পল্লবীর শিশু রামিসা ধর্ষণ ও হত্যা মামলার রায়ে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ দিয়েছেন ঢাকা মহানগর শিশু সহিংসতা দমন ট্রাইব্যুনালের বিচারক মাসরুর সালেকীন। রায়ের পর্যবেক্ষণে আদালত বলেন, ‘শিশু রামিসাকে ধর্ষণ ও হত্যার এই ঘটনা শুধু একটি ফৌজদারি অপরাধের বিচার নয়; এটি সমাজের বিবেক, মানবতা, আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা এবং আইনের শাসনের প্রতি এক গভীর ও কঠিন পরীক্ষা।’
বিচারক বলেন, ‘একটি নিষ্পাপ শিশুর জীবন নির্মমভাবে নিভিয়ে দেওয়ার অভিযোগে দায়ের হওয়া এ মামলার প্রতিটি পৃষ্ঠা বেদনা, ক্ষোভ, উদ্বেগ এবং ন্যায়বিচারের প্রত্যাশায় পরিপূর্ণ। শিশুদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও সুরক্ষা নিশ্চিত করা একটি সভ্য ও মানবিক রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। যখন কোনো শিশু যৌন নির্যাতন, সহিংসতা কিংবা হত্যার মতো জঘন্য অপরাধের শিকার হয়, তখন তা শুধু একটি পরিবারকে নয়, পুরো সমাজকে গভীরভাবে আহত করে এবং রাষ্ট্রের বিচারব্যবস্থার কার্যকারিতাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।’
রায়ের পর্যবেক্ষণে বিচারক উল্লেখ করেন, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনের অধীনে পরিচালিত এ ট্রাইব্যুনালে বর্তমানে এক হাজার ৮০০-এর বেশি মামলা বিচারাধীন রয়েছে। এসব মামলার প্রতিটির পেছনেই রয়েছে কোনো না কোনো শিশুর অসহনীয় যন্ত্রণা, একটি পরিবারের দীর্ঘশ্বাস এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক্ষা।
তিনি বলেন, ‘সেই বিবেচনায় রামিসার মামলাটি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে। কারণ, এই মামলায় তদন্ত, সাক্ষ্যগ্রহণ ও বিচারিক কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে দ্রুততার সঙ্গে সম্পন্ন হয়েছে। আদালত সন্তোষের সঙ্গে লক্ষ করেছেন যে, তদন্তকারী সংস্থা স্বল্প সময়ের মধ্যেই তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন দাখিল করেছে।’
বিচারক আরও বলেন, ‘প্রসিকিউশনও অল্প সময়ের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষীদের আদালতে হাজির করে বিচারপ্রক্রিয়াকে দ্রুত ও কার্যকরভাবে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় তদন্তকারী কর্মকর্তা, প্রসিকিউশন এবং সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা ও পেশাদারিত্ব প্রশংসার দাবিদার।’
আদালত আশা প্রকাশ করে বলেন, ‘শিশু রামিসার মামলার মতো দ্রুত, দক্ষ, নিরপেক্ষ ও মানসম্মত তদন্ত এবং বিচারিক কার্যক্রম ভবিষ্যতে শিশু নির্যাতন ও সহিংসতার অন্যান্য মামলার ক্ষেত্রেও অনুসরণীয় দৃষ্টান্ত হয়ে উঠবে। যাতে বিচারপ্রার্থী মানুষ, বিশেষ করে ভুক্তভোগী শিশু ও তাদের পরিবার অযথা দীর্ঘসূত্রতা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকে।’
পর্যবেক্ষণে বিচারক বলেন, ‘একটি ন্যায়সংগত বিচার কেবল আদালতের একক প্রচেষ্টায় সম্ভব নয়। তদন্তকারী সংস্থা, প্রসিকিউশন, ডিফেন্স, সাক্ষী এবং বিচারব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের দায়িত্বশীল অংশগ্রহণের মাধ্যমেই ন্যায়বিচার নিশ্চিত হয়।’
তিনি বলেন, ‘আদালতের দায়িত্ব আবেগের ভিত্তিতে নয়, বরং আইন, প্রমাণ ও ন্যায়বিচারের চিরন্তন নীতির আলোকে সত্য উদঘাটন করা। তাই আদালত অত্যন্ত সতর্কতা, সংবেদনশীলতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে সাক্ষ্য-প্রমাণ, আলামত, চিকিৎসা প্রতিবেদন এবং মামলার সামগ্রিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে এ রায় দিয়েছেন।’
রায়ের বিশদ পর্যালোচনায় আদালত উল্লেখ করেন, আসামি সোহেল রানার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি, তদন্ত কর্মকর্তার সাক্ষ্য এবং চিকিৎসকের প্রতিবেদনে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হয়েছে। একই সঙ্গে অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করায় তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারও সমানভাবে দায়ী বলে আদালত মত দেন।
আদালত বলেন, ‘চিকিৎসকের সাক্ষ্য, ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন এবং অন্যান্য তথ্য-প্রমাণে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয়েছে যে শিশুটিকে প্রথমে ধর্ষণ এবং পরে হত্যা করা হয়। সাক্ষীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ঘটনার পর সোহেল রানা ফ্ল্যাটের গ্রিল কেটে পালিয়ে যান। এ সময় স্বপ্না আক্তার ঘটনাস্থলেই উপস্থিত ছিলেন এবং অপরাধ প্রতিরোধে কোনো ভূমিকা না নিয়ে বরং অপরাধ সংঘটনে সহযোগিতা করেন।’
রায়ে আরও বলা হয়, সাক্ষ্য-প্রমাণের আলোকে নিশ্চিতভাবে প্রতীয়মান হয়েছে যে ঘটনার দিন সকাল ৯টা থেকে ১১টার মধ্যে সোহেল রানা শিশুটিকে ধর্ষণ ও হত্যা করে। তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও সেই ঘটনার বর্ণনা উঠে এসেছে।
এর আগে গতকাল সকাল সাড়ে ৮টায় স্বপ্না আক্তার এবং সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে সোহেল রানাকে প্রিজন ভ্যানে করে আদালতে আনা হয়। পরে তাদের হাজতখানায় রাখা হয়। বেলা ১১টায় বিচারক মাসরুর সালেকীন এজলাসে এসে রায় পাঠ শুরু করেন এবং প্রায় ৪০ মিনিট পর রায় ঘোষণা করেন।
প্রসঙ্গত, গত ১৯ মে পল্লবীতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হয় দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী রামিসা। ঘটনার মাত্র ২০ দিনের মাথায় এ মামলার রায় ঘোষণা হলো। গত বৃহস্পতিবার রাষ্ট্র ও আসামিপক্ষের যুক্তিতর্ক শেষ হওয়ার পর আদালত গতকাল রায়ের দিন ধার্য করেছিলেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন