বিনামূল্যের পাঠ্যবইয়ের নির্ধারিত মান রক্ষায় মুদ্রণের সময় প্রতিটি ধাপে চাহিদা মোতাবেক উপকরণ ব্যবহার হচ্ছে কিনা তা যাচাই ও নজরদারি করতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরের জন্য পৃথক ইন্সপেকশন এজেন্ট নিয়োগ দেয় জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি)। ইন্সপেকশন এজেন্টের পাশাপাশি এনসিটিবির কর্মকর্তাদের সমন্বয়েও একটি মনিটরিং টিম গঠন করা হয়। এনসিটিবির মনিটরিং টিমের সদস্যরা স্পেসিফিকেশন অনুযায়ী কাগজ, কালির ব্যবহার, বাঁধাই, পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তু ও পৃষ্ঠা সঠিক রয়েছে কিনা তা যাচাই করে থাকে।
পাঠ্যবই ছাপার সময় থেকে দেশের ৫৯৪টি পয়েন্টে বই সরবরাহ পর্যন্ত সবধরনের কাজের তদারকির দায়িত্ব পালন করেন এনসিটিবির নিয়োগ করা প্রি-ডেলিভারি ইন্সপেকশন (পিডিআই) এজেন্ট। অন্যদিকে সরবরাহের পর ৫৯৪ পয়েন্ট থেকে বই এনে তা পরীক্ষা করে এনসিটিবির শর্ত অনুযায়ী ছাপানো হয়েছে কিনা সে সম্পর্কে প্রতিবেদন দেওয়ার দায়িত্ব পালন করে পোস্ট ল্যান্ডিং ইন্সপেকশন (পিএলআই) এজেন্ট। এনসিটিবির শর্ত অনুযায়ী মানসম্পন্ন বই পাওয়া নিশ্চিত করতে ইন্সপেকশন এজেন্টদের ভূমিকা তাই অত্যন্ত গুরুত্ব বহন করে। অন্য কথায়, সরকারের বিনামূল্যে বই বিতরণ কর্মসূচির সফলতার ক্ষেত্রে ইন্সপেকশন এজেন্ট অনুঘটকের কাজ করে।
বইয়ের মান সংরক্ষণে সাম্প্রতিককালে গুরুত্বপূর্ণ এই ইন্সপেকশন এজেন্টদের ভূমিকা নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা হচ্ছে। ইন্সপেকশন এজেন্টদের দিয়ে বইয়ের মান নিশ্চিত করা আদৌ সম্ভব কিনা, উঠেছে সেই প্রশ্নও। বিশেষ করে বই ছাপা হয়ে শিক্ষার্থীদের হাতে চলে যাওয়ার দীর্ঘসময় পর পিএলআই করা যুক্তসঙ্গত নয় বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। তাদের ভাষ্য, শিক্ষার্থীদের হাতে বই যাওয়ার পর তা ব্যবহারে নতুন বইয়ের মতো শতভাগ উপাদান পাওয়া সম্ভব নয়। তাদের দাবি, জেলা-উপজেলা পর্যায়ে বই যাওয়ার পরপরই যদি পিএলআই করা যায়, তা হলে বইয়ের মানের বিষয়ে সত্যিকার চিত্র পাওয়া সম্ভব। অন্যদিকে বই ছাপার সময় থেকে জেলা-উপজেলা পর্যায়ে সরবরাহের কাজ তদারক করা পিডিআই এজেন্টদের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে প্রেসগুলোর নি¤œমানের বই ছাড়ের অভিযোগ রয়েছে। এমন অভিযোগ রয়েছে পিএলআই এজেন্টদের বিরুদ্ধেও। এমনকি অযৌক্তিকভাবে কম দর দিয়ে কাজ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে এজেন্টদের বিরুদ্ধে।
বই বিতরণ-সংক্রান্ত এনসিটিবির কর্মকর্তাদের তৈরি করা একটি প্রতিবেদনেও ইন্সপেকশন এজেন্টদের বিতর্কিত ভূমিকার উল্লেখ করা হয়েছে। ২০২৫ শিক্ষাবর্ষে প্রাথমিকের ইন্সপেকশন এজেন্ট নিয়োগে এনসিটিবির প্রাক্কলিত মূল্য ৬১ লাখ ৪৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হলেও কাজ পাওয়া সর্বনি¤œ দরদাতার দর ছিল ২৯ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের শুরুতে প্রতিষ্ঠানটির কিছু গাফিলতি ও অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, মাধ্যমিকের পাঠ্যপুস্তকের মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের জন্য দুটি প্রতিষ্ঠান নিয়োগ করা হয়। পাঠ্যপুস্তক মুদ্রণের সময় সরবরাহ করার পূর্বের মান নিয়ন্ত্রণের জন্য পিডিআই এজেন্ট এবং পাঠ্যপুস্তক সরবরাহ করার পর মান যাচাই করার জন্য পিএলআই এজেন্ট নিয়োগ করা হয়। পিডিআই এজেন্টের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ থাকায় তার কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করা হয়। পর্যবেক্ষণে পিডিআই এজেন্টের বেশ কিছু অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়। এসব অনিয়মের মধ্যে রয়েছেÑ বই ছাপার কাগজের সংকট দেখিয়ে নি¤œমানের কাগজকে মানসম্পন্ন হিসেবে সনদ দিয়ে কাগজ মিল মালিক ও প্রেসের কাছ থেকে অর্থ আদায় ও অল্প জনবল দিয়ে কার্যক্রম পরিচালনা।
প্রতিবেদনে এ-সংক্রান্ত তিনটি সুপারিশ করা হয়Ñ ১. বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর নির্ভর না করে এনসিটিবির নিজস্ব ল্যাব তৈরি ও প্রশিক্ষিত, দক্ষ, মানব মূলধন সৃষ্টি করতে হবে ২. নিজস্ব ল্যাব নির্মাণ ও জনবল সৃষ্টি না হওয়া পর্যন্ত মুদ্রণ কাগজের বার্স্টিং, ব্রাইটনেস ও জিএসএম পরিমাপ করার জন্য হাতে বহনযোগ্য সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ক্রয় করতে হবে, যাতে মনিটরিং টিম তাৎক্ষণিকভাবে উল্লিখিত প্যারামিটারসমূহ পরিমাপ করতে পারে ও ৩. এনসিটিবির অধীনে পৃথক একটি মনিটরিং উইং তৈরি করতে হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন