ফুটবল এমন একটি খেলা, যেখানে ৯০ মিনিট কখনো কখনো একটি পুরো ক্যারিয়ারের গল্প বদলে দেয়। একজন খেলোয়াড়কে বছরের পর বছর ধরে যে পরিচয়ে চেনে পৃথিবী, সেই পরিচয়ও একটি ম্যাচে বদলে যেতে পারে। কেউ হয়ে ওঠেন নায়ক, কেউ কিংবদন্তি, আবার কেউ হারিয়ে যান বিস্মৃতির অতলে। বিশ্বকাপের মঞ্চে এমন রূপকথা আরও বেশি লেখা হয়। কারণ এখানে প্রতিটি গোলের ওজন শুধু একটি ম্যাচ নয়, একটি প্রজন্মের স্মৃতির সমান। ২০২৬ বিশ্বকাপে নরওয়ের বিপক্ষে ফ্রান্সের ম্যাচটি ছিল এমনই এক রূপকথার জন্ম। ম্যাচের আগে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন কিলিয়ান এমবাপ্পে, ফরাসি আক্রমণের সবচেয়ে বড় অস্ত্র। অন্যদিকে প্রতিপক্ষে ছিলেন গোলমেশিন আর্লিং হালান্ড। ধারণা ছিল, বিশ্বের দুই সেরা ফরোয়ার্ডের দ্বৈরথেই জমে উঠবে ম্যাচটি।কিন্তু ফুটবল আবারও প্রমাণ করল, সবচেয়ে বড় গল্পগুলো কখনো পূর্বনির্ধারিত হয় না। যে মানুষটিকে নিয়ে সবচেয়ে কম আলোচনা হয়েছিল, সেই ওসমান ডেম্বেলেই হয়ে উঠলেন ম্যাচের একচ্ছত্র নায়ক। মাত্র ৩২ মিনিটে পূর্ণ করলেন হ্যাটট্রিক। আর সেই সঙ্গে লিখলেন বিশ্বকাপের ইতিহাসে দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিকের কীর্তি। তার ওপরে এখন কেবল ১৯৫৪ সালে অস্ট্রিয়ার এরিখ প্রোবস্ট, যিনি ২৪ মিনিটে তিন গোল করেছিলেন। এই একটি রাতই যেন বদলে দিল ডেম্বেলের পুরো ফুটবল-পরিচয়। ওসমান ডেম্বেলের ক্যারিয়ারকে যদি একটি শব্দে ব্যাখ্যা করতে হয়, তা হলে সেটি হবে ‘অসম্পূর্ণতা’। শৈশব থেকেই তিনি ছিলেন বিস্ময়কর প্রতিভার অধিকারী। রেনে তার উত্থান, এরপর বরুসিয়া ডর্টমুন্ডে ইউরোপকে চমকে দেওয়া, তারপর বার্সেলোনায় শত মিলিয়ন ইউরোরও বেশি মূল্যে যোগ দেওয়াÑ সবকিছুই ইঙ্গিত দিচ্ছিল, ফুটবল বিশ্ব হয়তো আরেকজন সুপারস্টারের জন্ম দেখছে।
কিন্তু বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। একের পর এক ইনজুরি তাকে থামিয়েছে। কখনো হ্যামস্ট্রিং, কখনো হাঁটু, কখনো উরুর পেশি। মাঠে যতটা সময় ছিলেন, তার চেয়ে বেশি সময় কাটাতে হয়েছে চিকিৎসকদের সঙ্গে। বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় প্রতিভাদের তালিকায় তার নাম ছিল, কিন্তু সেরা খেলোয়াড়দের তালিকায় জায়গা করে নিতে পারছিলেন না।
সমালোচকেরা বলতে শুরু করেছিলেন, ডেম্বেলের প্রতিভা আছে, কিন্তু ভাগ্য যেন তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ। কেউ কেউ তো তাকে ‘চিরঅপূর্ণ প্রতিভা’ বলেও আখ্যা দিয়েছিলেন। ফুটবল ইতিহাসে এমন বহু খেলোয়াড় আছেন, যাদের অসাধারণ প্রতিভা শেষ পর্যন্ত ইতিহাস হয়ে ওঠেনি। অনেকেই ভেবেছিলেন, ডেম্বেলের গল্পও হয়তো সেদিকেই যাচ্ছে। কিন্তু তিনি হার মানেননি। গত দুই বছরে ডেম্বেলের খেলায় এসেছে এক অবিশ্বাস্য পরিবর্তন। আগের সেই এলোমেলো, শুধুই গতিনির্ভর উইঙ্গার আর নেই। এখন তিনি অনেক বেশি পরিণত, অনেক বেশি হিসেবি। আগে যেখানে বল পেলেই ডিফেন্ডারকে কাটানোর চেষ্টা করতেন, এখন তিনি জানেন কখন পাস দিতে হবে, কখন শট নিতে হবে, কখন আক্রমণের গতি কমাতে হবে। সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে তার মানসিকতায়। ব্যর্থতা এখন আর তাকে ভেঙে দেয় না, বরং আরও ক্ষুধার্ত করে তোলে। নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচের শুরু থেকেই বোঝা যাচ্ছিল, আজকের ডেম্বেলে অন্যরকম। সপ্তম মিনিটেই প্রথম গোল করে তিনি যেন ঘোষণা দিলেন, এই রাত তার। ডান-প্রান্ত দিয়ে দুরন্ত গতিতে উঠে এসে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে বল জালে পাঠান। নরওয়ের রক্ষণ তখনো নিজেদের গুছিয়ে নিতে পারেনি। দ্বিতীয় গোলটি ছিল আরও দৃষ্টিনন্দন। ডিফেন্ডারদের মাঝখানে জায়গা তৈরি করে এমন এক শট নিলেন, যা গোলরক্ষকের নাগালের অনেক বাইরে। গ্যালারিতে তখন শুধু বিস্ময় আর উল্লাস। অনেকেই ভাবছিলেন, জোড়া গোলেই হয়তো শেষ হবে তার গল্প। কিন্তু ডেম্বেলে সেদিন থামার জন্য মাঠে নামেননি।
৩২তম মিনিটে তৃতীয় গোল। স্টেডিয়ামের হাজারো দর্শক দাঁড়িয়ে তাকে অভিবাদন জানালেন। সতীর্থরা ছুটে এসে জড়িয়ে ধরলেন। আর স্কোরবোর্ডের পাশাপাশি বদলে গেল ইতিহাসের পাতাও। বিশ্বকাপের দ্বিতীয় দ্রুততম হ্যাটট্রিক, যে কীর্তি যুগের পর যুগ ধরে আলোচনায় থাকবে। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, এর আগে দুটি বিশ্বকাপ মিলিয়ে ডেম্বেলে ১১টি ম্যাচ খেলেছিলেন। একটিও গোল করতে পারেননি। কত সমালোচনা, কত হতাশা! অনেকে বলেছিলেন, ক্লাব ফুটবলের ডেম্বেলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে হারিয়ে যান। সেই মানুষটিই এবার এক ম্যাচে করলেন তিন গোল। যেন জমে থাকা সব অপেক্ষা, সব আক্ষেপ একসঙ্গে বিস্ফোরিত হলো। ফ্রান্সের ফুটবল ইতিহাস সমৃদ্ধ। জাস্ট ফন্টেইন, মিশেল প্লাতিনি, জিনেদিন জিদান, থিয়েরি অঁরি, কিলিয়ান এমবাপ্পে, কিংবদন্তিদের নাম উচ্চারণ করলেই ফুটবল ইতিহাসের একটি দীর্ঘ অধ্যায় চোখের সামনে ভেসে ওঠে। সেই ইতিহাসে বিশ্বকাপে হ্যাটট্রিক করেছেন খুব অল্প কয়েকজন। এবার সেই অভিজাত তালিকায় নিজের নামও লিখে ফেললেন ডেম্বেলে। এটি শুধু তার ব্যক্তিগত অর্জন নয়, ফরাসি ফুটবলের ইতিহাসে স্থায়ী আসন করে নেওয়ার মুহূর্ত। ফ্রান্সের দলে খেলাটা সহজ নয়।
কারণ সেখানে আছেন এমবাপ্পে। বিশ্ব ফুটবলের অন্যতম সেরা তারকা। বছরের পর বছর ফ্রান্সের সব আলো ছিল তার ওপর। ডেম্বেলে ছিলেন যেন সহ-অভিনেতা। কিন্তু নরওয়ের বিপক্ষে ম্যাচে দৃশ্যপট বদলে গেল। এমবাপ্পে ভালো খেলেছেন, সুযোগ তৈরি করেছেন, তবু ম্যাচ শেষে সব সংবাদমাধ্যমের শিরোনাম ছিল একটাই, ডেম্বেলে। এই একটি ম্যাচই তিনি প্রমাণ করে দিয়েছে, ফ্রান্স এখন আর শুধু একজন তারকার দল নয়। তাদের আক্রমণভাগ এখন বহুমাত্রিক। এমবাপ্পের পাশাপাশি ডেম্বেলেও প্রতিপক্ষের জন্য সমান ভয়ংকর অস্ত্র হয়ে উঠেছেন। ফুটবল ইতিহাসে অসংখ্য হ্যাটট্রিক হয়েছে। কিন্তু সব হ্যাটট্রিক সমান নয়। কিছু হ্যাটট্রিক কেবল তিনটি গোলের পরিসংখ্যান, কিছু একটি দলকে জেতায়, আর কিছু হ্যাটট্রিক একজন খেলোয়াড়ের পরিচয় বদলে দেয়। ডেম্বেলের হ্যাটট্রিক সেই বিরল তৃতীয় শ্রেণির। আজ থেকে বহু বছর পরে মানুষ হয়তো এই ম্যাচের পুরো স্কোরলাইন ভুলে যাবে। হয়তো মনে থাকবে না কে অ্যাসিস্ট করেছিলেন, কিংবা কোন মিনিটে কোন গোল হয়েছিল।
কিন্তু ইতিহাস মনে রাখবেÑ বিশ্বকাপের এক রাতে, মাত্র ৩২ মিনিটে এক ফরাসি ফুটবলার নিজের সব অতীত, সব সমালোচনা আর সব অপূর্ণতাকে পেছনে ফেলে নতুন করে জন্ম নিয়েছিলেন।
ওসমান ডেম্বেলের এই হ্যাটট্রিক শুধু একটি ব্যক্তিগত অর্জন নয় এটি ধৈর্য, অধ্যবসায় ও প্রত্যাবর্তনের এক অনন্য প্রতীক।
যে খেলোয়াড়কে একসময় অপূর্ণ প্রতিভা বলা হতো, তিনিই আজ বিশ্বকাপের ইতিহাসের অংশ।
আর যদি এই ছন্দ ধরে রাখতে পারেন, তা হলে ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ফ্রান্সের সাফল্যের গল্প হয়ে থাকবে না, এটি হয়ে উঠবে ওসমান ডেম্বেলের পুনর্জন্মের বিশ্বকাপ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন