দেশের শিক্ষার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীনে এনসিটিবি প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, উন্নয়ন, পরিমার্জন এবং পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বিনামূল্যে শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবই বিতরণের দায়িত্ব পালন করে। ২০১০ সাল থেকে সরকার এনসিটিবির মাধ্যমে প্রতি শিক্ষাবর্ষে প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক, ইবতেদায়ি ও দাখিল এবং কারিগরি শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে বই বিতরণ করছে। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে সারাদেশের সকল শিক্ষার্থীর মাঝে ৩১ কোটি বই বিতরণে কাজ শুরু করেছে এনসিটিবি।
সরকারের বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচি বর্তমানে দেশের শিক্ষার প্রসারে সবচেয়ে বড় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী হিসেবে কাজ করছে। শিক্ষাক্রম প্রণয়ন, উন্নয়ন ও পরিমার্জনের মাধ্যমে প্রাক-প্রাথমিক থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার ভিত রচনার পাশাপাশি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন শিক্ষার্থীদের হাতে বই তুলে দেওয়ার কাজটি তাই এনসিটিবির জন্য একাধারে গৌরব ও চ্যালেঞ্জের ইস্যু হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বই বিতরণ কর্মসূচিটি কেন চ্যালেঞ্জের? কারণ এর আর্থিক সংশ্লেষ রয়েছে। শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনুপাতে প্রতিবছর পাঠ্যবই ছাপার সংখ্যা কম-বেশি হলেও এ খাতে ব্যয়ের বাজেট বেড়ে বর্তমানে প্রায় ষোলশ কোটির বেশি। আবার বাজেটের অর্থ খরচ করেও শিক্ষাবর্ষের শুরুতে মানসম্মত বই না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে অনিয়ম-লুটপাটেরও। এছাড়া জেলা-উপজেলা পর্যায়ে অতিরিক্ত চাহিদা দেখিয়ে বই নিয়ে কালোবাজারে বিক্রি করা ও মানসম্পন্ন বই নিশ্চিত করতে এনসিটিবির নিয়োগ করা ইন্সপেকশন এজেন্টদের নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। বই বিতরণের বিষয়টি শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত তাই এনসিটিবিকে যেমন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হয়, তেমনি সুষ্ঠুভাবে বই বিতরণ শেষ করার মাধ্যমে গৌরব অর্জনেরও সুযোগ রয়েছে।
পরিতাপের বিষয়, ষোল বছর ধরে শিক্ষার্থীরা বই পেলেও বই বিতরণে এখনো পরিকল্পনামাফিক ‘সমন্বিত কাঠামো’ (ফ্রেম) গড়ে ওঠেনি। ফলে গত পনেরো বছর শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন শতভাগ শিক্ষার্থী শতভাগ বই পায়নি। এমনও বছর গেছে, শতভাগ শিক্ষার্থীর শতভাগ বই পেতে মার্চ-এপ্রিল পার হয়ে গেছে। আবার বই পেলেও তা ছিল নি¤œমানের। অল্প কিছুদিনের ব্যবহারেই বইয়ের পাতা খুলে পড়েছে। সমন্বিত কাঠামোর অভাবে পাঠ্যবই ছাপা ও শিক্ষাবর্ষের শুরুতে বই না পাওয়ার শঙ্কা নিয়মিত হয়েছে।
শিক্ষাবর্ষের শুরুতে সব শ্রেণির সব শিক্ষার্থী শতভাগ বই পাবে কিনা, প্রেসগুলো সিন্ডিকেট করে সরকারের কত টাকা অতিরিক্ত লুটে নিচ্ছে বা প্রেসগুলো কীভাবে নি¤œমানের বই সরবরাহ করে পার পেয়ে যাচ্ছে, অনিয়মে এনসিটিবির দায় কতটুকু Ñ ইত্যাদি নিয়ে গণমাধ্যমে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশে দেশজুড়ে শুরু হয় সমালোচনা। এতে সরকার তথা এনসিটিবির ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হয়।
শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, পরিমার্জন ও সংশোধনের কারণে বই ছাপা ও বিতরণের শিডিউল (সময়সূচি) সবসময় ঠিক রাখা সম্ভব নয়, কর্মসূচির সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের এমন বক্তব্যও রয়েছে। তবে প্রতিবছরই শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, পরিমার্জন ও সংশোধন হচ্ছে এমন নয়, তাই যে বছর শিক্ষাক্রম উন্নয়ন বা নতুন বই অন্তর্ভুক্ত হবে তার শিডিউলও আগে থেকেই ঠিক করতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো Ñ একটি সময়াবদ্ধ সমন্বিত কাঠামো থাকলে তা অনুসরণ করে শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বই পাওয়া নিশ্চিত হবে শিক্ষার্থীদের। কঠোর নজরদারির মাধ্যমে বইয়ের মানও নিশ্চিত করা সম্ভব।
তবে নানা সমালোচনার মধ্যেও বই বিতরণে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষ ছিল ব্যতিক্রম। এই শিক্ষাবর্ষে শুরুতে না হলেও ফেব্রুয়ারিতেই শতভাগ বই পেয়েছে শিক্ষার্থীরা। বইয়ের মানও তুলনামূলক ভালো ছিল। অন্যদিকে বই ছাপা নিয়ে অনিয়ম করায় একাধিক প্রেসের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়েছে এনসিটিবি। ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে হওয়া এসব ‘ভালো’র ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বই ছাপা ও বিতরণ প্রক্রিয়ার নানা সমস্যা থেকে উত্তরণে একটি সমন্বিত কাঠামো তৈরির সম্ভাবনা সন্ধানের চেষ্টা করেছে দৈনিক রূপালী বাংলাদেশ।
সন্ধানের এই প্রক্রিয়ায় সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ, এনসিটিবি, প্রেস ও অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়, সাক্ষাৎকার, মতামত ও প্রতিবেদনে সাজানো হয়েছে ‘বিনামূল্যের পাঠ্যবই : নানা সমস্যা ও উত্তরণের উপায় সন্ধান’ শিরোনামে এই বিশেষ আয়োজন। বিষয়ভাবনা ও প্রতিবেদনসহ সব লেখা তৈরি করেছেন বিশেষ প্রতিনিধি উৎপল দাশগুপ্ত।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন