২০২৩ সালের জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারে ‘আজীবন সম্মাননা’য় ভূষিত হচ্ছেন উপমহাদেশের প্রখ্যাত নায়িকা শবনম। অভিনয় থেকে দীর্ঘদিন দূরে থাকলেও স্মৃতির অ্যালবামে এখনও রঙিন হয়ে আছে তার সোনালি দিনগুলো। জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারের আজীবন সম্মাননা, অভিনয়ে ফিরে আসার সম্ভাবনা, প্রিয় সহশিল্পীদের স্মৃতি, এফডিসির বর্তমান অবস্থা এবং ব্যক্তিজীবনের নানা অনুভূতি নিয়ে রূপালী বাংলাদেশের সঙ্গে খোলামেলা কথা বলেছেন এই কিংবদন্তি অভিনেত্রী। তার সাক্ষাৎকার নিয়েছেন ওমর ফারুক
রূপালী বাংলাদেশের পক্ষ থেকে আপনাকে অভিনন্দন...
ধন্যবাদ রূপালী বাংলাদেশের সম্পাদক-প্রকাশক, সকল সাংবাদিকসহ সবার প্রতি আমার আন্তরিক কৃতজ্ঞতা। আমার জন্য দোয়া করবেন আপনারা।
অবশেষে নিজ দেশে আপনি রাষ্ট্রীয় সম্মাননায় ভূষিত হচ্ছেন। কেমন লাগছে?
আনন্দের এবং ভীষণ ভালোলাগার বিষয় হলোÑ এই যে জীবদ্দশায় আমি এই সম্মাননা পেতে যাচ্ছি। ঠিক জানি না কবে এই সম্মাননা হাতে পাব। তবে ঈশ^রের প্রতি অসীম কৃতজ্ঞতা যে আমি রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মানিত হচ্ছি। মরণোত্তর সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে না। এটাই অনেক ভালোলাগার।
শেষ ‘আম্মাজান’ সিনেমায় আপনাকে নাম ভূমিকায় দেখা গিয়েছিল। এরপর আর কেনই বা অভিনয় করলেন না সিনেমায়?
সত্যি বলতে কী ‘আম্মাজান’ মুক্তির পর আমি অনেক সিনেমাতে কাজ করার প্রস্তাব পেয়েছি। কিন্তু একটা গল্পও আমার কাছে ভালোলাগেনি যে গল্প আম্মাজানকে ছাপিয়ে যাবে। তাই আমি সবসময় চেয়েছি ‘আম্মাজান’-এর রেশটাই থেকে যাক আমার ভক্ত দর্শকের মাঝে।
আপনি তো একসময় পাকিস্তানে শত শত সিনেমায় অভিনয় করেছেন। ওখানে কী ‘আম্মাজান’ সিনেমাটি দেখেছেন দর্শক?
আসলে সিনেমাটি যখন মুক্তি পায় তখন তো আমি বাংলাদেশে চলেই এসেছি একেবারে। পরবর্তীতে নানান অনুষ্ঠানে যখন গিয়েছি তারা আম্মাজানের কথা বলেছে। যদিও তারা ভাষা বুঝেনি। কিন্তু সিনেমার নিজস্ব একটা ভাষা আছে তা দেখেই তারা বুঝতে পেরেছিল যে আম্মাজান একটি ভালো সিনেমা। এখন হয়তো অনেকেই ইউটিউবে দেখে। তবে সিনেমা হলে বসে সিনেমা দেখার ভালোলাগাটাই অন্যরকম।
তাহলে আর কোনোদিন কী সিনেমাতে অভিনয় করবেন না?
অভিনয় করব না, এ কথা কখনোই বলিনি। যদি গল্প ভালোলাগে অবশ্যই করব। যতদিন বেঁচে থাকব অভিনয় করব এমন আশা নিয়েই বেঁচে থাকব। শেষ নিঃশ^াস পর্যন্ত অভিনয় করার প্রত্যাশা রাখি।
২৭ বছর ধরে অভিনয় করছেন না, খারাপ লাগে নাÑ কষ্ট হয় না?
খারাপ লাগে, কষ্ট হয়। কিন্তু বাস্ততবতা মেনে নেই আমি। যখন কোনো অনুষ্ঠানের জন্য মেকাপ নিতে হয়, রেডি হতে হয়Ñ তখন খুব মনে পড়ে ফেলে আসা দিনের কথা। গত ৪ জুন বাসায় একটি অনুষ্ঠান ছিল। মেকাপ নিচ্ছিলাম, শাড়ি পরছিলামÑ পুরোপুরি প্রস্তুতি নিতে অনেক সময় লাগছিল, কষ্ট হচ্ছিল-তারপরও ভালোলাগছিল এই ভেবে যে ক্যামেরার সামনে বসব, কথা বলব। আয়োজনে যখন প্রবেশ করি তখন সাংবাদিক অভি মঈনুদ্দীন আমাকে ফুল দিয়ে বরণ করে নেয়, তখন আয়নাতে ওই মুখ দেখবে যখন গানটি বাজছিল ব্যাকগ্রাউন্ড মিউজিক হিসেবে মুহূর্তেই আমি ফেলে আসা দিনে চলে গিয়েছিলাম। কী যে ভালোলাগছিল বলে বুঝানোর মতো নয়।
নায়ক রহমান, নায়ক রাজ রাজ্জাক-দুজনের সঙ্গেই আপনার অভিনীত সিনেমা বহুল আলোচিত ছিল। তারা নেই এখন আর, মিস করেন তাদের?
অবশ্যই, খুব মিস করি। মাঝে মাঝে এমনও মনে হয় ইস পুরোনো দিনগুলো যদি আবার ফিরে পেতাম, আবার গল্প করতে পারতাম তাদের সঙ্গে। কারণ এই দুজনের সঙ্গে আমি অনেক সিনেমাতে অভিনয় করেছি। রহমান-শবনম জুটি জনপ্রিয় ছিল। নায়ক রাজের সঙ্গে নাচের পুতুল-সিনেমাটি করার পর আরও অনেক সিনেমাতে অভিনয় করার প্রস্তাব পেয়েছিলাম। সেই সময় পরপর না করতে পারলেও পরে ‘সন্ধি’, ‘শর্ত’ সিনেমাতেও অভিনয় করেছি।
এফডিসিতে যাওয়া হয় আপনার?
হঠাৎ মন চাইলে রাতে একা একা ঘুরে আসি। কষ্ট হয়, খারাপ লাগে কী ছিল এফডিসি আর কী হয়ে গেল।
এই যে রাষ্ট্রীয় সম্মাননা পেতে যাচ্ছেন, শিল্পী সমিতি বা শিল্পীরা কেউ কী আপনাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন?
সমিতি থেকে আসলে তাদের নিজেদের প্রয়োজন ছাড়া ফোন করে না, বিশেষ কোনো দরকার হলেই ফোন করে। আমার এই রাষ্ট্রীয় সম্মাননাপ্রাপ্তিতে সমিতি থেকে কেউই আমাকে ফোন করেনি। অভিনন্দন জানায়নি। এমন কী আমি অনেক সিনিয়র শিল্পীর সম্মাননাপ্রাপ্তিতে তাদের অভিনন্দন জানিয়েছি। শুধু নায়ক নাইম এবং নায়িকা পূর্ণিমা আমাকে ফোন করেছিল, অভিনন্দন জানিয়েছে। আর সাংবাদিক অনেকেই ফোন করেছিল।
এখন সময় কাটে কীভাবে?
আমার স্বামী রবিন ঘোষ (প্রখ্যাত সুরকার, সংগীত পরিচালক) মারা যাবার পর আমার একমাত্র ছেলে রনিই আমার দেখভাল করছে। ও চাইলেও দেশের বাইরে চলে যেতে পারত। কিন্তু আমার কথা ভেবেই ও দেশে থেকে গেল। আমাকে একটা মুহূর্তের জন্য চোখের আড়াল করতে চায় না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন