ফিফা বিশ্বকাপের শেষ ষোলোতে আজ মুখোমুখি হচ্ছে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনা ও আফ্রিকান শক্তি মিসর। ম্যাচটিকে অন্য মাত্রা দিয়েছে দুই তারকা ফুটবলার লিওনেল মেসি ও মোহাম্মদ সালাহর লড়াই। এই ম্যাচ গোল্ডেন বুটের দৌড়ে থাকা মেসির সামনে যেমন আরেকটি বড় পরীক্ষা, তেমনি সালাহও নিজের সামর্থ্যরে প্রমাণ দিতে মুখিয়ে আছেন। এদিকে বিশ্লেষকদের ভবিষ্যদ্বাণী হলো, ম্যাচটি জমজমাট হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। তবে জয়ের পাল্লা হেলে আছে আর্জেন্টিনার দিকে।
অপটা সুপার কম্পিউটারের পূর্বাভাস অনুযায়ী, নির্ধারিত ৯০ মিনিটে আর্জেন্টিনার জয়ের সম্ভাবনা ৬৯ দশমিক ১ শতাংশ। অন্যদিকে মিসরের সম্ভাবনা ১২ দশমিক ২ শতাংশ। ড্র হওয়ার সম্ভাবনা ১৮ দশমিক ৭ শতাংশ। প্রসংগত, বিশ্বকাপে গত পাঁচটি শেষ ষোলোর ম্যাচেই জয় পেয়েছে লিওনেল স্কালোনির দল। অন্যদিকে ইতিহাসে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের নকআউট পর্বে জয় পেয়ে শেষ ষোলোতে এসেছে মিসর।
দাপটের সঙ্গে নকআউটে আর্জেন্টিনা :
গ্রুপ পর্বে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে ‘গ্রুপ জে’ চ্যাম্পিয়ন হয়ে নকআউট রাউন্ডে উঠেছে আর্জেন্টিনা। প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়াকে ৩-০ এবং দ্বিতীয় ম্যাচে অস্ট্রিয়াকে ২-০ গোলে হারায় তারা। তৃতীয় ম্যাচে প্রথমবারের মতো গোল হজম করলেও জর্ডানকে ৩-১ গোলে পরাজিত করে শতভাগ জয় নিয়ে গ্রুপ পর্ব শেষ করে লাতিন আমেরিকান ফুটবলের অন্যতম পরাশক্তি।
শেষ বত্রিশে চমক জাগানো কেপ ভার্দের বিপক্ষে অবশ্য কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয় আর্জেন্টিনাকে। ২৯ মিনিটে মেসির সপ্তম গোল দলকে এগিয়ে দিলেও নির্ধারিত সময়ে ১-১-এ সমতা ফেরান কেপ ভার্দে। অতিরিক্ত সময়ে লিসান্দ্রো মার্টিনেজ গোল করে আর্জেন্টিনাকে এগিয়ে নিলে আবারও সমতা ফেরায় প্রতিপক্ষ। শেষ পর্যন্ত ১১১ মিনিটে আত্মঘাতী গোলে ৩-২ ব্যবধানে জয় নিশ্চিত করে কোয়ার্টার ফাইনালের পথে এগিয়ে যায় বিশ^চ্যাম্পিয়নরা।
গোলের ধারা অব্যাহত রাখতে চায় আর্জেন্টিনা :
বিশ্বকাপে নিজেদের শেষ চার ম্যাচের প্রতিটিতে অন্তত দুটি করে গোল করেছে আর্জেন্টিনা। মিসরের বিপক্ষেও সেই ধারা অব্যাহত রাখার লক্ষ্য থাকবে স্কালোনির দলের। যদিও কেপ ভার্দের বিপক্ষে অতিরিক্ত ১২০ মিনিট খেলতে হওয়ায় দলের কয়েকজন ফুটবলার শারীরিকভাবে ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফাকুন্দো মেদিনা, এনজো ফার্নান্দেজ ও নিকোলাস গনজালেস চোট ও ক্র্যাম্পের সমস্যায় ভুগছেন। তবে মেদিনার সমস্যা গুরুতর নয় বলে জানিয়েছে দলীয় সূত্র। স্কালোনি বলেছেন, ‘শেষ দিকে আমাদের আর বদলি ছিল না। কয়েকজন খেলোয়াড় ক্র্যাম্পে ভুগছিল। তখন শুধু রক্ষণভাগ সামলানোই ছিল লক্ষ্য। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আমরা পরের পর্বে উঠেছি। ভুলগুলো শুধরে নেব।’
টাইব্রেকারে জিতে এসেছে মিসর :
অন্যদিকে, মিসরের শেষ ষোলোর পথে জয়ের সংখ্যা কম। কিন্তু যেসব ম্যাচে জয় প্রয়োজন, সেসব ম্যাচে ঠিকই তা আদায় করে নিয়েছে সালাহরা। গ্রুপ পর্বে বেলজিয়ামের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করার পর নিউজিল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারায় আফ্রিকার এই ফুটবলশক্তি। শেষ ম্যাচে ইরানের সঙ্গে ১-১ গোলে ড্র করে গ্রুপ রানার্সআপ হিসেবে নকআউট রাউন্ডে ওঠে তারা। শেষ বত্রিশে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ইমাম আশুরের গোলে এগিয়ে যায় মিসর। তবে আত্মঘাতী গোলের কারণে ম্যাচ গড়ায় অতিরিক্ত সময়ে। এরপর টাইব্রেকারে ৪-২ ব্যবধানে জিতে শেষ ষোলোতে জায়গা করে নেয় আফ্রিকার প্রতিনিধিরা।
মেসির আক্রমণ বনাম মিসরের রক্ষণ :
চলতি বিশ্বকাপে আক্রমণভাগে অন্যতম সফল দল আর্জেন্টিনা। প্রতি ম্যাচে গড়ে ২ দশমিক ৮ গোল করেছে তারা। টুর্নামেন্টে পাসিং নির্ভুলতায়ও শীর্ষ দলগুলোর একটি আর্জেন্টিনা, যার ফলে সহজেই আক্রমণ গড়ে তুলতে পারছে তারা। দলের অধিনায়ক লিওনেল মেসি এরই মধ্যে সাতটি গোল করেছেন, যা গোল্ডেন বুটের লড়াইয়ে তাকে শীর্ষে রেখেছে। অবশ্য এ রিপোর্ট লেখা পর্যন্ত তার সঙ্গে একই স্থানে রয়েছেন আরও দুজনÑ ফ্রান্সের কিলিয়ান এমবাপ্পে এবং নরওয়ের আর্লিং হলান্ড।
এদিকে মিসর এখন পর্যন্ত তাদের রক্ষণভাগে বেশ দৃঢ়তা দেখিয়েছে। চার ম্যাচে নিয়মিত সময়ে মাত্র তিন গোল হজম করেছে তারা। অপ্রয়োজনীয় ফাউলও খুব কম করে, ফলে প্রতিপক্ষকে সেট-পিসের সুযোগ খুব একটা দেয় না।
সুযোগ কাজে লাগাতে চাইবে মিসর :
মিসরের বড় শক্তি তাদের রক্ষণভাগ হলেও আর্জেন্টিনার বিপক্ষে সফল হতে হলে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলতে হবেÑ এমনটাই মনে করেন বিশ্লেষকেরা। আর্জেন্টিনা রক্ষণভাগে তুলনামূলক উঁচু লাইনে খেলে থাকে। পাল্টা আক্রমণে এই ছক কাজে লাগাতে পারেন মোহাম্মদ সালাহ ও ওমর মারমুশরা। তবে সে জন্য মিসরকে নিজেদের স্বাভাবিক রক্ষণাত্মক কৌশল থেকে বেরিয়ে এসে ঝুঁকি নিতে হবে।
সালাহর সামনে নতুন রেকর্ডের হাতছানি :
চলতি বিশ্বকাপে এখন পর্যন্ত ১৬টি গোলের সুযোগ তৈরি করেছেন মোহাম্মদ সালাহ। আর্জেন্টিনার বিপক্ষে আরও দুটি সুযোগ তৈরি করতে পারলে ২০১০ বিশ্বকাপে ঘানার কেভিন-প্রিন্স বোয়াটেংয়ের ১৮টি সুযোগ তৈরির আফ্রিকান রেকর্ড স্পর্শ করবেন তিনি। তবে মিসরের রক্ষণে রয়েছে দুশ্চিন্তা। করিম হাফেজ, মোহাম্মদ আবদেল মোনেম ও আহমেদ ফাতুহর চোট নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। যদিও নিষেধাজ্ঞা কাটিয়ে দলে ফিরছেন অভিজ্ঞ মিডফিল্ডার মোহানাদ লাশিন।
পূর্বাভাসে এগিয়ে আর্জেন্টিনা :
বিশ্লেষকদের মতে, দুই দলের সামগ্রিক পারফরম্যান্স, আক্রমণভাগের ধার এবং রক্ষণে স্থিতিশীলতা বিবেচনায় ম্যাচে স্পষ্ট ফেভারিট আর্জেন্টিনা। কেপ ভার্দের বিপক্ষে কঠিন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতার পর মেসির দল আরও সতর্ক হয়ে মাঠে নামবে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। পূর্বাভাস অনুযায়ী, মিসর লড়াই করলেও শেষ পর্যন্ত ২-১ গোলের জয় নিয়ে কোয়ার্টার ফাইনালে উঠতে পারে আর্জেন্টিনা।
সম্ভাব্য একাদশ
আর্জেন্টিনা :
এমিলিয়ানো মার্তিনেজ, নাহুয়েল মোলিনা, ক্রিস্তিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, ফাকুন্দো মেদিনা, রদ্রিগো ডি পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, লিওনেল মেসি, লাউতারো মার্তিনেজ, থিয়াগো আলমাদা।
মিসর : মোস্তফা শোবেইর, মোহাম্মদ হানি, আহমেদ ফাথি, ইব্রাহিম রাবিয়া, ইমাম আশুর, মোহানাদ লাশিন, আতেয়া, জিকো, মোহাম্মদ সালাহ, ওমর মারমুশ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন