। বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আশঙ্কা, অর্থ সংকটের কারণে আগামী সময়ে অন্তত পনেরো লাখ মানুষ তাদের সহায়তা থেকে বঞ্চিত হতে পারে। বর্তমান পরিস্থিতি আরও কয়েক মাস স্থায়ী হলে অতিরিক্ত নব্বই লাখ মানুষও খাদ্য সহায়তার বাইরে চলে যেতে পারে। তবে প্রশ্ন উঠছে, এত বড় সংকটের মধ্যেও বিশ্ববাজারে তেলের দাম কেন আরও বেশি বাড়েনি?

বিশ্লেষকদের মতে, এর পেছনে রয়েছে একাধিক সাময়িক ব্যবস্থা। যুদ্ধ শুরুর আগে অনেক দেশের হাতে তেলের বড় মজুত ছিল। কিছু দেশ নিজেদের কৌশলগত মজুত বাজারে ছাড়ছে। বিকল্প পাইপলাইনের মাধ্যমে সীমিত আকারে সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। কোথাও কোথাও জ্বালানি সাশ্রয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উচ্চমূল্যের কারণে মানুষের ভ্রমণও কমেছে। ফলে চাহিদা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত রয়েছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, এসব ব্যবস্থা দীর্ঘ মেয়াদে কার্যকর নয়। হরমুজ প্রণালির স্বাভাবিক কার্যক্রম পুনরুদ্ধার না হলে এবং মধ্যপ্রাচ্যের উৎপাদনব্যবস্থা পুরোপুরি সচল না হলে পরিস্থিতি দ্রুত অবনতি ঘটতে পারে। তখন জ্বালানির দাম আরও বাড়বে, খাদ্য উৎপাদন ব্যাহত হবে এবং বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি নতুন উচ্চতায় পৌঁছাবে।

খাদ্য সংকটের সবচেয়ে নির্মম দিকটি হলো, এটি সংখ্যার হিসাব নয়; এটি মানুষের জীবনযুদ্ধের গল্প। বাংলাদেশের কোনো প্রান্তিক কৃষক হয়তো ভাবছেন, বাড়তি খরচে এবার জমিতে চাষ করতে পারবেন কি না। কেনিয়ার একজন ক্ষুদ্র কৃষক হয়তো প্রয়োজনীয় সার কিনতে পারছেন না। সোমালিয়ার কোনো মা সন্তানের জন্য দিনের শেষ খাবারটুকু জোগাড় করতে ব্যর্থ হচ্ছেন। আবার উন্নত দেশের কোনো একক অভিভাবক সাপ্তাহিক বাজারের খরচ মেটাতে হিমশিম খাচ্ছেন। সংকটের অভিঘাত ভিন্ন হলেও উদ্বেগ একটাইÑ মানুষের খাদ্যের অধিকার। বিশ্ব এখন এমন এক বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে, যেখানে একটি আঞ্চলিক সংঘাত গোটা মানবসমাজকে নাড়া দিতে পারে। যুদ্ধের সিদ্ধান্ত নেয় ক্ষমতাবানরা, কিন্তু তার মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। ক্ষুধা, অনিশ্চয়তা এবং বেঁচে থাকার সংগ্রাম শেষ পর্যন্ত সীমান্ত মানে না।

এ কারণেই বর্তমান পরিস্থিতি শুধু অর্থনীতি কিংবা ভূরাজনীতির বিষয় নয়; এটি একটি গভীর মানবিক সংকট। দ্রুত সংঘাত নিরসন, বৈশ্বিক সহযোগিতা বৃদ্ধি, মানবিক সহায়তায় অর্থায়ন নিশ্চিত করা এবং খাদ্য সরবরাহব্যবস্থাকে সচল রাখা ছাড়া এই বিপর্যয় মোকাবিলার অন্য কোনো কার্যকর পথ নেই। অন্যথায় আগামী দিনগুলোতে বিশ্বের বহু মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াবেÑ পরবর্তী বেলার খাবার কোথা থেকে আসবে?

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!