মাদক চোরাচালানের এক ভয়াবহ ও সূক্ষ্ম কৌশল অবলম্বন করছে সিলেটের সীমান্তবর্তী জকিগঞ্জ ও বিয়ানীবাজার এলাকার কারবারিরা। এই নেটওয়ার্কের পুরো প্রক্রিয়ায় কোথাও ‘ইয়াবা’ শব্দটি সরাসরি উচ্চারিত হয় না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্ক নজরদারি এড়াতে তারা আশ্রয় নিয়েছে ‘বিচি’, ‘বোতাম’ ও ‘মাল’Ñ এই তিন সাংকেতিক ভাষার। প্রকাশ্যে চায়ের দোকান কিংবা বাজারে যখন এই শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়, তখন সাধারণ মানুষের কাছে মনে হয় কেবলই কোনো ব্যাবসায়িক আলাপচারিতা। কিন্তু পর্দার আড়ালে এই সংকেতগুলো ব্যবহারেই চলছে কোটি কোটি টাকার মরণনেশা ইয়াবার লেনদেন।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ভারত সীমান্তঘেঁষা সিলেটের জকিগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে নিয়মিত ইয়াবার বড় বড় চালান দেশে প্রবেশ করছে। এই মাদকের সহজ পথ হিসেবে বিয়ানীবাজারকে এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ ‘ট্রানজিট রুট’ হিসেবে ব্যবহার করছে সিন্ডিকেট। সীমান্ত থেকে আসা ইয়াবার এই চালানগুলো প্রথমে স্থানীয় সংগ্রাহকদের কাছে যায়, এরপর তা বাস, সিএনজি অটোরিকশা কিংবা অন্যান্য গণপরিবহনে করে সাধারণ যাত্রীর বেশে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চক্রটির কর্মপদ্ধতি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল। জকিগঞ্জের জিরো পয়েন্ট থেকে কসকনকপুর ইউনিয়ন পর্যন্ত বিস্তৃত সীমান্ত এলাকাকে তারা নিরাপদ করিডর হিসেবে গড়ে তুলেছে। দিনের বেলায় জেলের ছদ্মবেশে নদীতে মাছ ধরার আড়ালে সীমান্তের ওপার থেকে ইয়াবার চালান সংগ্রহ করা হয়। রাতের অন্ধকারে যখন পুরো এলাকা নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে, তখন বিশেষভাবে মোড়ানো প্যাকেট নদীতে ভাসিয়ে দেওয়া হয়, যা নির্দিষ্ট স্থানে অপেক্ষমাণ সহযোগীরা উদ্ধার করে। আবার অনেক সময় সাঁতার কেটে কিংবা ছোট নৌকায় ঝুঁকি নিয়ে নদী পার হয়েও চালানগুলো এপারে আনা হয়। এরপর সেগুলো সীমান্তের বিভিন্ন গ্রামের নির্দিষ্ট কিছু বাড়িতে সাময়িকভাবে মজুত করা হয়, যা পরবর্তীতে ধাপে ধাপে বড় কারবারিদের এজেন্টদের কাছে পৌঁছানো হয়।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানে বিপুল পরিমাণ মাদক ও বাহক আটক হলেও এই শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মূল হোতারা বরাবরই থেকে যাচ্ছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে। গোয়েন্দা তথ্যে জানা যায়, অভিযানের আভাস পাওয়ামাত্রই তারা যাত্রাপথ পরিবর্তন, পোশাক বদল কিংবা নতুন বাহক ব্যবহারের মতো কৌশলী ভূমিকা নেয়।
চলতি বছরের ২৫ ফেব্রুয়ারি দুবাগ ইউনিয়নের চরিয়া এলাকা থেকে ১ হাজার ৯৫৫ পিস, ৪ এপ্রিল ফতেহপুর এলাকায় ১ হাজার ৩০০ পিস এবং সর্বশেষ ১৫ জুন যাত্রীবাহী বাসে বিশেষ অভিযান চালিয়ে ৯ হাজার পিস ইয়াবাসহ একাধিক বাহককে গ্রেপ্তার করেছে বিয়ানীবাজার থানার পুলিশ। এ ছাড়া গাঁজা ও বিদেশি মদসহ অসংখ্যবার পুলিশের জালে ধরা পড়েছে মাদক কারবারিরা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক সমাজের প্রশ্ন, অভিযান কি কেবল বাহক ধরাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে? তাদের দাবি, সীমান্তের এই রুট নিয়ন্ত্রণে আরও কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে। গোয়েন্দা নজরদারি বড়ানোর পাশাপাশি মাদকের অর্থের উৎস শনাক্ত করে রাঘব বোয়ালদের আইনের আওতায় না আনতে পারলে জকিগঞ্জ-বিয়ানীবাজার করিডর আরও শক্তিশালী হয়ে উঠবে।
সমাজ বিশ্লেষকদের মতে, ইয়াবার এই অদৃশ্য সাম্রাজ্য যদি এখনই ভেঙে দেওয়া না যায়, তাহলে তরুণ প্রজন্মকে এই মরণনেশার হাত থেকে রক্ষা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়বে। স্থানীয়দের প্রত্যাশা, পুলিশ ও প্রশাসনের সম্মিলিত পদক্ষেপে এই সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন হবে এবং সীমান্ত হবে মাদকমুক্ত।
বিয়ানীবাজার থানার ওসি মো. ওমর ফারুক বলেন, গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে মাদক কারবারিদের বিরুদ্ধে আমরা জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করছি। গভীর রাত পর্যন্ত বিভিন্ন পয়েন্টে চেকপোস্ট বসিয়ে তল্লাশি চালানো হচ্ছে। অনেক সময় বাহকেরাই বেশি ধরা পড়ছে, এটি সত্য। তবে আমরা কেবল বাহক নয়, বরং তদন্তের মাধ্যমে পুরো নেটওয়ার্ক ও মূল হোতাদের শনাক্ত করার প্রক্রিয়া অব্যাহত রেখেছি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন