ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও উপকূলীয় দুর্যোগের সময় যেমন সুন্দরবন প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে কাজ করে, তেমনি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলকে রক্ষা করে গহিরা প্যারাবন। অথচ সেই সংরক্ষিত বনাঞ্চল এখন লুটেরাদের থাবায় বিপন্ন। বন বিভাগের সংরক্ষিত এলাকা ও এর আশপাশ থেকে মাটি কেটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশবিদ ও স্থানীয়দের মতে, এভাবে চলতে থাকলে উপকূলীয় পরিবেশ ও জনপদ বড় ঝুঁকির মুখে পড়বে। চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার রায়পুর ইউনিয়নে শঙ্খ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় গড়ে ওঠা গহিরা প্যারাবন একসময় ছিল সবুজ বেষ্টনী। উপকূলীয় দুর্যোগের সময় এই বন ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে বহুবার। কিন্তু দখল, গাছ নিধন ও মাটি কাটার কারণে বনটি এখন অস্তিত্ব সংকটে।
১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিলের ভয়াল ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের স্মৃতি আজও ভুলতে পারেননি চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের প্রবীণ বাসিন্দারা। সেই দুর্যোগে প্রাণহানি ও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির পর উপকূলবাসীকে সুরক্ষা দিতে ১৯৯১-৯২ অর্থবছরে বন বিভাগ গহিরা উপকূলে প্রায় ২৫০ একর এলাকাজুড়ে কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির গাছ রোপণ করে। তিন দশকে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সেই প্যারাবনই আজ উপকূলের অন্যতম প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মানবসৃষ্ট আগ্রাসনের শিকার হয়েছে এই বন। স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার পালাবদল হলেও বন উজাড় ও দখলের প্রবণতা বন্ধ হয়নি। আগে গাছ কেটে বন ধ্বংস করা হয়েছে, এখন কেটে নেওয়া হচ্ছে মাটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে প্রভাবশালী রাজনৈতিক মহলের ছত্রচ্ছায়ায় প্যারাবনের প্রায় ১৫ একর এলাকা উজাড় করে সেখানে মাছ ও চিংড়ির ঘের তৈরি করা হয়। বনভূমির গাছ কেটে চারপাশে বাঁধ নির্মাণ করে পানি আটকে এসব ঘের গড়ে তোলা হয়েছিল।
সম্প্রতি সরেজমিনে গহিরা উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, বনের ভেতরে ও সংলগ্ন এলাকায় এক্সাভেটর দিয়ে মাটি কেটে বিশাল গর্ত তৈরি করা হয়েছে। কোথাও কোথাও সেই গর্তগুলো কৃত্রিম হ্রদ বা মৎস্য প্রকল্পের মতো রূপ নিয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, বর্তমানে চলমান উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহার করার জন্য এই মাটি নেওয়া হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, কাজের সঙ্গে যুক্ত একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট খরচ কমিয়ে অধিক মুনাফা অর্জনের উদ্দেশ্যে সংরক্ষিত প্যারাবন থেকেই মাটি সংগ্রহ করছে। ফলে বনের স্বাভাবিক জোয়ার-ভাটার প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে এবং বহু গাছের শিকড় উন্মুক্ত হয়ে পড়ছে।
গহিরা এলাকার প্রবীণ বাসিন্দা মো. ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আগে গাছ কেটে মাছের ঘের বানানো হয়েছে। এখন মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। বনটা শেষ হয়ে গেলে সাগরের পানি একদিন আমাদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।’
অনুসন্ধানে আরও জানা যায়, আনোয়ারা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে একটি উপকূলীয় বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রকল্পটির মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুন’।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মূল কাজের একটি অংশ স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং তারাই বনাঞ্চল থেকে মাটি কেটে বাঁধে ব্যবহার করছেন। যদিও অভিযোগ অস্বীকার করে অভিযুক্ত স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ বলেন, ‘আমি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত নই। মূল ঠিকাদার কোথা থেকে মাটি সংগ্রহ করছে, সে বিষয়ে তারাই মন্তব্য দিতে পারবে।’ তবে এ বিষয়ে জানতে চাইলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কোনো কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, ‘আমরা প্রকল্পের নকশা ও কাজের গুণগত মান তদারকি করি। মাটি কোথা থেকে আনা হচ্ছে, সে বিষয়ে স্থানীয়দের অভিযোগ শুনেছি। ঠিকাদারকে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে মাটি না কাটার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’ অন্যদিকে বন বিভাগের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। দীর্ঘদিন ধরে বন উজাড় ও মাটি কাটার অভিযোগ থাকলেও কার্যকর পদক্ষেপ চোখে পড়েনি বলে দাবি তাদের।
বাঁশখালী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার খায়রুল আলম বলেন, ‘আমি নতুন দায়িত্ব নিয়েছি। বিষয়টি পরিদর্শন করেছি। নথিপত্র যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম. এ. হাসান বলেন, ‘উপকূলীয় প্যারাবন থেকে মাটি কাটা বা বন উজাড় সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে তদন্ত টিম পাঠানো হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ এদিকে এ বিষয়ে জানতে আনোয়ারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মহিন উদ্দিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যারাবন শুধু ঝড়-জলোচ্ছ্বাসের আঘাত কমায় না, বরং উপকূলীয় মাটি সংরক্ষণ, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাব মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) চট্টগ্রাম বিভাগীয় সমন্বয়ক মনিরা পারভীন বলেন, ‘উপকূলীয় বনাঞ্চল থেকে মাটি কাটা আইনত দ-নীয় অপরাধ। বেড়িবাঁধ রক্ষার নামে যদি প্যারাবন ধ্বংস করা হয়, তাহলে সেই বাঁধও দীর্ঘমেয়াদে টিকবে না।’
পরিবেশকর্মী রিতু পারভীন বলেন, ‘জলবায়ু পরিবর্তনের এই সময়ে বন সংরক্ষণ জরুরি। অথচ রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে রাষ্ট্রীয় সম্পদ ধ্বংস করা হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হবে।’
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলের প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর হিসেবে কাজ করে। গাছ কাটা ও মাটি অপসারণের ফলে বন দুর্বল হয়ে পড়বে এবং ভবিষ্যতে জলোচ্ছ্বাস ও ভাঙনের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাবে।’
স্থানীয়দের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে প্যারাবন ধ্বংস, মাটি কাটা এবং বনভূমি দখলের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে হবে। অন্যথায় একসময় উপকূলের এই প্রাকৃতিক রক্ষাকবচ হারিয়ে যেতে পারে, যার চরম মূল্য দিতে হবে উপকূলবাসীকেই।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন