এক সময় মনে করা হতো, মাদক শুধু শহরের সমস্যা। কিন্তু বাস্তবতা আজ সম্পূর্ণ ভিন্ন। এখন মাদকের ছোবল পৌঁছে গেছে গ্রামের অলিগলি, হাট-বাজার, এমনকি প্রত্যন্ত জনপদেও। যে গ্রাম একসময় পারস্পরিক সহযোগিতা, সামাজিক বন্ধন ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের প্রতীক ছিল, সেই গ্রামেই আজ মাদককে কেন্দ্র করে বাড়ছে হানাহানি, মারামারি, চুরি, ডাকাতি, পারিবারিক কলহ ও সামাজিক অস্থিরতা। অনেক পরিবার সর্বস্ব হারিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়ছে, আর এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ছে পুরো সমাজব্যবস্থার ওপর।
মাদকের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে গ্রামীণ সমাজের চিত্র। বেকারত্ব, হতাশা, কৌতূহল, অসৎ সঙ্গ এবং সহজলভ্যতার সুযোগ নিয়ে অনেক তরুণ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মাদকাসক্ত ব্যক্তি শুধু নিজের জীবনই ধ্বংস করে না, তার পরিবারকেও ঠেলে দেয় অনিশ্চয়তার অন্ধকারে। সংসারের অর্থ ব্যয় হয় মাদকের পেছনে, একসময় বিক্রি হয়ে যায় জমি, গবাদিপশু কিংবা গয়না। অর্থের অভাবে শুরু হয় চুরি, ছিনতাই, পারিবারিক নির্যাতন এবং নানা ধরনের অপরাধ।
গ্রামে এখন প্রায়ই শোনা যায় মাদককে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ, মারামারি কিংবা হত্যার ঘটনা। পারিবারিক কলহ বেড়ে যাওয়ায় ভেঙে যাচ্ছে বহু সংসার। মাদকাসক্ত সন্তানের আচরণে অসহায় হয়ে পড়ছেন বাবা-মা। সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগে দিন কাটাচ্ছেন অভিভাবকরা। ফলে শুধু একটি ব্যক্তি নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে পুরো পরিবার এবং সমাজ।
মাদকের এই বিস্তারের পেছনে অবৈধ পাচার ও ব্যবসার একটি শক্তিশালী চক্র কাজ করছে। গ্রামের নির্জন এলাকাকে ব্যবহার করা হচ্ছে মাদক সংরক্ষণ ও বিক্রির নিরাপদ স্থান হিসেবে। প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং গোপন যোগাযোগের মাধ্যমে এই চক্র আরও সক্রিয় হয়ে উঠছে। তাই শুধু আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানই যথেষ্ট নয়, প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলা।
মাদক প্রতিরোধে পরিবারই হতে পারে প্রথম দুর্গ। সন্তানের চলাফেরা, বন্ধু-বান্ধব, আচরণ এবং মানসিক পরিবর্তনের দিকে অভিভাবকদের সচেতন দৃষ্টি রাখতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, জনপ্রতিনিধি, যুব সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক সংগঠনকে একযোগে কাজ করতে হবে। খেলাধুলা, সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি তরুণদের ইতিবাচক পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের বিষয়টিও সমান গুরুত্ব পাওয়া উচিত। কারণ অনেকেই আসক্তির শিকার হয়ে অপরাধের পথে যায়। তাদের সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনা সমাজেরই দায়িত্ব।
গ্রামীণ বাংলাদেশের শান্তি, নিরাপত্তা ও সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষায় মাদকের বিরুদ্ধে এখনই সর্বাত্মক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। মনে রাখতে হবে, মাদক শুধু একজন মানুষকে নয়, একটি পরিবার, একটি প্রজন্ম এবং শেষ পর্যন্ত একটি জাতির সম্ভাবনাকেই ধ্বংস করে। তাই মাদকমুক্ত গ্রাম গড়ে তোলা আজ সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
সাংবাদিক ও সহকারী শিক্ষক (আইসিটি)
পিরোজপুর দারুল কুরআন মহিলা আলিম মাদ্রাসা, পিরোজপুর।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন