বিদেশে উচ্চ বেতনের চাকরির স্বপ্ন দেখিয়ে তরুণদের যুদ্ধক্ষেত্রে ঠেলে দেওয়ার যে ভয়াবহ চিত্র সামনে এসেছে, তা শুধু একটি প্রতারণার ঘটনা নয়, এটি মানবপাচার, জোরপূর্বক যুদ্ধে সম্পৃক্তকরণ এবং মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত এক জঘন্য অপরাধ। কর্মসংস্থানের আশায় দেশ ছেড়ে যাওয়া বাংলাদেশি তরুণদের কেউ প্রাণ হারিয়েছেন, কেউ পঙ্গুত্ববরণ করেছেন, কেউ এখনো রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের ভয়াল রণাঙ্গনে আটকে আছেন। তাদের আর্তনাদ আমাদের রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা এবং বিদেশগামী কর্মীদের সুরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতাকেই সামনে এনে দিয়েছে।
উদ্বেগের কারণ হলো, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং একটি সুসংগঠিত অপরাধচক্র দীর্ঘদিন ধরে চাকরির প্রলোভনকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে আসছে। রূপালী বাংলাদেশের অনুসন্ধানে একাধিক রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠান, ট্রাভেল এজেন্সি এবং দালাল নেটওয়ার্কের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, বৈধ ভিসা প্রসেসিংয়ের আড়ালে কর্মীদের এমন একটি ফাঁদে ফেলা হয়েছে, যেখান থেকে ফিরে আসার পথ প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। বিদেশে পৌঁছানোর পর তাদের পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণে নেওয়া, জোরপূর্বক নতুন চুক্তিতে স্বাক্ষর করানো, সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠিয়ে দেওয়া, এসব কোনো সাধারণ প্রতারণা নয়, আন্তর্জাতিক মানবপাচার ও জোরপূর্বক সামরিক কাজে নিয়োজিত করার গুরুতর অপরাধ।
সরকার ইতোমধ্যে কয়েকটি রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করেছে এবং বিপদগ্রস্ত বাংলাদেশিদের ফিরিয়ে আনার জন্য কূটনৈতিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানিয়েছে। এটি অবশ্যই ইতিবাচক পদক্ষেপ।
শুধু রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স বাতিল করলেই হবে না। একই সঙ্গে সরকারের সবচেয়ে জরুরি দায়িত্ব হলো, যুদ্ধাঞ্চলে আটকে থাকা বাংলাদেশিদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা। কূটনৈতিক তৎপরতা আরও জোরদার করতে হবে। রাশিয়া, সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং প্রয়োজন হলে তৃতীয় কোনো দেশের সহায়তায় আটকে পড়া নাগরিকদের দ্রুত উদ্ধার করে দেশে ফিরিয়ে আনতে হবে। যারা আহত হয়েছেন বা শারীরিক ও মানসিক ট্রমার শিকার হয়েছেন, তাদের পুনর্বাসন, চিকিৎসা ও আর্থিক সহায়তার ব্যবস্থাও রাষ্ট্রের দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলোÑ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দুর্বল তদারকি। বিদেশগামী কর্মীদের ক্ষেত্রে বিএমইটি, প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত নজরদারি আরও শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি রিক্রুটিং এজেন্সির কার্যক্রম নিয়মিত অডিট করতে হবে, বিদেশি নিয়োগকর্তার পরিচয় ও চাকরির সত্যতা বাধ্যতামূলকভাবে যাচাই করতে হবে এবং সন্দেহজনক নিয়োগ কার্যক্রম দ্রুত বন্ধ করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা দালালদের মাধ্যমে পরিচালিত ভুয়া চাকরির বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক অভিযান প্রয়োজন।
সাধারণ মানুষের সচেতনতা বৃদ্ধিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিদেশে যাওয়ার আগে বৈধ চ্যানেল, চাকরির প্রকৃতি, চুক্তির শর্ত এবং নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সত্যতা যাচাই সম্পর্কে জনগণকে ব্যাপকভাবে সচেতন করতে হবে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত প্রচার চালিয়ে মানুষকে বোঝাতে হবে, অস্বাভাবিক উচ্চ বেতনের লোভনীয় প্রস্তাব অনেক সময় ভয়ংকর প্রতারণার ফাঁদ হতে পারে।
আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থান লাখো পরিবারের জীবিকার প্রধান অবলম্বন। কিছু অসাধু দালাল, ট্রাভেল এজেন্সি ও রিক্রুটিং প্রতিষ্ঠানের অপরাধের কারণে এই গুরুত্বপূর্ণ খাতের সুনাম ক্ষুণœ হতে দেওয়া যায় না। যারা তরুণদের স্বপ্নকে পুঁজি করে যুদ্ধের বাজারে বিক্রি করেছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোরতম আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
আমরা আশা করব, সরকার যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশিকে নিরাপদে ফিরিয়ে আনার সর্বোচ্চ উদ্যোগ নেবে, সেই সঙ্গে ভবিষ্যতে যেন আর কোনো বাংলাদেশি চাকরির আশায় দেশ ছেড়ে যুদ্ধক্ষেত্রে মৃত্যুর মুখে ঠেলে না দেওয়া হয়, সে জন্য এখনই কার্যকর, সমন্বিত ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন