জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম উন্নয়ন ও পরিমার্জনের শীর্ষ প্রতিষ্ঠান। এটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের অধীন একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের সংখ্যা অনুসারে এটি বিশে^র সবচেয়ে বড় প্রকাশনা সংস্থা। ১৯৫৪ সালে টেকস্টবুক আইন পাস হয়। এই আইন অনুসারে পূর্ব পাকিস্তান স্কুল টেকস্টবুক বোর্ড নামে একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠান গঠিত হয়। ১৯৮১ সালে শিক্ষাক্রম প্রণয়নের জন্য জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেন্দ্র (এনসিডিসি) নামে একটি পৃথক প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা হয়। ১৯৮৩ সালে বাংলাদেশ স্কুল টেকস্টবুক বোর্ড ও জাতীয় শিক্ষাক্রম উন্নয়ন কেন্দ্র একীভূত করে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড গঠন করা হয়।
কার্যক্রম : প্রাক-প্রাথমিক, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাক্রম উন্নয়ন, পরিমার্জন, পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ এই প্রতিষ্ঠানের প্রধান কাজ। ২০১০ সাল থেকে সরকার এনসিটিবির মাধ্যমে বছরের প্রথম দিন প্রাক-প্রাথমিক থেকে নবম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের মাঝে বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ করে আসছে। ২০১০ সালে ২,৭৬,৬২,৫২৯ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ২০ কোটি পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হয়। এ সংখ্যা ক্রমান্বয়ে বৃদ্ধি পায় এবং ২০২৪ শিক্ষাবর্ষে ৩,৮১,২৮,৩৫৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে প্রায় ৩১ কোটি পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হয়। ২০২২ শিক্ষাবর্ষ থেকে নতুন শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও সরবরাহ করা হয়। কিন্তু ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন হলে পুনরায় ২০১২ সালের শিক্ষাক্রমে ফিরে যাওয়া হয়। ২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো দশম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের জন্য পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করা হয়। নবম শ্রেণিতে ২০২১ শিক্ষাক্রম অনুযায়ী অধ্যয়ন করলেও দশম শ্রেণিতে তাদের ২০১২ শিক্ষাক্রম অনুযায়ী পাঠ কার্যক্রম সম্পন্ন করতে হয়। এ ছাড়া শিক্ষার্থীপ্রতি ৩/৪টি করে বই বৃদ্ধি পাওয়ায় রেকর্ড সংখ্যক প্রায় ৪০ কোটি পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়। চলতি ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রায় ৩০ কোটি পুস্তক সরবরাহ করা হয়েছে। এর মধ্যে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য নিজস্ব ভাষায় প্রায় ২ লাখ এবং দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রায় ৭০০০ ব্রেইল বই রয়েছে। এই সব পাঠ্যপুস্তক সরবরাহে প্রতিবছর সরকারের প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়।
পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ প্রক্রিয়া বেশ জটিল এবং বেশ কয়েকটি ধাপে এ কাজ করা হয়। এই কাজের সঙ্গে যারা যুক্ত নয়, তারা অনুমানও করতে পারবে না যে কতসংখ্যক মানুষের নিরলস প্রচেষ্টায় শিক্ষার্থীদের হাতে পাঠ্যপুস্তকগুলো পৌঁছায়। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণের ধাপগুলোর মধ্যে রয়েছে বার্ষিক ক্রয় পরিকল্পনা (এপিপি) ও সময়াবদ্ধ কর্মপরিকল্পনা (টিএপি) প্রণয়ন, দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি গঠন ও অনুমোদন, কাগজের স্পেসিফিকেশন নির্ধারণ, পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা সংগ্রহ, টেন্ডার আহ্বানের লক্ষ্যে বিভিন্ন লটে বিভাজন, দরপত্র দলিল প্রস্তুত ও টেন্ডার আহ্বান। টেন্ডার উন্মুক্ত করার পর মূল্যায়নের লক্ষ্যে আরও বেশ কিছু কাজ করা হয়। টেন্ডারে অংশগ্রহণকারী প্রেসসমূহের ভৌত অবকাঠামো পরিদর্শন ও সক্ষমতা যাচাই, কারিগরি সাব-কমিটি কর্তৃক টেন্ডারারের সাধারণ, কারিগরি ও আর্থিক সক্ষমতা যাচাই করে প্রতিবেদন প্রদানের পর মূল্যায়ন কমিটি মূল্যায়ন কার্যক্রম সম্পন্ন করে। দরপত্র মূল্যায়ন কমিটি মূল্যায়ন প্রতিবেদন চেয়ারম্যান বরাবর দাখিল করলে বোর্ডসভার অনুমোদনক্রমে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়। মন্ত্রণালয় ক্রয়সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটিতে উপস্থাপনের লক্ষ্যে কেবিনেট বিভাগে প্রেরণ করে। সব ক্রয়প্রক্রিয়া ইজিপি সিস্টেমে করা হয়। ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিপরিষদ কমিটির অনুমোদনের পর ক্রয় আদেশ (এনওএ) জারি করা হয়।
পাঠ্যবইয়ের চাহিদা সংগ্রহ : পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণ কার্যক্রমের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো সারা দেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে শুরু করে নবম শ্রেণি পর্যন্ত উপজেলাভিত্তিক শিক্ষার্থী ও পাঠ্যপুস্তকের সংখ্যা নির্ধারণ। বাংলাদেশে প্রচলিত কয়েকটি শিক্ষাধারা যেমনÑ সাধারণ শিক্ষা ধারা, মাদ্রাসা শিক্ষা ধারা, কারিগরি শিক্ষা ধারা ইত্যাদির জন্য আলাদা আলাদা পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন, মুদ্রণ ও বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া জাতীয় শিক্ষাক্রমের ইংরেজি ভার্সনের পুস্তক, ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর জন্য ৫টি ভাষায় ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন করা হয়। ইতোপূর্বে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ও নিউরো-ডেভেলপমেন্টাল ডিজেবল শিক্ষার্থীদের জন্য মাল্টিমিডিয়া পাঠ্যপুস্তকও তৈরি করা হয়েছে।
এনসিটিবির দুটি শাখাÑ উৎপাদন শাখা ও বিতরণ শাখা সরাসরি এ কাজের সঙ্গে যুক্ত। উৎপাদন শাখা সাধারণ শিক্ষা ধারার প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক স্তরের (বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন) এবং ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণের কাজ করে থাকে। আর এবতেদায়ি, সাধারণ মাধ্যমিক (বাংলা ও ইংরেজি ভার্সন), দাখিল, কারিগরি, ভোকেশনাল ও ব্রেইল পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণ ও বিতরণের কাজ বিতরণ শাখা করে থাকে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর এনসিটিবিকে প্রাথমিক স্তরের পুস্তকের চাহিদা সরবরাহ করে। প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর আইপিইএমআইএস সফটওয়্যারের মাধ্যমে মাঠপর্যায় থেকে চাহিদা সংগ্রহ করে। অন্যদিকে এনসিটিবি নিজস্ব একটি সফটওয়্যারের মাধ্যমে জেলা ও উপজেলা থেকে সাধারণ মাধ্যমিক, মাদ্রাসা ও কারিগরি ধারার পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা সংগ্রহ করে। সমাজসেবা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ব্রেইল পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা সংগ্রহ করা হয়।
চাহিদা সংগ্রহ করতে গিয়ে এনসিটিবিকে প্রতি বছর নানা বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। এর পেছনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ভূমিকা, উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের অসৎ উদ্দেশ্য, জেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কর্মনিষ্ঠার অভাব ও সর্বোপরি এক শ্রেণির মুদ্রণ ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যই দায়ী। এর ফলে কয়েক লাখ অতিরিক্ত বই ছেপে সরকারের কোটি টাকা অপচয় হয়।
সাধারণত উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তথ্য সংগ্রহ ও তা একত্রিত করে সফটওয়্যারে এন্ট্রি দেন। জেলা শিক্ষা অফিসার কারিগরি ধারা ও ইংরেজি ভার্সনের বইয়ের চাহিদা সফটওয়্যারে এন্ট্রি দেন। আঞ্চলিক পরিচালকের অনুমোদনের পর মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সারা দেশের চাহিদা একত্রিত করে এনসিটিবিতে সরবরাহ করেন।
অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধান সাধারণত প্রকৃত শিক্ষার্থীর তুলনায় দ্বিগুণ চাহিদা দিয়ে থাকেন। উপজেলা শিক্ষা অফিসারের কাছে প্রতিষ্ঠান ও শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীর তথ্য থাকার কথা। তারা নিয়মিত প্রতিষ্ঠান পরিদর্শনকালেও এ তথ্য সংগ্রহ করে থাকেন। কিন্তু চাহিদা প্রদানের সময় এর কোনো প্রতিফলন দেখা যায় না। এনসিটিবির অনুসন্ধান ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, এর সঙ্গে কিছুসংখ্যক অসাধু মুদ্রণ প্রতিষ্ঠানও জড়িত। এসব মুদ্রণ প্রতিষ্ঠান টেন্ডারে কাজ পাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করে প্রকৃতপক্ষে কত সংখ্যক পাঠ্যপুস্তকের চাহিদা রয়েছে তা জেনে নেন। তারা দরপত্রে উল্লিখিত চাহিদা সংখ্যার বিপরীতে প্রকৃত যে সংখ্যক বই প্রয়োজন সে সংখ্যক বই মুদ্রণ ও সরবরাহ করে থাকে। কিন্তু চালানে দরপত্রে উল্লিখিত সংখ্যক বই উল্লেখ করে তা গ্রহণ করে আনে। এর মাধ্যমে উভয় পক্ষ বেশ বড় অংকের টাকা ভাগ-বাটোয়ারা করে নেয়।
এই বিষয়টি ২০২৫ সালে এনসিটিবি কর্তৃপক্ষের নজরে আসে এবং বেশকিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এনসিটিবি ব্যানবেইস ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে দফায় দফায় সভা করে ও তাদের সহযোগিতা কামনা করে। এনসিটিবি ৩২টি টিম গঠন করে ৬৪ জেলায় প্রেরণ করে। প্রতি জেলার একটি করে উপজেলার প্রকৃত শিক্ষার্থীর সংখ্যা এবং সরবরাহকৃত ও অবশিষ্ট পাঠ্যপুস্তকের তথ্য সংগ্রহ করে। এনসিটিবি ব্যানবেইসের কাছে থেকে শ্রেণিভিত্তিক শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে ও প্রদানকৃত চাহিদার সঙ্গে ক্রসম্যাচ করে। এ ছাড়া সব শিক্ষা বোর্ডের ষষ্ঠ শ্রেণি, ৮ম শ্রেণি ও ৯ম শ্রেণিতে রেজিস্ট্রেশনকৃত শিক্ষার্থীর তথ্য সংগ্রহ করে এবং ক্রসম্যাচ করে বিরাট ‘গ্যাপ’ পাওয়া যায়। এরপর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তাদের কঠোরভাবে সতর্ক করে সংশোধিত চাহিদা প্রদান করতে বলা হয়। এর ফলে ২০২৬ শিক্ষাবর্ষে প্রায় এক কোটি বইয়ের চাহিদা কমে যায়। আগামী ২০২৭ শিক্ষাবর্ষেও অনুরূপ পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। সেখানেও দেখা যায় প্রায় এক কোটি বইয়ের চাহিদা বেশি দেওয়া হয়েছে।
এর আগে ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণকালে প্রায় ৪৮টি উপজেলায় প্রায় ৮০ লাখ বইয়ের অতিরিক্ত চাহিদার তথ্য এনসিটিবির নজরে আসে। তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ নিয়ে প্রায় ২০টি লটের টেন্ডার বাতিল করা হয় এবং অতিরিক্ত মুদ্রণকৃত বই বাতিল করা স্পটগুলোতে সরবরাহ করে সমন্বয় করা হয়। দায়ী শিক্ষা কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাউশি অধিদপ্তরকে পত্র দেওয়া হয়। এরপরও বিভিন্ন স্থানে নতুন বই ভাঙারি দোকানে বিক্রির সময় হাতে-নাতে ধরা পড়েছে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহায়তায় তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে।
লেখক : এনসিটিবির সাবেক কর্মকর্তা

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন