একসময় বর্ষা এলেই কিশোরগঞ্জের নিকলী হাওরে নামত দেশি-বিদেশি পর্যটকদের ঢল। ছুটির দিনগুলোতে হাজারো মানুষের পদচারণে মুখর থাকত দৃষ্টিনন্দন বেড়িবাঁধ, ট্রলারঘাট ও দিগন্তজোড়া জলরাশি। অথচ চলতি ভরা বর্ষা মৌসুমে সেই চিরচেনা চিত্র পুরোপুরি বদলে গেছে। পানি সংকট, লাগামহীন ট্রলার ভাড়া, খাবারের অতিরিক্ত মূল্য, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ, নিরাপত্তার ঘাটতি ও প্রশাসনিক নজরদারির অভাবে ভরা যৌবনেও এখন পর্যটকশূন্য হয়ে পড়েছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই হাওরভিত্তিক পর্যটনকেন্দ্র।
সম্প্রতি নিকলী হাওর ঘুরে দেখা যায়, পর্যটক না থাকায় শত শত ট্রলার ঘাটে অলস পড়ে আছে। বেড়িবাঁধসংলগ্ন অস্থায়ী দোকান ও খাবারের হোটেলগুলোও প্রায় ক্রেতাশূন্য। হাতে গোনা কয়েকজন পর্যটক এলে তাদের ট্রলারে তুলতে মাঝিদের মধ্যে কাড়াকাড়ি লেগে যায়।
নিকলী হাওরের প্রধান আকর্ষণ বিস্তীর্ণ জলরাশি। কিন্তু বর্ষার মাঝামাঝি সময়েও এবার কাক্সিক্ষত পানি না থাকায় নৌভ্রমণের আকর্ষণ অনেকটাই কমে গেছে। বিভিন্ন স্থানে ডুবোচর জেগে ওঠায় ট্রলার চলাচলও ব্যাহত হচ্ছে।
ছয় লাখ টাকা ঋণ নিয়ে ট্রলার বানানো মালিক জাকির হোসেন বলেন, ‘গত বছর এ সময় দম ফেলার সুযোগ ছিল না। এবার সারা দিন বসেও একটি ট্রিপ মিলছে না। ট্রলারের কিস্তি দেওয়া তো দূরের কথা, এখন সহকারীর বেতন দেওয়াই দায় হয়ে পড়েছে।’ একই আক্ষেপ মাঝি ইমরাজুল ও কাওসারের।
পর্যটকদের প্রধান অভিযোগÑ নিকলী হাওরে ট্রলার ভাড়া ও খাবারের দামে কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। নির্দিষ্ট কোনো মূল্যতালিকা না থাকায় যার কাছ থেকে যেমন পারা যাচ্ছে, তেমন টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
টাঙ্গাইল থেকে আসা পর্যটক বেলাল হোসেন ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘দুই লিটারের পানির বোতল ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে! কোথাও কোনো মূল্যতালিকা নেই। এমন জিম্মি দশা ও সিন্ডিকেট চলতে থাকলে মানুষ দ্বিতীয়বার আর এখানে আসতে চাইবে না।’ গাজীপুরের তানভীর আহমেদ বলেন, ‘একেক মাঝি একেক রকম ভাড়া চাইছেন। স্থানীয় হোটেলগুলোতে মাছের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। প্রশাসনের উচিত অবিলম্বে ট্রলার ভাড়া ও খাবারের দাম নির্ধারণ করে দেওয়া।’
ঢাকা থেকে বেড়াতে আসা তাজিয়া আক্তার হৃদি বলেন, ‘প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অসাধারণ হলেও রক্ষণাবেক্ষণের অভাব স্পষ্ট। বিশেষ করে নারী পর্যটকদের জন্য পর্যাপ্ত ওয়াশরুম ও বিশ্রামের কোনো ব্যবস্থাই এখানে নেই।’
নিকলী বেড়িবাঁধ এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টিকের বোতল, খাবারের প্যাকেটসহ যত্রতত্র বর্জ্য ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। পর্যাপ্ত ডাস্টবিন না থাকায় পরিবেশের সৌন্দর্য নষ্ট হচ্ছে। এ ছাড়া বিগত বছরগুলোতে হাওরের বিভিন্ন স্থানে নিরাপত্তা ও সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড থাকলেও এখন সেগুলোর বেশির ভাগই উধাও। লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার, গভীর পানিতে না নামা কিংবা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা সম্পর্কে কোনো নির্দেশনাও আর চোখে পড়ে না। ছুটির দিনেও পর্যটন এলাকায় কোনো পুলিশি টহল চোখে পড়েনি বলে জানান স্থানীয় বাসিন্দা আরিফুল ইসলাম।
২০০০ সালের দিকে নিকলী সদরকে বর্ষার ঢেউ ও ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হয়। একই সময়ে রোপণ করা হয় ছাতিরচর গ্রামের হাজারো করচগাছ। দৃষ্টিনন্দন বেড়িবাঁধ, ভাসমান করচবন ও দিগন্তজোড়া জলরাশি মিলিয়ে নিকলী হাওর দ্রুত দেশের অন্যতম জনপ্রিয় পর্যটন গন্তব্যে পরিণত হয়, যা স্থানীয় অর্থনীতিতেও বড় ভূমিকা রেখে আসছিল।
নিকলী থানার ওসি মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ প্রশাসন সর্বদা তৎপর। নির্দিষ্ট পয়েন্টগুলোতে নজরদারি আরও বাড়ানো হবে।’
নিকলী উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শহীদউল্লাহ বলেন, ‘পর্যটকদের নিরাপদ ও নির্বিঘœ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে প্রশাসন কাজ করছে। যেকোনো ধরনের অনিয়ম বা সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ তবে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, শুধু কাগজে-কলমে আশ্বাসের বাইরে গিয়ে ট্রলার ভাড়া নির্ধারণ, নিয়মিত বাজার তদারকি, পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়নের মতো কার্যকর উদ্যোগ দ্রুত বাস্তবায়ন করা গেলেই নিকলী হাওর ফিরে পেতে পারে তার হারানো প্রাণচাঞ্চল্য।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন