বিশ্বকাপের সেমিফাইনালে গতকাল রাতে মুখোমুখি হয় আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড। ফুটবল দুনিয়ায় এ দুই পরাশক্তির লড়াই মানেই মাঠের ফুটবল ছাপিয়ে ফিরে আসে ফকল্যান্ড যুদ্ধের সেই ঐতিহাসিক আবেগ আর ইতিহাসের দায় শোধের অধ্যায়, যেখানে সমান্তরাল এক অদৃশ্য ছায়া হয়ে জড়িয়ে আছেন কিংবদন্তি দিয়েগো ম্যারাডোনা। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে থ্রি লায়ন্সদের বিপক্ষে সেই মহাকাব্যিক লড়াইয়ের পর থেকে এই দ্বৈরথ আর ম্যারাডোনার নাম যেন সমার্থক হয়ে গেছে। গতকাল আটলান্টার মার্সিডিজ-বেঞ্জ স্টেডিয়ামে যখন আলবিসেলেস্তেরা মাঠে নেমেছে, গ্যালারির নীল-সাদা পতাকার ভাঁজে আর প্রত্যেক ভক্তের হৃৎস্পন্দনে তখন অবধারিতভাবেই জীবন্ত ছিলেন এই ‘ফুটবল ঈশ্বর’। তবে ইংল্যান্ড ম্যাচের এই তীব্র উত্তেজনার মাঝে বিশ্বজুড়ে আবারও আলোচনায় উঠে এসেছে মাঠের বাইরে ম্যারাডোনার অন্য এক রূপÑ অত্যাচার ও সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে তার আপসহীন এবং সোচ্চার কণ্ঠস্বর।
ফুটবল ছাড়ার পর কিংবা বছর পাঁচেক আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার পরও ম্যারাডোনা কেবল একজন ফুটবলার হিসেবে নন, বিশ্বজুড়ে প্রগতিশীল ও শোষিত মানুষের পক্ষে এক নির্ভীক প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে সমাদৃত। ভেনেজুয়েলার হুগো শ্যাভেজ, কিউবার ফিদেল কাস্ত্রো কিংবা বলিভিয়ার ইভো মোরালেসের মতো কিংবদন্তি নেতাদের বন্ধু ম্যারাডোনা নিপীড়িত মানুষের পক্ষে দাঁড়াতে কখনো দ্বিধা করেননি। আর তাই ২০২০ সালের ২৫ নভেম্বর যখন তার প্রয়াণে গোটা বিশ্ব শোকে স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, তখন তীব্র শোকের ছায়া নেমে এসেছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত ফিলিস্তিনের বুকেও। বছরের পর বছর ধরে দখলদার ইসরায়েলি বাহিনীর বর্বরতার শিকার হওয়া ফিলিস্তিনিদের অধিকার আদায়ে বরাবরই রাজপথে ও গণমাধ্যমে সরব ছিলেন এই আর্জেন্টাইন মহানায়ক, যার কারণে তার মৃত্যুর পর স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাসের পক্ষ থেকেও গভীর শ্রদ্ধা ও শোকবার্তা জানানো হয়েছিল।
ফিলিস্তিনের প্রতি ম্যারাডোনার এই ভালোবাসা কোনো লুকোছাপার বিষয় ছিল না, বরং তিনি বুক ফুলিয়ে নিজেকে ফিলিস্তিনের কণ্ঠস্বর হিসেবে পরিচয় দিতেন। ২০১২ সালে তিনি অকপটে ঘোষণা করেছিলেন, ‘আমি ফিলিস্তিনি জনগণের সবচেয়ে বড় ভক্ত। কোনো ভয় ছাড়াই আমি প্যালেস্টাইনকে সমর্থন করি।’ এরপর ২০১৪ সালে গাজায় ইসরায়েলের চালানো নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে তিনি একে ‘লজ্জাজনক’ বলে আখ্যা দেন। ফিলিস্তিনের ফুটবলের উন্নয়নেও তিনি যুক্ত হতে চেয়েছিলেন, যা নিয়ে ২০১৫ সালে এএফসি এশিয়ান কাপের আগে ফিলিস্তিনি জাতীয় দলের কোচিং করানোর বিষয়ে আলোচনাও চলেছিল।
ফিলিস্তিনিদের প্রতি তার এই নিঃশর্ত সমর্থনের সবচেয়ে আবেগঘন মুহূর্তটি দেখা গিয়েছিল ২০১৮ সালের জুলাই মাসে, রাশিয়ার মস্কোতে। সেখানে ফিলিস্তিনের প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তাকে উষ্ণ আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরে ম্যারাডোনা বলেছিলেন, ‘আমার হৃদয়ে আমি একজন ফিলিস্তিনি।’ সেই ঐতিহাসিক মুহূর্তের ভিডিও তিনি নিজেই তার সোশ্যাল মিডিয়ায় শেয়ার করেছিলেন। কেবল ফিলিস্তিনই নয়, সিরিয়ার নিপীড়িত মানুষ কিংবা জর্জ বুশের সাম্রাজ্যবাদী নীতির বিরুদ্ধেও আমৃত্যু সোচ্চার ছিলেন এই জাদুকর। আজ যখন আর্জেন্টিনা মাঠে আরেকটি ঐতিহাসিক লড়াইয়ের মুখোমুখি, তখন মাঠের ফুটবলশৈলীর পাশাপাশি শোষিত মানুষের পক্ষে ম্যারাডোনার সেই বজ্রকণ্ঠ বিশ্বজুড়ে কোটি ভক্তের হৃদয়ে আরও একবার নতুন করে বেজে উঠেছে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন