গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ, অর্থাৎ ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬-এর কাউন্টডাউন শুরু হয়ে গেছে। মাঠের উত্তাপ ও গ্যালারির গর্জন আছড়ে পড়তে বাকি আর মাত্র কয়েকটি দিন। ফুটবল বিশ্বের এই মহামিলনমেলাকে সামনে রেখে আজ আমরা ফিরে যাব ফুটবল ইতিহাসের সেই আদি লগ্নে, যেখানে প্রতিকূলতা ও উপেক্ষার ছাইচাপা আগুন থেকে জন্ম নিয়েছিল বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ও রাজকীয় এই টুর্নামেন্টের।
ইতিহাসের পেছনে লুকিয়ে আছে এক চরম নাটকীয়তা ও কূটনৈতিক টানাপোড়েন। ১৯৩২ সালের অলিম্পিক গেমসের আয়োজক দেশ ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু সে সময় আটলান্টিকের ওপারে রাগবি বা বেসবলের দাপটে ফুটবলের প্রতি মার্কিনিদের তেমন কোনো আগ্রহ বা জনপ্রিয়তা ছিল না। ফলে মার্কিন অলিম্পিক কমিটি তাদের আয়োজনে ফুটবল ইভেন্টটি রাখার ব্যাপারে একেবারেই অনীহা প্রকাশ করে এবং চূড়ান্ত তালিকায় ফুটবলকে বাদ দিয়ে দেয়।
ফুটবলের প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের এই চরম উদাসীনতা ও অবহেলা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারেননি তৎকালীন ফিফা প্রেসিডেন্ট জুলে রিমে। ফুটবলকে অলিম্পিকের বৃত্ত থেকে বের করে একটি সম্পূর্ণ স্বাধীন, পেশাদার এবং বৈশ্বিক টুর্নামেন্টে রূপ দেওয়ার স্বপ্ন ছিল তার দীর্ঘদিনের। অলিম্পিক কমিটির এই একপেশে সিদ্ধান্তের মোক্ষম জবাব দিতে জুলে রিমে ১৯২৮ সালের ফিফা কংগ্রেসে প্রতি চার বছর পর পর একটি একক ফুটবল টুর্নামেন্ট আয়োজনের ঐতিহাসিক ঘোষণা দেন। সেই এক জেদ, আত্মসম্মানবোধ ও দূরদর্শী ঘোষণাতেই জন্ম হয়েছিল আজকের ফিফা বিশ্বকাপের।
প্রথম ফিফা বিশ্বকাপ আয়োজনের দায়িত্ব পাওয়ার জন্য ইউরোপের ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেনের মতো বেশ কয়েকটি দেশ লাইনে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু সবাইকে চমকে দিয়ে লাতিন আমেরিকার দেশ উরুগুয়ের রাজধানী মোন্তেভিডিওকে বেছে নেয় ফিফা। উরুগুয়েকে বেছে নেওয়ার পেছনে ছিল জোরালো ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক কারণ। ১৯৩০ সাল ছিল উরুগুয়ের স্বাধীনতার শতবর্ষ। তা ছাড়া তারা অলিম্পিকে টানা দুবারের (১৯২৪ ও ১৯২৮) স্বর্ণজয়ী দল হিসেবে বিশ্বের অন্যতম সেরা শক্তি ছিল। উরুগুয়ে সরকার আরেকটি অভাবনীয় প্রস্তাব দেয়, অংশগ্রহণকারী সব দলের যাতায়াত ও আবাসন খরচ তারা বহন করবে এবং টুর্নামেন্টের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন স্টেডিয়াম তৈরি করবে।
তবে এই সিদ্ধান্ত ইউরোপীয় পরাশক্তিদের অহংকারে আঘাত হানে। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে সুদূর লাতিন আমেরিকায় গিয়ে খেলা সাধ্য ও সময়ের সাপেক্ষে অসম্ভব, এই অজুহাতে তৎকালীন ইউরোপীয় ফুটবল শক্তিগুলো টুর্নামেন্টটি বয়কট করার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে টুর্নামেন্ট শুরুর মাত্র দুই মাস আগেও ইউরোপের কোনো দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত ছিল না। শেষ মুহূর্তে জুলে রিমের ব্যক্তিগত কূটনৈতিক তৎপরতা এবং উরুগুয়ের অর্থায়নে মাত্র চারটি ইউরোপীয় দেশ রাজি হয়।
সব শঙ্কা ও অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে ১৯৩০ সালের জুলাই মাসে উরুগুয়ের মাটিতে সুচিত হয় এক নতুন যুগের। মোট ১৩টি দলের অংশগ্রহণে শুরু হয় প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ। আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিতে ইউরোপীয় দলগুলোকে দীর্ঘ দুই সপ্তাহ জাহাজে কাটাতে হয়েছিল। রোমানিয়া, ফ্রান্স ও বেলজিয়ামের খেলোয়াড়রা ‘এসএস কন্তে ভের্দে’ নামক জাহাজে চড়ে রওনা হন, যে জাহাজে স্বয়ং জুলে রিমে বিশ্বকাপের সোনালি ট্রফিটি স্যুটকেসে ভরে নিয়ে যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে যুগোস্লাভিয়া দল রওনা হয় ‘ফ্লোরিডা’ নামক অন্য একটি জাহাজে।
লাতিন আমেরিকা থেকে স্বাগতিক উরুগুয়েসহ অংশ নেয় ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা, প্যারাগুয়ে, বলিভিয়া, চিলি ও পেরু। আর উত্তর আমেরিকা থেকে অংশ নেয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকো। এই ১৩টি দেশকে নিয়েই রচিত হয় বিশ্বকাপের প্রথম পটভূমি।
১৯৩০ সালের কনকনে শীতে, ১৩ থেকে ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত হয় ফিফার প্রথম বিশ্বকাপ। লাতিন আমেরিকার তীব্র শীতের আবহাওয়া সত্ত্বেও গ্যালারিতে দর্শকদের উন্মাদনার কমতি ছিল না। টুর্নামেন্টের সবগুলো ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয় মোন্তেভিডিওর তিনটি স্টেডিয়ামে, যার মধ্যে নবনির্মিত ‘এস্তাদিও সেন্সেনারিও’ ছিল অন্যতম স্থাপত্যশৈলী। ১৩টি দলকে ভাগ করা হয়েছিল চারটি গ্রুপে। গ্রুপ পর্বের লড়াইয়ে পেশাদারিত্ব দেখিয়ে নিজ নিজ গ্রুপে চ্যাম্পিয়ন হয়ে সেমিফাইনালের টিকিট নিশ্চিত করে লাতিন আমেরিকার দুই ফুটবল পরাশক্তি আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে এবং ইউরোপের যুগোস্লাভিয়া ও উত্তর আমেরিকার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।
ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে দুই সেমিফাইনালই দেখেছে গোলের বন্যা এবং লাতিন ফুটবলের একচ্ছত্র আধিপত্য। প্রথম সেমিফাইনালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে ৬-১ গোলের বিশাল ব্যবধানে উড়িয়ে দিয়ে ফাইনালে ওঠে আর্জেন্টিনা। আলবিসেলেস্তেদের আক্রমণভাগের সামনে দাঁড়াতেই পারেনি মার্কিনিরা। দ্বিতীয় সেমিফাইনালে যুগোস্লাভিয়ার মুখোমুখি হয় স্বাগতিক উরুগুয়ে। ইউরোপের প্রতিনিধি যুগোস্লাভিয়া শুরুতে গোল দিয়ে এগিয়ে গেলেও উরুগুইয়ান ফুটবলের ছন্দের কাছে তারা ধূলিসাৎ হয়ে যায়। উরুগুয়েও ঠিক ৬-১ গোলের একই ব্যবধানে যুগোস্লাভিয়াকে পরাজিত করে ফাইনালে পা রাখে। ফলে ফুটবলবিশ্ব অবলোকন করে এক ঐতিহাসিক প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ‘রিও দে লা প্লাটা’ ফাইনালের।
ফিফা বিশ্বকাপের ইতিহাসে প্রথম গোলদাতার নাম সোনালি অক্ষরে লেখা রয়েছে ফ্রান্সের লুসিয়ে লঁরোর নামে। ১৩ জুলাই পোসিটোস স্টেডিয়ামে মেক্সিকোর বিপক্ষে ম্যাচের ১৯তম মিনিটে দৃষ্টিনন্দন গোল করে বিশ্বকাপের খাতা খোলেন তিনি। ম্যাচটিতে ফ্রান্স ৪-১ ব্যবধানে জয়ী হয়।
প্রথম বিশ্বকাপে সর্বোচ্চ গোলদাতা হয়েছিলেন আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি স্ট্রাইকার গুলের্মো স্টেবাইল। টুর্নামেন্টের প্রথম ম্যাচে দলে জায়গা না পেলেও পরবর্তী ম্যাচগুলোতে তিনি হ্যাটট্রিকসহ মোট ৮টি গোল করে ‘গোল্ডেন বুট’ (পরবর্তীতে স্বীকৃত) নিজের করে নেন। চারটি গোল করে যৌথভাবে দ্বিতীয় স্থানে ছিলেন উরুগুয়ের পেদ্রো গিয়া এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বার্ট পেটেনাউডে, যিনি বিশ্বকাপের ইতিহাসের প্রথম হ্যাটট্রিকটি করেছিলেন প্যারাগুয়ের বিরুদ্ধে। ৩০ জুলাই মোন্তেভিডিওর এস্তাদিও সেন্সেনারিওতে প্রায় ৯৩ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে ফাইনালের মহারণে নামে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে। কিন্তু ম্যাচ শুরুর আগেই সৃষ্টি হয় জটিলতা। দুই দলই নিজেদের দেশের তৈরি ফুটবল দিয়ে খেলতে অনড় থাকে। শিরোপা নির্ধারণী ম্যাচের শুরুটা করবে কে, আর কোন বল দিয়ে খেলা হবে, সে বিষয়ে একমত হতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ফিফা হস্তক্ষেপে অভিনব রফা হয়। সিদ্ধান্ত হয় যে, প্রথমার্ধে খেলা হবে আর্জেন্টিনার সরবরাহ করা বল দিয়ে এবং তারা ম্যাচ শুরু করবে। আর দ্বিতীয়ার্ধে খেলা হবে উরুগুয়ের বল দিয়ে এবং তারা খেলা শুরু করবে। নিজেদের বলে প্রথমার্ধে আর্জেন্টিনা ২-১ ব্যবধানে এগিয়ে থেকে আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু দ্বিতীয়ার্ধে উরুগুয়ের নিজস্ব বল আসতেই বদলে যায় ম্যাচের দৃশ্যপট। স্বাগতিকদের চেনা মাঠ আর পরিচিত বলের ছন্দে দিশাহারা হয়ে পড়ে আর্জেন্টিনার রক্ষণভাগ। একে একে পাবলো সেয়া, সান্তোস ইয়ারিয়েত এবং ম্যাচের শেষ মিনিটে এক হাত হারানো কিংবদন্তি হেক্টোর কাস্ত্রোর গোলে উরুগুয়ে ৪-২ ব্যবধানে জয় সুনিশ্চিত করে। জুলে রিমের হাত থেকে প্রথম ট্রফি ‘ভিক্টরি’ গ্রহণ করে উরুগুয়ের অধিনায়ক হোসে নাসাজ্জি। মোন্তেভিডিওর রাত রূপ নেয় উৎসবের নগরীতে, আর বিশ্ব ক্রীড়াঙ্গনে যাত্রা শুরু করে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ মহাকাব্য।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন