জাতীয় সংসদে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পাস হয়েছে। এটি দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় বাজেট এবং বিএনপি সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রথম পূর্ণাঙ্গ জাতীয় বাজেট। সংসদে দীর্ঘ আলোচনা, বিরোধী দলের সমালোচনা এবং একাধিক গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীর পর বাজেটটি অনুমোদন পেয়েছে। সরকারের ভাষ্য অনুযায়ী, এই বাজেটের মূল লক্ষ্য মানবিক অর্থনীতি গড়ে তোলা, বিনিয়োগ বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ। একই সঙ্গে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন ও মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যও নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাজেটের সবচেয়ে ইতিবাচক দিকগুলোর একটি হলো সংসদীয় আলোচনার পর সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে নমনীয়তা দেখিয়েছে। করমুক্ত আয়সীমা ৪ লাখ টাকায় উন্নীত করা, জমি ও ফ্ল্যাট নিবন্ধনসংক্রান্ত বিতর্কিত বিধান প্রত্যাহার এবং কয়েকটি নতুন ভ্যাট আরোপ থেকে সরে আসা প্রমাণ করে যে সংসদীয় বিতর্ক কেবল আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; বরং কিছু ক্ষেত্রে জনমত ও বাস্তবতার প্রতিফলন ঘটেছে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় এ ধরনের অংশগ্রহণমূলক বাজেট প্রক্রিয়া নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
তবে বাজেটের প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কাগজে লেখা লক্ষ্যমাত্রা দিয়ে নয়, বাস্তব ফলাফলের ভিত্তিতে। বাংলাদেশে প্রায় প্রতি বছরই উচ্চ প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থানের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের দুর্বলতা, প্রকল্পে ধীরগতি, রাজস্ব আহরণে ব্যর্থতা, দুর্নীতি এবং প্রশাসনিক অদক্ষতার কারণে সেই লক্ষ্য অনেক সময়ই অধরাই থেকে যায়। ফলে এবারও প্রশ্ন উঠছে, ঘোষিত লক্ষ্যগুলো কতটা বাস্তবসম্মত?
এবারের বাজেটে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) ধারাবাহিকভাবে রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে। অর্থনীতিতে বিনিয়োগ ও ব্যবসায়িক কার্যক্রম প্রত্যাশিত গতিতে না বাড়লে এত বড় রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়বে। রাজস্ব ঘাটতি তৈরি হলে সরকারকে আবারও ঋণের ওপর নির্ভর করতে হবে, যার চাপ শেষ পর্যন্ত সাধারণ জনগণের ওপরই এসে পড়ে।
বাজেটে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতি রাখা হয়েছে, যার বড় অংশ পূরণ করা হবে অভ্যন্তরীণ ঋণ ও বৈদেশিক সহায়তার মাধ্যমে। বৈদেশিক ঋণ উন্নয়নের জন্য প্রয়োজনীয় হতে পারে, কিন্তু ঋণনির্ভর অর্থনীতি দীর্ঘমেয়াদে ঝুঁকিপূর্ণ। একইভাবে অভ্যন্তরীণ ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে অতিরিক্ত ঋণ নিলে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণপ্রবাহ সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে বিনিয়োগ ও শিল্পায়নের গতিও বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
এ বাজেট দেশের জন্য একটি নতুন অর্থনৈতিক যাত্রার সূচনা হতে পারে, যদি এটি দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়িত হয়। অন্যথায় বড় বাজেট কেবল বড় অঙ্কের হিসাব হয়েই থাকবে। তাই এখন সরকারের প্রধান দায়িত্ব হওয়া উচিত বাস্তবায়ন সক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, রাজস্ব প্রশাসনের সংস্কার, উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় রোধ এবং প্রতিটি টাকার সর্বোচ্চ জনকল্যাণ নিশ্চিত করা।
বাজেট পাস হয়েছে, এখন প্রয়োজন বাজেটের প্রতিশ্রুতিগুলোকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও প্রশাসনিক দক্ষতা। কারণ একটি বাজেটের সাফল্য সংসদে কণ্ঠভোটে নয়, জনগণের জীবনমানের উন্নতিতে পরিমাপ করা হয়। মানুষের আয় বাড়লে, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হলে, বাজারে স্বস্তি ফিরলে এবং রাষ্ট্রীয় সেবার মান উন্নত হলে তবেই এই বাজেট সত্যিকার অর্থে সফল বলে বিবেচিত হবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন