বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ ও সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে পাহাড়ি এলাকা। অতি বৃষ্টির কারণে চট্টগ্রাম বিভাগের পাহাড়ি এলাকার কোথাও কোথাও ভূমিধস হতে পারে বলে সতর্ক করে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এ সতর্কতার মধ্যেই গত রোববার গভীর রাত থেকে সোমবার ভোররাত পর্যন্ত পাহাড়ধসে কক্সবাজারে ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে। এদিকে চট্টগ্রামের ৩৪টি ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস করছে এক লাখেরও বেশি মানুষ। সোমবার সকালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন পাহাড়ে বসবাসকারীদের নিরাপদ আশ্রয়ে সরে যেতে মাইকিং করেছে জেলা প্রশাসন। বান্দরবান-থানচি সড়কের নীলগিরি ও নীল দিগন্ত পর্যটনকেন্দ্র সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় থানচির সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। রাঙামাটিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। তবে প্রতিবছরের মতো এবারও প্রশ্ন উঠেছে, বর্ষা এলেই প্রশাসনের তৎপরতা বাড়লেও বছরের বাকি সময় পাহাড়ে অবৈধ বসতি উচ্ছেদ ও পুনর্বাসনে কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
কক্সবাজারে পাহাড়ধসে ৯ জনের মৃত্যু :
রোববার গভীর রাতে উখিয়ার ১৫ নম্বর জামতলী রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের একটি বড় অংশ ধসে একটি বসতঘরের ওপর পড়ে। দীর্ঘ উদ্ধার অভিযানের পর ধ্বংসস্তূপের নিচ থেকে মোহাম্মদ কামাল হোসাইন, তার স্ত্রী হুমায়রা বেগম এবং চার বছরের ছেলে আনাসের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। আহত অবস্থায় উদ্ধার করা হয় আরও দুজনকে।
এর কিছু সময় পর রাজাপালংয়ের কুতুপালং ৭ নম্বর শরণার্থী শিবিরে পাহাড়ি ঢলে চাপা পড়ে সাত বছর বয়সি একরামের মৃত্যু হয়। রাত ৩টার দিকে উখিয়ার বালুখালী ১১ নম্বর শরণার্থী শিবিরে আবারও পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটে। এতে নারী ও শিশুসহ আরও চারজন নিহত হন। আহত হন একজন।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিস, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনারের (আরআরআরসি) কার্যালয়, ক্যাম্প প্রশাসন এবং রোহিঙ্গা স্বেচ্ছাসেবকেরা রাতভর উদ্ধার অভিযান চালান। ধ্বংসস্তূপ সরিয়ে হতাহতদের উদ্ধার করা হয়।
অন্যদিকে একই রাতে কক্সবাজার পৌরসভার ১২ নম্বর ওয়ার্ডের ছাত্তারঘোনা এলাকায় পাহাড়ধসে একই পরিবারের তিনজন চাপা পড়েন। স্থানীয়দের সহায়তায় দুজনকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও গুরুতর আহত আলী আকবরকে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে নেওয়ার পর চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। পাহাড়ধসে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বহু বসতঘর ধসে গেছে। কাদামাটি ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে অনেক আশ্রয়কেন্দ্র। নতুন করে ধসের আশঙ্কায় হাজারো পরিবার নিরাপদ স্থানে আশ্রয় নিয়েছে।
এদিকে, প্রবল বর্ষণে পর্যটন শহর কক্সবাজারসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কসহ বিভিন্ন সড়ক ও উপসড়কের নি¤œাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। এতে যান চলাচল ও সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ বেড়েছে।
প্রতি বর্ষা মৌসুমেই কক্সবাজারে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটলেও ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ে বসবাস পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। বিশেষ করে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবির এবং পাহাড়ঘেঁষা স্থানীয় বসতিগুলোতে ঝুঁকি বহাল থাকায় প্রতি বছরই প্রাণহানির ঘটনা ঘটছে। প্রশাসন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে লোকজনকে নিরাপদ স্থানে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
গত ৫ বছরে কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধসে অন্তত ৩৫ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং আহত হয়েছেন অর্ধশত। প্রতি বর্ষা মৌসুমে প্রবল বৃষ্টিপাতে পাহাড় ও ঢাল কেটে তৈরি করা এই ঘনবসতিপূর্ণ আশ্রয়শিবিরগুলোতে প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
পরিবেশবাদীদের মতে, মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসার পর উখিয়া ও টেকনাফের পাহাড় ও বনভূমি কেটে প্রায় ৩৪টি ক্যাম্প তৈরি করা হয়। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড়ের ঢাল কেটে মাটির গর্তে ঝুঁকিপূর্ণ বসতি স্থাপনের ফলেই প্রতি বর্ষা মৌসুমে ভারি বৃষ্টিপাতে এসব মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটছে।
শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোহাম্মদ মিজানুর রহমান রোহিঙ্গা শিবিরে পাহাড়ধসে ৮ জনের মৃত্যুর ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, টানা বৃষ্টির কারণে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ি এলাকায় বসবাসকারী রোহিঙ্গাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে গত কয়েকদিন ধরেই মাইকিংসহ বিভিন্নভাবে সতর্ক করা হয়েছিল। তিনি জানান, পাহাড়ধসের পর ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। আপাতত তাদের ক্যাম্পের লার্নিং সেন্টারগুলোতে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা হয়েছে।
মিজানুর রহমান আরও বলেন, এ ধরনের দুর্ঘটনার স্থায়ী সমাধান একটাই, রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছা ও টেকসইভাবে নিজ দেশ মিয়ানমারে প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা।
চট্টগ্রামের ৩৪ পাহাড়ে ঝুঁকিতে এক লাখের বেশি মানুষ : চট্টগ্রাম নগরীর সরকারি ও বেসরকারি ৩৪টি পাহাড়ে বিপজ্জনক অবস্থায় বসবাস করছে এক লাখেরও বেশি মানুষ। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে পাহাড়ে অবৈধ বসবাসকারীর সংখ্যা প্রায় ১০ গুণ বেড়েছে।
জেলা প্রশাসনের হালনাগাদ তালিকা অনুযায়ী, নগরীর ২৬টি সরকারি ও বেসরকারি পাহাড়ে রয়েছে ৬ হাজার ৫৫৮টি অবৈধ স্থাপনা। এর মধ্যে সরকারি বিভিন্ন সংস্থার মালিকানাধীন ১৬টি পাহাড়ে বসবাস করছে ৬ হাজার ১৭৫টি পরিবার এবং ব্যক্তি মালিকানাধীন ১০টি পাহাড়ে রয়েছে আরও ৩৮৩টি পরিবার।
বায়েজিদ লিংক রোড, সলিমপুর, আকবর শাহ, অক্সিজেন, রৌফাবাদ, লালখান বাজারের মতিঝর্ণা এবং ফয়’স লেক এলাকায় সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ বসতি গড়ে উঠেছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন ফয়’স লেকের ১, ২ ও ৩ নম্বর ঝিল পাহাড়ে বসবাস করছে চার হাজার ৪৭৬টি পরিবার। রেলওয়ের আরও কয়েকটি পাহাড়েও শত শত পরিবার বসবাস করছে।
স্থানীয়দের দাবি, শুধু মতিঝর্ণা, টাংকির পাহাড়, বাটালি হিল ও টাইগারপাস এলাকায়ই ২০ থেকে ৩০ হাজার মানুষের বসবাস।
পরিবেশ আন্দোলনের কর্মীরা বলছেন, স্থানীয় প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় বছরের পর বছর পাহাড় দখল করে ঘর নির্মাণ করা হচ্ছে। পরে সেগুলো নিম্নআয়ের মানুষের কাছে ভাড়া দেওয়া হচ্ছে। পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের অভাবেই অবৈধ বসতি পুরোপুরি উচ্ছেদ করা যাচ্ছে না।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের ১১ জুন ভয়াবহ পাহাড়ধসে ১২৭ জন নিহত হওয়ার পর ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড় ও অবৈধ বসতির তালিকা প্রণয়ন শুরু হয়। এরপর থেকে গত ১৭ বছরে চট্টগ্রাম নগরী ও আশপাশের এলাকায় পাহাড়ধসে মোট ২৫১ জনের মৃত্যু হয়েছে। সর্বশেষ ২০২৩ সালে ষোলশহরের আইডব্লিউ কলোনিতে পাহাড়ধসে বাবা ও সাত মাস বয়সি মেয়ের মৃত্যু হয়। একই বছর আকবর শাহ এলাকায় আরও একজন নিহত হন। এর আগে ২০২২ সালে আকবর শাহ ও ফয়’স লেক এলাকায় পাহাড়ধসে চারজন নিহত হন।
মৌসুমি স্থল নিম্নচাপের প্রভাবে টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ধসের আশঙ্কা বাড়ায় সোমবার সকাল থেকে জেলা প্রশাসন নগরের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং শুরু করেছে। এর আগে রোববার রাতেও সতর্কতামূলক প্রচার চালানো হয়।
চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা বলেন, আবহাওয়া অধিদপ্তরের ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেতের পরিপ্রেক্ষিতে পাহাড়ধসের ঝুঁকি বিবেচনায় মাইকিং করা হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নিতে প্রশাসনের একাধিক দল মাঠে কাজ করছে।
রাঙামাটিতে পাহাড়ধস ট্র্যাজেডির ৯ বছর :
২০১৭ সালের রাঙামাটিতে ভয়াবহ পাহাড়ধসে পাঁচ সেনা সদস্যসহ মারা যায় ১২০ জন। এরপর ২০১৮ সালের ১২ জুন জেলার নানিয়ারচরে পাহাড়ধসে মৃত্যু হয় ১১ জনের। পাহাড়ধসে ১৩১ জনের মৃত্যুর পরও টনক নড়েনি প্রশাসনের। জেলায় এখনো লক্ষাধিক মানুষ বাস করছে ঝুঁকিপূর্ণভাবে।
থানচির সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ বন্ধ :
টানা কয়েকদিনের ভারি বর্ষণে বান্দরবান-থানচি সড়কের নীলগিরি ও নীল দিগন্ত পর্যটনকেন্দ্র সড়কের মাঝামাঝি এলাকায় পাহাড়ধসের ঘটনায় থানচির সঙ্গে বান্দরবানের সড়ক যোগাযোগ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকে। গতকাল সকালে পাহাড়ের মাটি ধসে সড়কের ওপর পড়ে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। খবর পেয়ে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও জেলা প্রশাসনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে সড়ক থেকে মাটি সরিয়ে যোগাযোগ স্বাভাবিক করতে কাজ শুরু করেন। বান্দরবানের জেলা প্রশাসক সানিউল ফেরদৌস বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
রাঙামাটিতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরতে প্রশাসনের মাইকিং :
রাঙামাটিতে নি¤œচাপের প্রভাবে থেমে থেমে মাঝারি ও ভারি বৃষ্টিপাতের ফলে পাহাড়ধসের আশঙ্কায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সরে যেতে মাইকিং করেছে স্থানীয় প্রশাসন। গতকাল সোমবার সকাল থেকে পাহাড়ধসের ঝুঁকিতে বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ আশ্রয় কেন্দ্রে চলে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানানো হয়। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় রাঙামাটি পৌর এলাকার ৯টি ওয়ার্ডে মোট ১১টিসহ জেলায় ৪১টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পৌর এলাকার ২৮টি স্থানকে পাহাড়ধ্বসপ্রবণ ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন