একজন মানুষ যখন হাসপাতালের দ্বারস্থ হন, তখন তিনি শুধু একজন রোগী নন, তিনি একজন অসহায় নাগরিক। আর সেই অসহায় মুহূর্তে যদি চিকিৎসার পাশাপাশি পরিবহনের মতো মৌলিক সেবাকেও কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে চাঁদাবাজি, দালালি ও সিন্ডিকেটের নিষ্ঠুর বাণিজ্য, তবে তা কেবল একটি প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, বরং রাষ্ট্রের মানবিক দায়বদ্ধতারও প্রশ্ন তোলে।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলো ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে সক্রিয় অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। কিন্তু অভিযোগের পুনরাবৃত্তি, রোগী ও স্বজনদের অভিন্ন অভিজ্ঞতা এবং হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সীমাবদ্ধতার স্বীকারোক্তি প্রমাণ করেÑ এটি বিচ্ছিন্ন কোনো অনিয়ম নয়, বরং একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংকটে পরিণত হয়েছে। দুর্ঘটনায় আহত রোগী হোক কিংবা মৃত স্বজনের মরদেহÑ উভয় ক্ষেত্রেই মানুষের চরম দুর্বলতাকে পুঁজি করে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, বিকল্প অ্যাম্বুলেন্সে বাধা সৃষ্টি, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার মতো ঘটনা সভ্য সমাজে কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, হাসপাতালের প্রধান ফটক, জরুরি বিভাগ কিংবা ওয়ার্ডের আশপাশেই এসব সিন্ডিকেটের প্রকাশ্য বিচরণ। প্রশ্ন জাগে, হাসপাতাল এলাকায় এত সংগঠিতভাবে একটি চক্র কীভাবে বছরের পর বছর সক্রিয় থাকে? যদি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানে, পুলিশ জানে, রোগীরা জানেÑ তবে কার্যকর প্রতিরোধ কোথায়? মাঝেমধ্যে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে সরিয়ে দেওয়া সমস্যার স্থায়ী সমাধান নয়। কারণ, সমস্যার শিকড় রয়ে যায় অক্ষত।
এখানে শুধু কিছু অসাধু চালকের দায় দেখলে ভুল হবে। এই চক্রের পেছনে রয়েছে দালাল, স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, অসাধু স্বার্থগোষ্ঠী এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার জটিল সমন্বয়। ফলে এটি আইনশৃঙ্খলার পাশাপাশি সুশাসনেরও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। রোগীর জীবন নিয়ে ব্যবসা করার এই সংস্কৃতি যতদিন চলবে, ততদিন স্বাস্থ্যসেবা খাতে সংস্কারের যেকোনো উদ্যোগই অসম্পূর্ণ থেকে যাবে।
আশার কথা, স্বাস্থ্যমন্ত্রী একটি সুনির্দিষ্ট অ্যাম্বুলেন্স নীতিমালা প্রণয়নের কথা বলেছেন। তবে শুধু নীতিমালা প্রণয়ন করলেই দায়িত্ব শেষ হবে না, তার কার্যকর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। প্রয়োজন হাসপাতালভিত্তিক কেন্দ্রীয় অ্যাম্বুলেন্স নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, ডিজিটাল বুকিং, নির্ধারিত ভাড়ার প্রকাশ্য তালিকা, জিপিএস-ভিত্তিক নজরদারি এবং অভিযোগ গ্রহণ ও তাৎক্ষণিক প্রতিকারের কার্যকরব্যবস্থা। একই সঙ্গে হাসপাতাল চত্বরে দালালমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ জরুরি।
প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে একটি স্বচ্ছ অ্যাম্বুলেন্স ডেস্ক চালু করা যেতে পারে, যেখানে রোগীর স্বজন নির্ধারিত ভাড়ায় নিবন্ধিত অ্যাম্বুলেন্স পাবেন। অনলাইন ও টেলিফোনভিত্তিক সেবা চালু হলে দালালচক্রের দৌরাত্ম্য অনেকটাই কমে আসবে। পাশাপাশি নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ আদালত, লাইসেন্স যাচাই এবং অনিয়মে জড়িত চালক ও সহযোগীদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে। হাসপাতালের নিরাপত্তা ব্যবস্থাও এমন হতে হবে, যাতে কোনো সিন্ডিকেট বিকল্প গাড়ি প্রবেশে বাধা দিতে না পারে।
স্বাস্থ্যসেবা কেবল হাসপাতালের শয্যা, ওষুধ বা চিকিৎসকের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, রোগীকে নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছে দেওয়াও সেই সেবার অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই অ্যাম্বুলেন্সকে বাণিজ্যের নয়, জনসেবার অংশ হিসেবেই দেখতে হবে। একজন রোগী বা মৃত ব্যক্তির স্বজনকে যদি হাসপাতালের গেটেই জিম্মি হতে হয়, তবে স্বাস্থ্যব্যবস্থার মানবিকতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
সরকার যখন স্বাস্থ্য খাতে সংস্কারের কথা বলছে, তখন অ্যাম্বুলেন্স সিন্ডিকেট ভাঙার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কারণ, হাসপাতালের দরজায় দাঁড়িয়ে মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যারা ব্যবসা করে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রের নৈতিক অঙ্গীকারও।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন