চলনবিলের বিস্তীর্ণ জলরাশির বুক চিরে বয়ে চলা গুমানি নদীর দুই পাড়ে বসবাসকারী প্রায় ৫০ হাজার মানুষের জীবন যেন আজও আটকে আছে এক খেয়াঘাটে। নাটোরের গুরুদাসপুর, সিরাজগঞ্জের তাড়াশ এবং পাবনার চাটমোহর উপজেলার সীমান্তঘেঁষা এই নদীর ওপর একটি সেতুর দাবি জানিয়ে আসছেন স্থানীয়রা দীর্ঘ পাঁচ দশক ধরে। কিন্তু আজও সেই স্বপ্ন বাস্তব হয়নি। ফলে দশ গ্রামের মানুষের প্রতিদিনের ভরসা এখন একটি ছোট খেয়া নৌকা।
কাছিকাটা দাসপাড়া নিসিবাড়ি ঘাট থেকে বিলব্যাসপুর পর্যন্ত নদীর এই অংশটি তিন উপজেলারÑ গুরুদাসপুরের বিলব্যাসপুর, বিলকাঠুর, রানীগ্রাম ও ইয়াসিনপুর; তাড়াশের থল, নলডাঙ্গা ও হামকুড়া; এবং চাটমোহরের এনায়েতপুর গ্রামের মানুষের প্রধান যোগাযোগপথ। শিক্ষা, চিকিৎসা, কৃষি ও ব্যবসাÑ সব কিছুর জন্যই এই নদী পারাপার করতে হয় তাদের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, আধুনিকতার যুগেও এখানে কোনো স্থায়ী সেতু না থাকায় প্রতিদিন চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। গ্রামবাসীর নিজস্ব অর্থায়নে চালিত একটি খেয়া নৌকাই একমাত্র ভরসা। মাসিক প্রায় ৯ হাজার টাকা পারিশ্রমিকে মাঝি ময়লাল প্রতিদিন সকাল থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত মানুষ পারাপার করলেও তা চাহিদার তুলনায় অপ্রতুল।
বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বেড়ে যায়। নদীর প্রবল স্রোত ও পানি বৃদ্ধির কারণে পারাপার হয়ে ওঠে ঝুঁকিপূর্ণ। এতে অসুস্থ রোগীকে হাসপাতালে নেওয়া, শিক্ষার্থীদের পরীক্ষাকেন্দ্রে পৌঁছানো কিংবা কৃষিপণ্য বাজারজাত করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. আসলাম আলী ও দবীর উদ্দিন বলেন, ‘একটি সেতুর অভাবে বছরের পর বছর আমরা চরম কষ্টে আছি। সন্তানদের স্কুলে পাঠানো, রোগী হাসপাতালে নেওয়া কিংবা ফসল বাজারে পৌঁছানো—সবকিছুতেই ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সেতু হলে আমাদের জীবন অনেক সহজ হয়ে যেত।’
বিলব্যাসপুর গ্রামের সালাম সরকার বলেন, ‘গুমানি নদী আমাদের উন্নয়নের পথ আটকে রেখেছে। একটি সেতু হলে শুধু দুই পাড় নয়, তিন উপজেলার মানুষের মধ্যে যোগাযোগ ও অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও দৃঢ় হতো।’
স্থানীয়দের মতে, গুমানি নদীর ওপর সেতু নির্মাণ শুধু একটি অবকাঠামো নয়; এটি হবে দীর্ঘদিনের বঞ্চনা ও অপেক্ষার অবসানের প্রতীক। একই সঙ্গে চলনবিল অঞ্চলের কৃষি, শিক্ষা ও ব্যবসায়িক সম্ভাবনায় নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে।
মশিন্দা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বারী জানান, বিলব্যাসপুর ও রানীগ্রাম মৌজার মধ্যবর্তী আত্রাই নদীর ওপর রাবারড্যাম নির্মাণ প্রকল্পটি একনেকের অনুমোদনের চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে সেচ সুবিধা ও যোগাযোগব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আসবে।
উপজেলা সহকারী প্রকৌশলী সাইদুর রহমান বলেন, ‘গুমানি নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি। পাশাপাশি রাবারড্যাম নির্মাণ করা গেলে শুষ্ক মৌসুমে কৃষকদের সেচ সুবিধা নিশ্চিত হবে এবং বিস্তীর্ণ অঞ্চল উপকৃত হবে।’ তিনি আরও জানান, প্রকল্পটি ইতিমধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে এবং একনেকে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আগামী নভেম্বর-ডিসেম্বরের মধ্যে অনুমোদন মিললে কাজ শুরু হতে পারে বলে আশা করা হচ্ছে।
নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ বলেন, ‘গুমানি নদীর ওপর সেতু নির্মাণ এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের দাবি। রাবারড্যাম প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে ভবিষ্যতে সেতু নির্মাণের পথ আরও সুগম হবে এবং মানুষের দুর্ভোগের অবসান ঘটবে।’ তিনি প্রকল্প বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ অব্যাহত রাখার আশ্বাস দেন। দীর্ঘ ৫০ বছরের অপেক্ষায় থাকা গুমানি নদীর দুই পাড়ের মানুষ এখনো তাকিয়ে আছে একটি সেতুর দিকেÑ যা হয়তো তাদের জীবনে আনবে উন্নয়নের নতুন সকাল।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন