বিশ্ববিদ্যালয়ের গ-ি পেরোনো মানেই কি একটি সোনালি ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা? আমাদের প্রথাগতভাবে সমাজে জিপিএ বা সিজিপিএ-র গৌরবকেই সফলতার একমাত্র মাপকাঠি ভাবা হতো। কিন্তু সমসাময়িক শ্রমবাজারের রূঢ় বাস্তবতা আজ আমাদের এক ভিন্ন আয়নার সামনে দাঁড় করিয়েছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর লেবার ফোর্স সার্ভে ২০২৪-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বলছে, দেশের ২৬.২ লাখ বেকারের মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজার জনই উচ্চশিক্ষিত স্নাতক! অর্থাৎ, শিক্ষিতদের মধ্যে বেকারত্বের হার প্রায় ১৩.৫ শতাংশ, যা জাতীয় গড়ের চেয়ে প্রায় তিনগুণ বেশি। এই আশঙ্কাজনক চিত্রটি স্পষ্ট করে দেয়Ñ শুধু পরীক্ষার খাতার ভালো নম্বর বা একটি কাগজের সনদ দিয়ে আর করপোরেট যুদ্ধের বৈশ্বিক বৈতরণী পার হওয়া সম্ভব নয়। আজকের দিনে ডিগ্রি যদি হয় কেবল প্রবেশপত্র, তবে ক্যারিয়ারের আসল চাবিকাঠি হলো ব্যক্তিগত উন্নয়ন ও বহুমুখী দক্ষতা।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন গবেষণা বলছে, একজন কর্মীর দীর্ঘমেয়াদি পেশাদার সাফল্যের ৮৫ শতাংশই নির্ভর করে তার সফট স্কিলস বা আচরণগত দক্ষতার ওপর; যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ভূমিকা মাত্র ১৫ শতাংশ। চমৎকার একাডেমিক রেকর্ড থাকা সত্ত্বেও অনেক মেধাবী তরুণ শুধু ইন্টারভিউ বোর্ডে নিজের চিন্তা গুছিয়ে প্রকাশ করতে না পেরে ছিটকে পড়েন। করপোরেট দুনিয়ায় কার্যকর যোগাযোগ দক্ষতা, দলগতভাবে কাজ করার মানসিকতা, সংকটকালীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং মানসিক সহনশীলতা অত্যন্ত জরুরি। আর এই দক্ষতাগুলো মুখস্থ করার বিষয় নয়, এগুলো চর্চার বিষয়। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের প্রথম দিন থেকেই তাই শুধু লাইব্রেরির চার দেয়ালে বন্দি না থেকে ডিবেটিং ক্লাব, বিজনেস ক্লাব বা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া উচিত। এই সহ-শিক্ষা কার্যক্রমগুলোই একজন শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের নেটওয়ার্কিং এবং সমস্যা সমাধানের প্রাথমিক পাঠ দেয়।
একবিংশ শতাব্দীর দ্রুত পরিবর্তনশীল কর্মক্ষেত্রে সফট স্কিলসের পাশাপাশি প্রয়োজন যুৎসই টেকনিক্যাল বা কারিগরি জ্ঞান। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তির যুগে ডেটা এনালাইসিস, অ্যাডভান্সড এক্সেল, কনটেন্ট রাইটিং, গ্রাফিক ডিজাইন কিংবা বেসিক প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজের মতো স্কিলগুলো কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের শিক্ষার্থীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন সবার জন্য বাধ্যতামূলক। গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব স্নাতক পড়ালেখার পাশাপাশি প্রফেশনাল ইন্টার্নশিপ ও টেকনিক্যাল দক্ষতায় এগিয়ে থাকেন, কর্মসংস্থানের বাজারে তাদের জয়জয়কার সবার আগে। ইন্টারনেটের কল্যাণে এখন ঘরে বসেই বিশ্বের নামি গ্লোবাল লার্নিং প্ল্যাটফর্ম থেকে এই দক্ষতাগুলো অনায়াসেই লুফে নেওয়া সম্ভব, যা তাত্ত্বিক শিক্ষার সঙ্গে বাস্তব প্রয়োগের মধ্যকার দীর্ঘদিনের দূরত্বটি ঘুচিয়ে দেয়।
ডিগ্রি অর্জনের পরপরই আমাদের তরুণদের ওপর এক ধরনের সামাজিক ও পারিবারিক মনস্তাত্ত্বিক চাপ তৈরি হয়Ñ যেমন করেই হোক একটা চাকরিতে ঢুকতে হবে। কিন্তু ক্যারিয়ারের এই সন্ধিক্ষণে এসে তাড়াহুড়ো করা হতে পারে চরম আত্মঘাতী। কলাম্বিয়া ইউনিভার্সিটির একটি সমীক্ষায় উঠে এসেছে যে, একজন স্নাতকের প্রথম চাকরির পারিপার্শ্বিক বৈশিষ্ট্য এবং মানদ- পরবর্তী পাঁচ বছরে তার আয়ের ব্যবধানের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ নির্ধারণ করে দেয়। অর্থাৎ, প্রথম চাকরিটি কেবল মাসের শেষের একটা বেতন নয়, বরং এটি আপনার পুরো কর্মজীবনের গতিপথের কম্পাস। তাই প্রথম সুযোগেই ‘হ্যাঁ’ বলার আগে অত্যন্ত বিচক্ষণতার সঙ্গে সেই প্রতিষ্ঠানের কাজের পরিবেশ এবং সেখানে কাজ শেখার সুযোগ কেমন, তা খতিয়ে দেখা উচিত। ‘স্ট্রাডা’ ও ‘বার্নিং গ্লাস’-এর মতো বৈশ্বিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫২ শতাংশ স্নাতক পাস করার প্রথম বছরেই তাদের যোগ্যতার চেয়ে নিচের স্তরের চাকরিতে প্রবেশ করেন। আরও ভয়ের ব্যাপার হলো, এদের মধ্যে ৪৫ শতাংশ কর্মী এক দশক পরেও সেই একই বৃত্তে আটকে থাকেন।
একটি সুশৃঙ্খল ও পেশাদার পরিবেশ একজন নবাগত কর্মীকে সঠিক কর্মপদ্ধতি, সময়ানুবর্তিতা এবং করপোরেট এথিক্স বা নৈতিকতা শিক্ষা দেয়। শুরুতে যদি কেউ অপেশাদার সংস্কৃতির মুখোমুখি হয়, তবে সেই নেতিবাচক অভ্যাসগুলো অবচেতনভাবেই তার ক্যারিয়ারের পরবর্তী ধাপগুলোকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই ক্যারিয়ারের শুরুতে বেতনের অঙ্কের চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত হ্যান্ডস-অন এক্সপেরিয়েন্স বা বাস্তব কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগের ওপর। একটি দূরদর্শী প্রতিষ্ঠান আপনাকে কেবল নির্দেশ পালনের রোবট বানাবে না, বরং আপনাকে স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে ও সঠিক মেন্টরশিপের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত নিতে শেখাবে। তাই বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই নিজের লক্ষ্য স্থির করা উচিত। সুনির্দিষ্ট খাতের শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোর কাজের ধরন পর্যবেক্ষণ করা, প্রয়োজনে সময় নিয়ে ইন্টার্নশিপের মাধ্যমে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করা এবং একটি শেখার পরিবেশসম্পন্ন প্রথম চাকরি বেছে নেওয়াই হবে ভবিষ্যতে একটি টেকসই এবং সফল ক্যারিয়ারের সুদৃঢ় ভিত্তি।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন