এক বছর আগে উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজে প্রশিক্ষণ যুদ্ধবিমান বিধ্বস্তে বিমানের কোনো ত্রুটি না পাওয়া গেলেও মনুষ্যসৃষ্ট কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পাইলটের ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ঘাটতি, প্রশিক্ষণে কমান্ডিং তত্ত্বাবধায়নের অভাব এবং ভবন নির্মাণে ত্রুটি থাকার বিষয়টি ফোকাস পয়েন্ট হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রতিবেদনটি সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে জমা দেওয়া হলেও সেটি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হয়নি। যদিও প্রতিবেদনটি প্রকাশের বিষয়ে উচ্চ আদালতের একটি নিদের্শনা ছিল। এদিকে শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর অশ্রুসিক্ত নয়নে স্মরণ করা হলো ভয়াবহ সেই ট্র্যাজেডির এক বছর।
গতকাল মঙ্গলবার দিবসটি পালন উপলক্ষে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি আয়োজিত ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্মরণসভা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান।
২০২৫ সালের ২১ জুলাই বিমানবাহিনীর একটি ‘এফ-৭ বিজিআই’ যুদ্ধবিমান মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের ‘হায়দার আলী’ ভবনে বিধ্বস্ত হয়। তাতে পাইলটসহ ৩৬ জন নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ২৮ জন শিক্ষার্থী, তিনজন শিক্ষক, তিনজন অভিভাবক এবং একজন স্কুলকর্মী ছিলেন। এ ঘটনার পর পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। সংশ্লিষ্ট দপ্তরে তদন্ত কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে গত বছরই।
সূত্র জানায়, গত বছর ৪ নভেম্বর তখনকার অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে ওই প্রতিবেদন জমা দেয় তদন্ত কমিশন। সেখানে বলা হয়েছে, ‘সামগ্রিক পর্যালোচনায় এই বিমান বিধ্বস্তের দুর্ঘটনাটির মূল কারণ হিসেবে উল্লেখ করা যায় মনুষ্য-ত্রুটি, যা পরিবেশগত প্রভাবক দ্বারা ত্বরান্বিত হয়েছে।’
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, উড়োজাহাজটি হঠাৎ নির্ধারিত মাত্রার চেয়ে বেশি কাত হয়ে নিশ্চল (স্টল) অবস্থার তৈরি হয় এবং সেটি মাইলস্টোনের ওই স্কুল ভবনের সিঁড়ির সামনে আছড়ে পড়ে। এরপর উড়োজাহাজের জ্বালানি ট্যাংক চুরমার হয়ে অবশিষ্ট প্রায় ২১শ লিটার জ্বালানি তেল প্রচ- তাপে বিস্ফোরণ ঘটায় এবং জ্বলতে থাকে। ১৯টি শ্রেণিকক্ষের ওই ভবনে ৭৩৭ জন শিক্ষার্থী ও অর্ধশতাধিক শিক্ষকের জন্য মাত্র একটি সিঁড়ি থাকায় ভেতরে আটকা পড়া শিশু ও শিক্ষকরা সে সময় বের হতে পারেননি। ২০০৬ সালে নির্মিত তিনতলা ভবনটির নিচতলা মাটি ভরাটের কারণে মাটির নিচে চলে গিয়েছিল, বাকি দুটি তলায় ক্লাস চলছিল। স্কুল কর্তৃপক্ষ এই ভবন নির্মাণের কোনো অনুমোদনও দেখাতে পারেনি।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে দুর্ঘটনার দিন আবহাওয়া ভালো ছিল। পাইলট ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট তৌকির ইসলাম উড্ডয়নের জন্য ‘ফিট’ ছিলেন। এফটি-৭ বিজিআই মডেলের ফাইটার এয়ারক্রাফটিতেও কোনো সমস্যা ছিল না। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী উড়োজাহাজের ওভারহোলিংসহ অন্যান্য রক্ষণাবেক্ষণ কাজ করা হয়েছিল। সেই উড়োজাহাজ নিয়ে প্রশিক্ষণ মিশন ফ্লাইট সম্পন্ন করতে উড়াল দিয়েছিলেন পাইলট তৌকির। প্রত্যেকটি উড়োজাহাজে পাইলটের সঙ্গে কন্ট্রোল টাওয়ারের যোগাযোগ রেকর্ড করা হয়। পাশাপাশি উড়োজাহাজগুলোতে থাকে ফ্লাইট ডেটা রেকর্ডার বা এফডিআর। উড়োজাহাজের গতি বাড়ানো-কমানো, ডান-বাম বা ওপর-নিচ করাসহ উড়োজাহাজটি নিয়ন্ত্রণের জন্য পাইলট জয়স্টিকসহ প্যানেলে যা কিছুই নড়াচড়া করেন না কেন, সব কিছুরই রেকর্ড থাকে এই এফডিআরে। ওই দুর্ঘটনার পর উড়োজাহাজটির এফডিআর চীনে নির্মাতা কোম্পানির কাছে পাঠিয়ে এর তথ্য উদ্ঘাটন করা হয়।
এয়ার ট্রাফিক কন্ট্রোলের কথোপকথন ও বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তদন্ত কমিশন বলেছে, কমান্ডিং অফিসার মোবাইল ভ্যান থেকে পাইলটকে পুনরায় ইনিশিয়াল-এ আসার নির্দেশনা দেন, যা প্রথম সলো ফ্লাইটের মিশন প্রোফাইলের সঙ্গে ‘সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়’। বিমান বাহিনীর অভ্যন্তরীণ তদন্ত প্রতিবেদনের বরাতে সরকারের তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মাইলস্টোন স্কুলের সিসি ক্যামেরার ভিডিও থেকে বিমানটি বিধ্বস্ত হওয়ার আগে বিমানের উইন্ডশিল্ডে একটি ‘কালো দাগ’ দেখা যায়। এই কালো দাগ পাখি বা উড্ডীয়মান কোনো বস্তুর আঘাতে হতে পারে। এই আঘাত পরিহার করার জন্যই হয়তো পাইলট তৎক্ষণাৎ কন্ট্রোল স্টিকটি টেনে বিমানের গতিপথ পরিবর্তন করার চেষ্টা করেন। যার ফলে হঠাৎ ব্যাংকিং অ্যাঙ্গেল অস্বাভাবিক বৃদ্ধির ঘটনাটি ঘটে থাকতে পারে।
শোককে শক্তিতে পরিণত করে এগিয়ে যেতে হবেÑ ডা. জুবাইদা রহমান : এদিকে মাইলস্টোন ট্র্যাজেডিতে নিহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও কর্মচারীদের গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছেন জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান। তিনি বলেছেন, ভয়াবহ এই দুর্ঘটনা পুরো জাতিকে শোকাহত করেছে। তবে শোককে শক্তিতে পরিণত করে সামনে এগিয়ে যেতে হবে এবং আহতদের সাহস ও দৃঢ়তা থেকে নতুন প্রজন্মকে শিক্ষা নিতে হবে। গতকাল ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি আয়োজিত ‘মাইলস্টোন ট্র্যাজেডি শ্রদ্ধাঞ্জলি ও স্মরণসভা’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘আজ (গতকাল) এমন একটি দিন, যেদিন পুরো দেশ ও জাতি গভীরভাবে শোকাহত। এই আকস্মিক ও ভয়াবহ দুর্ঘটনা আমাদের সবাইকে হতবাক করে দিয়েছে। যারা প্রাণ হারিয়েছেন, তাদের পরিবারের প্রতি সমগ্র জাতি সমবেদনা জানাচ্ছে। আমি ক্ষতিগ্রস্ত সব পরিবারের প্রতি গভীর শোক ও আন্তরিক সমবেদনা জানাই।’
আহত শিক্ষার্থী, শিক্ষক ও অভিভাবকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘এই ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পরও আপনারা যেভাবে সাহস ও সংকল্প নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন, তা জাতি কোনোদিন ভুলবে না। শোকের মধ্যেও আপনারা যে দৃঢ়তা দেখিয়েছেন, তা সত্যিই অনুপ্রেরণাদায়ক।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই অভিজ্ঞতা আপনাদের জীবনের যেকোনো সংকট মোকাবিলায় সাহস জোগাবে। অন্যের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর শক্তি দেবে। আপনাদের মানবিকতা, সহমর্মিতা ও আত্মবিশ্বাস জাতির কাছে অনুসরণীয় হয়ে থাকবে।’
ডা. জুবাইদা রহমান বলেন, ‘সংকটের সেই মুহূর্তে বহু মানুষ নিজের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অন্যের পাশে দাঁড়িয়েছেন। মানবতার এমন দৃষ্টান্ত ইতিহাসে বিরল।’
ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর উদ্দেশে তিনি বলেন, ‘আপনারা একা নন। দেশের মানুষ আপনাদের দুঃখ ভাগ করে নিয়েছে এবং ভবিষ্যতেও পাশে থাকবে।’
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘মাইলস্টোন স্কুলে ঘটে যাওয়া সেই মর্মান্তিক দুর্ঘটনাটি আমাদের ইতিহাসের অন্যতম একটি কালো অধ্যায়। সেদিন নিজের জীবনের পরোয়া না করে শিক্ষিকা মাহেরিন চৌধুরী যেভাবে আগুনে পোড়া বাচ্চাদের উদ্ধার করতে গিয়ে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, আমি তার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন