বিমা খাতে গ্রাহকের আস্থা ফিরিয়ে আনা, বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম ভিত্তি হিসেবে গড়ে তোলা এবং খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধিÑ এই তিন স্তম্ভ সামনে রেখে সংস্কার কার্যক্রম পরিচালনার ঘোষণা দিয়েছেন বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের (আইডিআরএ) চেয়ারম্যান মীর নাদিয়া নিভিন। তিনি বলেছেন, বর্তমানে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন বিমা দাবি নিষ্পত্তিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে। সব ধরনের বিকল্প ব্যবস্থা বিবেচনার পরও প্রয়োজন হলে সরকারের কাছে এককালীন (ওয়ান-টাইম) বেইলআউট প্যাকেজের প্রস্তাবও দেওয়া হতে পারে।
গতকাল শনিবার ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরাম (আইআরএফ) আয়োজিত ‘বিমা খাতের চ্যালেঞ্জ, সম্ভাবনা ও করণীয়’ শীর্ষক এক সেমিনারে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে এ কথা বলেন তিনি।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান বলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর এক সপ্তাহ ধরে এই খাতের বিভিন্ন সমস্যা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে ধারণা নিয়েছেন। তবে তিনি কেবল সমস্যা নয়, সমাধানভিত্তিক সংস্কারে বিশ্বাসী। সে লক্ষ্যেই একটি সংস্কারকাঠামো (রিফর্ম ফ্রেমওয়ার্ক) তৈরি করা হয়েছে।
তিনি বলেন, বিমা খাতের সংস্কারের প্রথম স্তম্ভ হলো পলিসিধারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার। দ্বিতীয় স্তম্ভ বিমাকে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ শ্রেণি (লং-টার্ম ইনভেস্টমেন্ট ক্লাস) হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এবং তৃতীয় স্তম্ভ খাতের সক্ষমতা (ক্যাপাসিটি) বৃদ্ধি, যাতে দীর্ঘমেয়াদে একটি টেকসই বিমা শিল্প গড়ে ওঠে।
মীর নাদিয়া নিভিন বলেন, আইডিআরএর তথ্য অনুযায়ী বর্তমানে বিমা খাতে প্রায় ৭ হাজার কোটি টাকার অনিষ্পন্ন দাবি রয়েছে। এর মধ্যে জীবন ও সাধারণ উভয় ধরনের বিমা কোম্পানির দাবি রয়েছে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান বলেন, প্রতিটি কোম্পানির সঙ্গে আলাদাভাবে বসে তাদের আর্থিক ও পরিচালনাগত সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের চেষ্টা করা হবে। কোথাও সম্পদ বিক্রি, কোথাও আটকে থাকা অর্থ উদ্ধার কিংবা অন্য কোনো উপায়ে দাবি পরিশোধের সুযোগ তৈরি করা গেলে আইডিআরএ তা সমন্বয় করবে।
তিনি বলেন, অনেক কোম্পানির এফডিআরের অর্থ দুর্বল হয়ে পড়া ব্যাংকে আটকে আছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনা করা হবে। পাশাপাশি ট্রেজারি বন্ডে বিনিয়োগ করা অর্থ প্রয়োজন অনুযায়ী নগদায়নের সুযোগও বিবেচনা করা হবে।
এসব উদ্যোগের পরও যদি বড় অঙ্কের দায় থেকে যায়, তাহলে এককালীন বেইলআউট প্যাকেজের বিষয়টি বিবেচনা করা হবে বলে জানান আইডিআরএর চেয়ারম্যান। তিনি বলেন, সরকারের কাছে যাওয়ার আগে বিমা কোম্পানি ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের ‘হোমওয়ার্ক’ শেষ করতে হবে। সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে যে ভবিষ্যতে একই ধরনের সংকট আর সৃষ্টি হবে না। এ জন্য কোম্পানিগুলোকে সুশাসন ও ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় কী পরিবর্তন আনা হচ্ছে এবং আইডিআরএ নিয়ন্ত্রক হিসেবে কী ধরনের সংস্কার করছে, তা স্পষ্টভাবে দেখাতে হবে।
আইডিআরএ চেয়ারম্যান বলেন, বাংলাদেশের মাথাপিছু আয় এখন ৩ হাজার ডলারের বেশি এবং দেশ অর্ধ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অর্জন করতে হলে একটি শক্তিশালী বিমা খাত অপরিহার্য। তিনি বলেন, একই পর্যায়ের অনেক দেশের তুলনায় বাংলাদেশের বিমা খাত অনেক পিছিয়ে রয়েছে। অথচ উন্নত অর্থনীতিগুলোতে বিমা খাত শুধু ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার মাধ্যম নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের অন্যতম বড় উৎস। চেয়ারম্যান বলেন, দেশের পুঁজিবাজারে বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীর অভাব রয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বিমা কোম্পানিগুলো শেয়ারবাজারের অন্যতম বড় প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারী হিসেবে কাজ করে। বিশেষ করে নতুন কোম্পানির প্রাথমিক শেয়ার (আইপিও) ইস্যুতে বিমা কোম্পানির বড় ভূমিকা থাকে।
তিনি বলেন, একটি শক্তিশালী বিমা খাত গড়ে উঠলে পুঁজিবাজারের গভীরতা বাড়বে এবং দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের উৎস তৈরি হবে। তাই পুঁজিবাজার সংস্কার ও বিমা খাতের উন্নয়ন পরস্পরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত।
বাংলাদেশকে দুর্যোগপ্রবণ দেশ উল্লেখ করে চেয়ারম্যান বলেন, প্রতি বছর ঘূর্ণিঝড়, বন্যাসহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগে জাতীয় অর্থনীতির উল্লেখযোগ্য ক্ষতি হয়। এসব দুর্যোগের পর পুনর্বাসনে সরকারকে বিপুল অর্থ ব্যয় করতে হয়। তিনি বলেন, উন্নত দেশগুলোতে বিমার মাধ্যমে ঝুঁকি বণ্টন করে সরকারের আর্থিক চাপ কমানো হয়। বাংলাদেশেও বিমা খাতকে সেই ভূমিকা পালনের উপযোগী করে গড়ে তুলতে হবে। এতে আর্থিক স্থিতিশীলতা বাড়বে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক ধাক্কাও তুলনামূলক সহজে মোকাবিলা করা সম্ভব হবে।
আইডিআরএর চেয়ারম্যান বলেন, দেশে মাইক্রোফাইন্যান্সের বিস্তৃত নেটওয়ার্ক থাকলেও সেটিকে ব্যবহার করে কার্যকর মাইক্রোইনস্যুরেন্স গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। এজন্য প্রয়োজনীয় আইন ও বিধিমালা প্রণয়ন করে ক্ষুদ্রঋণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে মাইক্রোইনস্যুরেন্স সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ছাড়া ইসলামি বিমা বা তাকাফুল খাতের জন্যও প্রয়োজনীয় নীতিমালা ও নিয়ন্ত্রক কাঠামো তৈরি করা হবে বলে জানান তিনি।
খাতের দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের জন্য দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়ে চেয়ারম্যান বলেন, সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বিমা বিষয়ে বিভাগ, মেজর, মাইনর কিংবা সার্টিফিকেশন কোর্স চালুর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। এতে খাতে দক্ষ জনবল তৈরি হবে এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ সৃষ্টি হবে।
চেয়ারম্যান বলেন, কোনো খাতের সংস্কারের জন্য তিনটি পক্ষের সদিচ্ছা অপরিহার্যÑ সরকারের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, শিল্পমালিকদের আন্তরিকতা এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার কার্যকর ভূমিকা। এই তিন পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া কোনো সংস্কারই সফল হয় না। তিনি বলেন, আইডিআরএ প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা দিতে প্রস্তুত। যেখানে যেতে হবে, যাদের সঙ্গে কথা বলতে হবে, যেভাবে উদ্যোগ নিতে হবেÑ সবই করা হবে। তবে এর জন্য বিমা কোম্পানিগুলোকেও আন্তরিক হতে হবে। তিনি আরও বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, বিমা কোম্পানি ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে প্রতিপক্ষ হিসেবে নয়, অংশীদার হিসেবে কাজ করতে হবে। একসঙ্গে কাজ করলেই দেশের বিমা খাতকে একটি শক্তিশালী ও টেকসই অবস্থানে নিয়ে যাওয়া সম্ভব।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিমা কোম্পানির মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিআইএ) সভাপতি সাঈদ আহমেদ, বিমা কোম্পানির মুখ্য নির্বাহীদের সংগঠন বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স ফোরামের (বিআইএফ) সভাপতি বিএম ইউসুফ আলী প্রমুখ।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন ইন্স্যুরেন্স রিপোর্টার্স ফোরামের (আইআরএফ) সভাপতি গোলাম মওলা। সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন দৈনিক যুগান্তরের বিজনেস এডিটর মনির হোসেন এবং অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন বাণিজ্য প্রতিদিন পত্রিকার সম্পাদক ও আইআরএফের সাধারণ সম্পাদক গিয়াস উদ্দিন।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশ একটি দুর্যোগপ্রবণ দেশ হলেও কৃষি বিমার প্রসার খুবই সীমিত। বিমা কোম্পানিগুলো কৃষি বিমাকে লাভজনক মনে না করলে কৃষকদের ঝুঁকি সুরক্ষিত করা সম্ভব হবে না। অথচ দেশের বাস্তবতায় কৃষি বিমাকে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, দেশের বিপুল জনসংখ্যার তুলনায় বিমার আওতা খুবই কম। বিমা খাতকে টেকসইভাবে এগিয়ে নিতে হলে পণ্যের বৈচিত্র্য বাড়াতে হবে। কৃষকদের পাশাপাশি স্বাস্থ্য বিমাসহ বিভিন্ন খাতে নতুন নতুন বিমা পণ্য চালুর মাধ্যমে বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। বর্তমানে স্বাস্থ্য বিমা মূলত উচ্চবিত্ত ও কিছু চাকরিজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা বলেন, প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহার না হওয়ায় একদিকে গ্রাহক কাক্সিক্ষত সেবা পাচ্ছেন না, অন্যদিকে বিমা কোম্পানিগুলোর অপচয় বাড়ছে। ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে গ্রাহকের অধিকার, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা সম্ভব। তিনি বলেন, প্রতিদিন মানুষ সড়কপথে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করলেও কার্যকর বিমা সুরক্ষার আওতায় আসছে না। এ ক্ষেত্রেও বিমার পরিধি বাড়ানোর প্রয়োজন রয়েছে।
বিমা খাতের অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে তিনি নিয়ন্ত্রক সংস্থার দুর্বলতার কথা তুলে ধরে বলেন, জনগণের আস্থা ও অধিকার নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিয়ন্ত্রক সংস্থার। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে সেই ভূমিকা কার্যকরভাবে পালন করা হয়নি। ফলে বিমা খাতে মানুষের আস্থার সংকট তৈরি হয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. শহিদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে ১ ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তর করতে হলে দেশের বীমা খাতের পেনিট্রেশন বা অবদান আগামী ৮ থেকে ১০ বছরের মধ্যে বর্তমানের চেয়ে অন্তত ১০ গুণ বাড়াতে হবে। দেশের দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে এই খাতের আধুনিকায়ন এখন সময়ের দাবি।
তিনি পরিসংখ্যান তুলে ধরে বলেন, ‘বর্তমানে দেশের জিডিপির আকার প্রায় ৫০০ বিলিয়ন ডলার। ২০৪১ সালের ভিশন পূরণ করতে হলে আগামী ৮-১০ বছরের মধ্যে এই জিডিপিকে ডাবল বা ১ ট্রিলিয়ন ডলারে রূপান্তর করতে হবে। এর জন্য প্রতি বছর গড়ে ৬ থেকে ৭ শতাংশ হারে স্টেডি এবং সাস্টেইনেবল জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জন করা জরুরি। অথচ বর্তমানে জিডিপিতে বিমার অবদান মাত্র শূন্য দশমিক ৩২ শতাংশ। এই লক্ষ্য ছুঁতে হলে আগামী এক দশকের মধ্যে বীমার অবদান ৩ থেকে ৪ শতাংশে উন্নীত করতেই হবে।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন