একে অপরের ওপর সামরিক হামলার পর এবার নতুন করে পাল্টাপাল্টি হুঁশিয়ারি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তারা। ট্রাম্প স্পষ্ট ভাষায় জানিয়েছেন, তেহরান একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে ‘অনেক বেশি সময়’ অপচয় করেছে এবং এখন এর জন্য তাদের ‘চরম মূল্য দিতে হবে’। যদিও এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত কোনো ব্যাখ্যা দেননি। ইরান ‘সম্পূর্ণরূপে পরাজিত’ হয়েছে এবং তারা ‘কাজের চেয়ে কথাই বেশি বলে’ বলেও মন্তব্য করেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট।
ডোনাল্ড ট্রাম্পের এমন মন্তব্য আসার আগেই ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, তার দেশ ‘কোনো হামলা বা হুমকির উপযুক্ত জবাব দিতে বাকি রাখবে না।’ একই সঙ্গে যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্র ‘পরাজয় বরণ করেছে’ বলেও দাবি করেন তিনি।
পারস্য উপসাগরে উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হামলা :
গতকাল বুধবার পারস্য উপসাগরে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি হেলিকপ্টার ভূপাতিত করার পর যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ইরানের বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়। এর জবাবে ইরানও ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলো লক্ষ্য করে পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়।
যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি এলাকায় অবস্থিত ইরানের প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, স্থল নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র ও রাডার স্টেশনগুলো লক্ষ্য করে এই হামলা চালানো হয়েছে। অন্যদিকে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) দাবি করেছে, তারা ওই অঞ্চলে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর ২১টি লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হেনেছে, যার মধ্যে বাহরাইন ও জর্ডানের ঘাঁটিও রয়েছে। এদিকে কুয়েতের সেনাবাহিনীও জানিয়েছে, তারা একটি হামলা প্রতিহত করেছে।
ট্রাম্পের কড়া বার্তা : বুধবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ দেওয়া এক পোস্টে ট্রাম্প লেখেন, ‘ইরানের সামরিক বাহিনী এখন সম্পূর্ণ বিপর্যস্ত। তাদের নৌ ও বিমান বাহিনীর বড় অংশেরই এখন আর কোনো অস্তিত্ব নেই, তারা পুরোপুরি পরাজিত।’ তিনি যোগ করেন, ‘একটি চুক্তিতে পৌঁছানোর জন্য তারা অনেক বেশি সময় নষ্ট করেছে, যা তাদের জন্যই ভালো হতে পারত। এখন তাদের এর খেসারত দিতে হবে!’
ট্রাম্পের সুর বদল ও কূটনৈতিক স্থবিরতা :
ট্রাম্পের এই আক্রমণাত্মক মনোভাব গত মঙ্গলবারের বক্তব্যের সম্পূর্ণ বিপরীত। ওই দিন তিনি সাংবাদিকদের বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান ‘একটি অত্যন্ত চমৎকার চুক্তির একেবারে শেষ পর্যায়ে রয়েছে।’
এদিকে বুধবার ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাকাঈ যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ‘পরস্পরবিরোধী বার্তা পাঠানো, বারবার অবস্থান ও দাবি পরিবর্তন এবং সবচেয়ে বড় কথাÑ বারবার যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের মাধ্যমে চলমান কূটনৈতিক প্রক্রিয়াকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।’ তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরানকে এখন নতুন করে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করতে হবে। কারণ যেকোনো সফল কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার জন্য ন্যূনতম স্থিতিশীলতা বজায় থাকা অপরিহার্য।
অচলাবস্থার অবসান চান ইরানি প্রেসিডেন্ট :
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ‘যুদ্ধও নয়, শান্তিও নয়’ এমন পরিস্থিতি থেকে ইরানকে অবশ্যই বেরিয়ে আসতে হবে। রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনা জানায়, তেহরানে একটি অনুষ্ঠানে তিনি এ মন্তব্য করেন। প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান বলেন, ‘যুদ্ধ কখনোই দেশের স্বার্থে আসে না। তবে কেউ যদি আমাদের মর্যাদা, ভূখ- বা সার্বভৌমত্বে আঘাত হানতে চায়, আমরা কোনোভাবেই আত্মসমর্পণ করব না।’ যুদ্ধ ও সংকটের সময় দেশ পরিচালনা করা ‘কঠিন’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, যেকোনো বিপর্যয় মোকাবিলায় সমাজের সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে একতা ও সহযোগিতা প্রয়োজন।
দক্ষিণ লেবাননে ইসরায়েলি তা-বে নিহত ১৩ :
দক্ষিণ লেবাননের সোর (টায়ার) শহর ও এর আশপাশের এলাকায় ইসরায়েলি বিমান হামলায় অন্তত ১৩ জন নিহত এবং ১৫ জন আহত হয়েছে। লেবাননের জাতীয় বার্তা সংস্থা এনএনএ এই তথ্য জানিয়েছে। খবরে বলা হয়, তিরদাবা শহরে ৯ জন নিহত ও সাতজন আহত হয়েছে। অন্যদিকে, দেইর কানুন শহরে প্রাণ হারিয়েছে তিনজন এবং আহত হয়েছে আরও তিনজন। সোর শহরেও অন্তত একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে নিখোঁজদের উদ্ধারে কাজ করছেন উদ্ধারকর্মীরা।
লেবাননে তদন্তকারী দল পাঠাচ্ছে জাতিসংঘ :
লেবাননে চলমান যুদ্ধে আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনাগুলো খতিয়ে দেখতে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক প্রধান ভলকার তুর্ক সেখানে একটি তদন্তকারী দল পাঠানোর ঘোষণা দিয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মুখে থাকা ইরানের প্রতি সংহতি জানিয়ে গত ২ মার্চ হিজবুল্লাহ ইসরায়েলে পাল্টা আঘাত হানলে লেবানন এই বৃহত্তর সংঘাতের মুখোমুখি হয়। এর জের ধরে ইসরায়েল লেবাননে ব্যাপক বিমান হামলা ও স্থল অভিযান শুরু করে। ইসরায়েলের এই আগ্রাসনে এ পর্যন্ত ৩ হাজার ৬৬০ জনেরও বেশি মানুষ নিহত হয়েছে এবং বাস্তুচ্যুত হয়েছে ১০ লাখেরও বেশি।
‘ইসরায়েলি গুন্ডামি না থামালে ভুগবে পুরো বিশ্ব’ :
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলের হামলা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে, যা তুরস্কের জন্যও সরাসরি হুমকি তৈরি করছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, ইসরায়েলের এই আগ্রাসন গোটা বিশ্বের জন্য বিপদ এবং একে এখনই থামাতে হবে। সংসদে আইনপ্রণেতাদের উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে এরদোয়ান বলেন, ‘যদি এই ইসরায়েলি গুন্ডামি বন্ধ করা না হয়, তাহলে এর পরিণতি পুরো অঞ্চলসহ সমগ্র মানবজাতিকে ভোগ করতে হবে। ইসরায়েলকে থামানো এখন মানবতার ও মানবিক ফ্রন্টের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব।’
তেহরানে কাতারের প্রতিনিধিদল :
দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক ও আঞ্চলিক ভূ-রাজনীতি নিয়ে আলোচনার লক্ষ্যে কাতারের একটি উচ্চপর্যায়ের প্রতিনিধিদল ইরানের রাজধানী তেহরানে পৌঁছেছে। ইরানের স্থানীয় সংবাদমাধ্যম ইসান এ তথ্য নিশ্চিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, এই সফরের মূল আলোচ্য বিষয়গুলোর মধ্যে অন্যতম হলোÑ চলমান যুদ্ধ অবসানের কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ও প্রক্রিয়া। তবে এই সফর নিয়ে কাতারের সরকারি কর্মকর্তাদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরমাণু সংস্থাকে মার্কিন ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ না বানানোর আহ্বান :
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) বোর্ড অব গভর্নরসের সদস্যদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, এই সংস্থাকে যেন যুক্তরাষ্ট্রের ‘রাজনৈতিক হাতিয়ার’ হিসেবে ব্যবহার করতে দেওয়া না হয়। তিনি বোর্ড সদস্য দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের কাছে এই মর্মে একটি চিঠি পাঠিয়েছেন। চিঠিতে আরাগচি ইরানের পরমাণু কর্মসূচির বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের আনা খসড়া প্রস্তাবকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ ও ‘দুরভিসন্ধিমূলক’ বলে আখ্যা দেন। ভিয়েনায় চলমান আইএইএর ত্রৈমাসিক বৈঠকে এই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা রয়েছে। আরাগচি জোর দিয়ে বলেন, বর্তমান সংকটের জন্য যুক্তরাষ্ট্রই দায়ী এবং তাদের বেআইনি পদক্ষেপের পক্ষে এই আন্তর্জাতিক সংস্থাকে ব্যবহার করতে দেওয়া উচিত হবে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন