প্রতি শিক্ষাবর্ষের প্রথম দিন দেশের শিক্ষার্থীদের হাতে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণের উদ্যোগ একটি প্রশংসনীয় ও যুগান্তকারী কর্মসূচি। ২০১০ সাল থেকে সরকার প্রাক-প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করছে। সরকারের এ কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান হলো জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। তবে দীর্ঘদিন ধরে এই কার্যক্রমকে ঘিরে নানা সমস্যা, অনিয়ম ও প্রশ্নের উদ্ভব হচ্ছে, যা কার্যকর সমাধানের দাবি রাখে।
পাঠ্যবই ছাপার ক্ষেত্রে প্রতিবছর শিক্ষার্থীর প্রকৃত সংখ্যার তুলনায় বইয়ের চাহিদা নির্ধারণে উল্লেখযোগ্য তারতম্য দেখা যায়। এর অন্যতম কারণ হলো পদ্ধতিগত জটিলতা। অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্তি বা অন্যান্য প্রশাসনিক সুবিধা বজায় রাখার জন্য কাগজে-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি দেখায়, যদিও বাস্তবে উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা তুলনামূলক কম। বিদ্যালয়ের হাজিরা খাতা পর্যালোচনা করলে এ বাস্তবতা সহজেই প্রতীয়মান হয়।
বর্তমানে অনলাইনে সফটওয়্যারের মাধ্যমে বিদ্যালয় পর্যায় থেকে শিক্ষার্থী ও পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা তথ্য আকারে পাঠানো হয়। তবে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিস, জেলা শিক্ষা অফিস, বিভাগীয় কার্যালয় এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের বিভিন্ন স্তর পার করতে গিয়ে তথ্য বারবার হালনাগাদ ও পরিবর্তনের ফলে সংখ্যাগত অসামঞ্জস্য তৈরি হয়। এতে প্রকৃত প্রয়োজনের তুলনায় কয়েক কোটি অতিরিক্ত পাঠ্যবই ছাপতে হয়। তবে এনসিটিবির কিছু পদক্ষেপে চলতি শিক্ষাবর্ষ ও আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষে চাহিদার অতিরিক্ত প্রায় এক কোটি বই কমানো সম্ভব হয়েছে। তবে এর আগে দীর্ঘসময় ধরে অতিরিক্ত বই ছাপানোর জন্য রাষ্ট্রীয় অর্থের ব্যাপক অপচয় হয়েছে।
পাঠ্যবই ছাপা ও বিতরণ কার্যক্রমকে সুশৃঙ্খল ও জবাবদিহিমূলক করতে একটি সুস্পষ্ট একাডেমিক ক্যালেন্ডার ও সমন্বিত কাঠামো প্রণয়ন ভীষণ জরুরি। এ কাঠামোতে এনসিটিবি, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি), প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, শিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত অনুমোদন থাকা প্রয়োজন। এমন একটি কাঠামো না থাকায় প্রতিবছরই বই মুদ্রণ ও বিতরণ নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয় এবং অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ সামনে আসে। গণমাধ্যমে ধারাবাহিক সংবাদ প্রকাশের কারণে বিষয়টি জাতীয় আলোচনায় পরিণত হয়েছে।
করণীয় ও সুপারিশ : একজন সাবেক কর্মকর্তা হিসেবে এনসিটিবিতে বই ছাপা ও বিতরণে দায়িত্ব পালনকালে অর্জিত অভিজ্ঞতা থেকে কিছু করণীয় ও সুপারিশ উল্লেখ করতে চাই।
১. এনসিটিবি, শিক্ষা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সমন্বয়ে একটি যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত কাঠামো প্রণয়ন ও অনুমোদন করতে হবে।
২. পাঠ্যবই মুদ্রণ ও বিতরণ একটি সময়সীমাবদ্ধ কার্যক্রম; তাই প্রতিটি ধাপে নির্ধারিত সময় কঠোরভাবে অনুসরণ নিশ্চিত করতে হবে।
৩. বাংলাদেশের বাস্তবতা, জলবায়ু এবং স্থানীয় বাজারে সহজলভ্য উপকরণের ভিত্তিতে পাঠ্যবই মুদ্রণের জন্য একটি মানসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
৪. প্রাক-প্রাথমিক স্তর ব্যতীত প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য একই ধরনের স্পেসিফিকেশন অনুসরণ করে পাঠ্যবই প্রস্তুত করা যেতে পারে, যা ব্যয় সাশ্রয়ে সহায়ক হবে।
৫. সময়মতো পাঠ্যবই সরবরাহ নিশ্চিত করতে প্যাকেজ ব্যবস্থাপনা ও সংশ্লিষ্ট সরকারি ক্রয়বিধি (পিপিএ/পিপিআর)-এর প্রয়োজনীয় সংশোধনের উদ্যোগ নিতে হবে।
৬. মান নিয়ন্ত্রণব্যবস্থাকে শক্তিশালী করতে যোগ্য, নিরপেক্ষ ও পেশাদার ইন্সপেকশন এজেন্ট নিয়োগ করা প্রয়োজন। প্রয়োজনে বুয়েট, বিসিএসআইআর ও বিএসটিআই-এর প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে এনসিটিবির অধীনে একটি স্বাধীন মান নিয়ন্ত্রণ কমিটি গঠন করা যেতে পারে।
সার্বিকভাবে সরকারের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও জনপ্রিয় এই কর্মসূচির স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করতে হলে পরিকল্পনা, তথ্যব্যবস্থাপনা, ক্রয়প্রক্রিয়া এবং মান নিয়ন্ত্রণে মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। তা না হলে রাষ্ট্রীয় অর্থের অপচয় রোধ করা এবং মানসম্মত পাঠ্যবই নিশ্চিত করা কঠিন হবে।
লেখক : এনসিটিবির সাবেক কর্মকর্তা

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন