× UCB Sticker Card
বুধবার, ১০ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

শিব্বির আহমেদ রানা, গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

যখন সমাজ ছিল পরিবার, মানুষ ছিল আত্মীয়

শিব্বির আহমেদ রানা, গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট

প্রকাশিত: জুন ১০, ২০২৬, ০৬:৫০ এএম

যখন সমাজ ছিল পরিবার, মানুষ ছিল আত্মীয়

সময়ের স্রোত কখনো উল্টো পথে চলে না। ইতিহাসের পাতায়, স্মৃতির ভাঁজে কিংবা মানুষের দীর্ঘশ্বাসে অতীতকে যতই খুঁজে ফিরি, হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো আর ফিরে আসে না। তবুও কিছু সময়, কিছু সমাজব্যবস্থা, কিছু মানবিক সম্পর্ক আমাদের বারবার ভাবায়। আমরা কী হারিয়েছি, আর কী পেয়েছি? সেই প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয় বাংলার সেকালের গ্রামীণ সমাজব্যবস্থা।

একসময় গ্রামের জীবন ছিল সরল, ধীরস্থির এবং গভীর মানবিকতায় পরিপূর্ণ। বিয়ের আয়োজন ছিল সামাজিক উৎসবের নামান্তর। পালকিতে চড়ে নববধূ শ্বশুরবাড়ি যেতেন, সঙ্গে থাকত অজানা ভবিষ্যতের স্বপ্ন আর শঙ্কা। প্রযুক্তি ছিল না, যোগাযোগের সহজ মাধ্যম ছিল না, কিন্তু মানুষের হৃদয়ের দূরত্বও ছিল না। আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী ও গ্রামের মানুষ একে অপরের সুখ-দুঃখের অংশীদার ছিলেন।

গ্রামের সকাল শুরু হতো ধর্মচর্চা, কর্মব্যস্ততা ও পারস্পরিক সৌহার্দ্যরে মাধ্যমে। সন্ধ্যা নামত গল্প, আড্ডা আর সামাজিক বন্ধনের উষ্ণতায়। তখন কাচারিঘর, দহলিজ কিংবা পুকুরঘাট ছিল মানুষের মিলনমেলা। সেখানে মোবাইল ফোনের পর্দা নয়, মুখোমুখি কথোপকথনই ছিল সম্পর্কের প্রধান মাধ্যম। মানুষ একে অপরের খোঁজ রাখত, বিপদে পাশে দাঁড়াত, আনন্দ ভাগাভাগি করত।

আজ আমরা প্রযুক্তির বিশ্বগ্রামে বিস্ময়কর উন্নয়নের যুগে বাস করছি। পৃথিবী হাতের মুঠোয় চলে এসেছে। কিন্তু প্রশ্ন হলোÑ মানুষ কি মানুষের আরও কাছাকাছি এসেছে? সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হাজারো বন্ধু থাকলেও প্রকৃত বন্ধু ও প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের গভীরতা কি বেড়েছে? বাস্তবতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই এর উল্টোটা ঘটেছে। ব্যক্তি ক্রমেই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছে, পারিবারিক ও সামাজিক বন্ধন দুর্বল হচ্ছে।

সেকালের গ্রামীণ সমাজে সর্দার প্রথা ছিল স্থানীয় নেতৃত্ব ও সামাজিক শৃঙ্খলার প্রতীক। সব সিদ্ধান্ত নিখুঁত ছিল, এমন দাবি করা যাবে না; তবুও সমাজে প্রবীণদের প্রতি শ্রদ্ধা, ন্যায়বোধ এবং সামাজিক জবাবদিহিতা ছিল দৃশ্যমান। মুরব্বিদের কথা গুরুত্ব পেত, তাদের অভিজ্ঞতা সমাজ পরিচালনায় ভূমিকা রাখত। আজ আইন ও প্রশাসনিক কাঠামো অনেক শক্তিশালী হলেও সামাজিক মূল্যবোধের অবক্ষয় আমাদের নতুন করে ভাবতে বাধ্য করছে।

অতীতের গ্রামগুলোতে পাকা প্রাচীর, লোহার গেট কিংবা উন্নত নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না। বাঁশের বেড়া আর খোলা উঠানেই মানুষ নিরাপদ বোধ করত। কারণ নিরাপত্তা তখন শুধু তালা-চাবির ওপর নির্ভর করত না; নির্ভর করত সামাজিক বিশ্বাস ও পারস্পরিক আস্থার ওপর। আজ উঁচু দেয়াল আছে, সিসি ক্যামেরা আছে, ডিজিটাল নিরাপত্তা আছে; কিন্তু মানুষের মনে অনিশ্চয়তা ও অবিশ্বাসও বেড়েছে।

তবে অতীতকে মহিমান্বিত করতে গিয়ে তার সীমাবদ্ধতাগুলো ভুলে যাওয়া উচিত নয়। নারীর স্বাধীনতা সীমিত ছিল, শিক্ষার সুযোগ ছিল কম, স্বাস্থ্যসেবা ও যোগাযোগব্যবস্থা ছিল অনুন্নত। আধুনিক সমাজ এসব ক্ষেত্রে অনেক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তাই অতীতের প্রতি ভালোবাসা মানে বর্তমানকে অস্বীকার করা নয়। বরং অতীতের মানবিক মূল্যবোধকে বর্তমানের উন্নয়নের সঙ্গে সমন্বয় করাই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য। বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য ছিল সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সেই আবহ। গ্রামীণ মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা সামাজিক আয়োজনে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের অংশগ্রহণ ছিল স্বাভাবিক ঘটনা। এক সম্প্রদায়ের আনন্দে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষও শামিল হতো। প্রতিবেশীর বিপদ মানেই ছিল নিজের বিপদ। আজ যখন বিভাজন, বিদ্বেষ ও অসহিষ্ণুতার নানা চিত্র সমাজকে উদ্বিগ্ন করে, তখন সেই সম্প্রীতির ঐতিহ্য আমাদের জন্য শিক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

বর্তমান সমাজে সংগঠন, সমিতি ও কমিটির সংখ্যা বেড়েছে; কিন্তু অনেক ক্ষেত্রে আন্তরিকতা ও সামাজিক সংহতি কমেছে। সভা-সেমিনার বেড়েছে, কিন্তু হৃদয়ের সংযোগ কমেছে। উন্নয়ন হয়েছে অবকাঠামোর, কিন্তু মানবিকতার উন্নয়ন কি একই গতিতে এগিয়েছে? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা আজ জরুরি। সত্যিই, সেদিন আর ফিরে আসবে না। পালকি, দহলিজের আড্ডা, মাটির ঘর কিংবা পুকুরঘাটকেন্দ্রিক সেই জীবনধারা ইতিহাসের অংশ হয়ে গেছে। কিন্তু সেই সময়ের মানবিকতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং সম্প্রীতির চেতনা এখনো ফিরিয়ে আনা সম্ভব। আধুনিকতার সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি যদি আমরা সেই মূল্যবোধগুলোকে ধারণ করতে পারি, তবে ভবিষ্যতের সমাজ আরও সুন্দর, সহনশীল ও মানবিক হয়ে উঠবে।

অতীতের প্রতি নস্টালজিয়া আমাদের আবেগ দেয়, কিন্তু তার শিক্ষা আমাদের পথ দেখায়। তাই হারিয়ে যাওয়া দিনের জন্য শুধু দীর্ঘশ্বাস নয়, সেখান থেকে প্রাপ্ত মানবিক মূল্যবোধকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার। কারণ সেদিন আর আসিবে না ফিরে, কিন্তু সেদিনের সুন্দর মানুষ হওয়ার শিক্ষা আজও আমাদের পথ আলোকিত করতে পারে।

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!