টানা ভারি বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলের পানিতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে চট্টগ্রামের চন্দনাইশ উপজেলা। উপজেলার আটটি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ায় জনজীবনে নেমে এসেছে চরম দুর্ভোগ। বন্যায় কৃষি, মৎস্য ও যোগাযোগ অবকাঠামো খাতে শত কোটি টাকার ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
বন্যার পানিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার রাস্তাঘাট ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক সড়ক ভেঙে যাওয়ায় স্থানীয়দের চলাচলে দুর্ভোগ চরমে উঠেছে। কোথাও কোথাও ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক ও কালভার্ট এখন মানুষের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
উপজেলার স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) প্রকৌশলী তন্ময় নাথ জানান, বন্যার পানির তোড়ে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ৩২টি সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলোর মোট দৈর্ঘ্য প্রায় ২ হাজার ৩০০ মিটার। এছাড়া সাতটি ব্রিজ ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় অনেক এলাকার যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। প্রাথমিক হিসাবে অবকাঠামো খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩৫ কোটি টাকা।
অন্যদিকে, মৎস্য খাতেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা তানভীর হাসান জানান, বন্যায় ১ হাজার ৬৩০টি পুকুর এবং ৩৪০ হেক্টর এলাকার মাছের পোনা ও মৎস্য অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ২২ কোটি ৪৭ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে।
কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতিও ব্যাপক। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোহাম্মদ আজাদ হোসেন জানান, বন্যায় ২ হাজার ২০০ হেক্টর আউশ ধান, ৯০০ হেক্টর সবজি এবং ২০০ হেক্টর অন্যান্য ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে কৃষি খাতে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৬০ থেকে ৬৫ কোটি টাকা হতে পারে।
শঙ্খ নদতীরবর্তী চরাঞ্চল ও বিভিন্ন লোকালয়ের ফসলের মাঠে এখন শুধুই ক্ষতির চিত্র। বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর শত শত একর সবজিখেত ও আমন ধানের জমিতে পুরু পলির স্তর জমে গেছে। পলি ও বালুর নিচে চাপা পড়ে গাছপালা পচে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
কৃষকেরা জানান, বন্যার প্রবল স্রোতে ভেসে আসা পলি ও বালু তাদের দীর্ঘদিনের পরিশ্রমের ফসল নষ্ট করে দিয়েছে। চন্দনাইশের সবজি উৎপাদনকারী এলাকার কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
কৃষক রেজাউল করিম জানান, দীর্ঘদিনের পরিচর্যায় গড়ে তোলা তার পেঁপের বাগানটি বন্যার পানিতে সম্পূর্ণ তলিয়ে গেছে। পানি নেমে যাওয়ার পর বাগানের গাছগুলো পচে নষ্ট হয়ে গেছে।
কৃষক মীর কাসেম বলেন, তিনি বাণিজ্যিকভাবে বরবটি, শসা ও লাউ চাষ করেছিলেন। বন্যার পলি জমে পুরো খেত নষ্ট হয়ে গেছে। একইভাবে কৃষক জাহানা তার শসা, তিতা করলা ও শসিন্দার খেত হারিয়েছেন। মেহেরুন্নিসার ঝিঙে, ঢ্যাঁড়শ, মিষ্টি কুমড়ার খেতও বন্যার পানিতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মৎস্যচাষিরা পড়েছেন বড় ক্ষতির মুখে। আবু সৈয়দ, মামুনসহ স্থানীয় মৎস্যচাষিরা জানান, বন্যার পানিতে পুকুরের পাড় ভেঙে মাছ ভেসে গেছে। এতে তাদের বহু বছরের বিনিয়োগ এক মুহূর্তে নষ্ট হয়ে গেছে।
চন্দনাইশ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ আব্দুর রহমান বলেন, উপজেলার বন্যাকবলিত এলাকাগুলোতে ক্ষয়ক্ষতির সঠিক হিসাব নিরূপণের কাজ চলছে। পানি পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত চিত্র পাওয়া যাবে। তিনি জানান, প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় ৩০ থেকে ৩৫টি মাটির ঘর সম্পূর্ণ ধ্বংস বা বসবাসের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা তৈরির কাজ চলছে। তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর পুনর্বাসনের জন্য সরকারি সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তারা মাঠ পর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ ও পরিস্থিতি মোকাবিলায় কাজ করছেন।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন