শ্রাবণের মেঘ, কাদামাখা মাঠ আর সজীব প্রকৃতি যেন বাংলার কৃষিকে নতুন প্রাণ দেয়। এই সময় মাঠজুড়ে যেমন আমনের চারা সবুজের কারুকাজ আঁকে, তেমনি দেশের উত্তরাঞ্চলের কৃষকদের জন্য শুরু হয় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ মৌসুম তুলা চাষের প্রস্তুতি। বিশেষ করে রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলে আগাম শীত নেমে আসে বলে শ্রাবণ মাসের মধ্যেই তুলার বীজ বপন শেষ করা অত্যন্ত জরুরি।
সময়মতো বপন করা তুলার খেতই কয়েক মাস পরে সাদা তুলোর শুভ্রতায় ভরে ওঠে। আর সেই তুলা শুধু কৃষকের আয়ের উৎস নয়, দেশের বস্ত্রশিল্পেরও অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের আবহাওয়া দেশের অন্যান্য অঞ্চলের তুলনায় ভিন্ন। রংপুর, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়ে শীতের আগমন ঘটে বেশ আগে। ফলে দেরিতে বপন করা তুলা গাছ পর্যাপ্ত উষ্ণতা ও বৃদ্ধির সময় পায় না। তুলা গাছের ফুল ফোটা, বল (ক্যাপসুল) তৈরি এবং আঁশ পরিপক্ব হওয়ার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে উষ্ণ ও রৌদ্রোজ্জ্বল পরিবেশ দরকার। যদি বীজ বপনে দেরি হয়, তবে শীত শুরু হওয়ার আগেই গাছের বৃদ্ধি থেমে যেতে পারে। এতে ফলন কমে যায়, আঁশের দৈর্ঘ্য ও মান ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং কৃষক অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েন। তাই কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তরাঞ্চলে শ্রাবণ মাসের মধ্যেই তুলার বীজ বপন সম্পন্ন করা সবচেয়ে নিরাপদ ও লাভজনক সিদ্ধান্ত। শ্রাবণের নিয়মিত বৃষ্টিপাত মাটিতে পর্যাপ্ত আর্দ্রতা সৃষ্টি করে, যা বীজের দ্রুত অঙ্কুরোদ্গমে সহায়তা করে। এই সময় অতিরিক্ত সেচের প্রয়োজনও তুলনামূলক কম হয়। তবে তুলা এমন একটি ফসল, যা জলাবদ্ধতা একেবারেই সহ্য করতে পারে না। তাই জমিতে বৃষ্টির পানি জমে থাকলে শিকড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। এজন্য উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি নির্বাচন এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
ভালো ফলনের জন্য জমি আগেই প্রস্তুত করতে হবে। জমি তিন থেকে চারবার চাষ দিয়ে ঝুরঝুরে করতে হবে এবং মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। যেখানে পানি জমার আশঙ্কা রয়েছে, সেখানে নালা তৈরি করে পানি বের হওয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে।
জমিতে জৈবসার ব্যবহার করলে মাটির উর্বরতা বৃদ্ধি পায় এবং গাছের শিকড় শক্তিশালী হয়। পাশাপাশি কৃষি বিভাগের সুপারিশ অনুযায়ী ইউরিয়া, টিএসপি, এমওপি ও অন্যান্য সুষম সার প্রয়োগ করলে গাছের বৃদ্ধি ভালো হয়।
উচ্চ ফলনের জন্য অবশ্যই মানসম্মত ও রোগমুক্ত বীজ ব্যবহার করতে হবে। বাংলাদেশ তুলা উন্নয়ন বোর্ডের অনুমোদিত উন্নত জাতের বীজ ব্যবহার করলে ফলন যেমন বাড়ে, তেমনি রোগবালাইয়ের ঝুঁকিও কম থাকে।
বীজ বপনের আগে ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করলে অঙ্কুরোদ্গম ভালো হয় এবং প্রাথমিক রোগের আক্রমণ অনেকটাই কমে যায়। বীজ বপনের পর নিয়মিত জমি পর্যবেক্ষণ করতে হবে। আগাছা পরিষ্কার রাখতে হবে, কারণ আগাছা গাছের খাদ্য ও পুষ্টি কেড়ে নেয়। অতিবৃষ্টির পরে জমিতে পানি জমে থাকলে দ্রুত নিষ্কাশন করতে হবে। তুলা গাছে জ্যাসিড, থ্রিপস, এফিড বা বলওয়ার্মসহ বিভিন্ন পোকামাকড় আক্রমণ করতে পারে। তাই নিয়মিত খেত পরিদর্শন করে প্রয়োজনে কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ অনুযায়ী সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা গ্রহণ করা উচিত।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ পোশাক রপ্তানিকারক দেশ হলেও শিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় তুলার বড় অংশ এখনও বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। ফলে দেশে তুলার উৎপাদন বাড়ানো শুধু কৃষকের আয় বৃদ্ধি নয়, জাতীয় অর্থনীতির জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। উত্তরাঞ্চলের জলবায়ু ও মাটির বৈশিষ্ট্য তুলা চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় সময়মতো চাষ করলে কৃষক ভালো লাভের পাশাপাশি দেশের তুলা উৎপাদনেও উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে পারেন। শ্রাবণের বৃষ্টি শুধু ধানের জমিতে প্রাণ সঞ্চার করে না, তুলার ক্ষেতেও ভবিষ্যতের সাদা স্বপ্ন বুনে দেয়। আজ যে কৃষক সময়মতো বীজ বপন করবেন, কয়েক মাস পর তার খেতই শুভ্র তুলোর হাসিতে ভরে উঠবে।
প্রকৃতির ক্যালেন্ডার কখনো অপেক্ষা করে না। তাই রংপুর ও দিনাজপুর অঞ্চলের কৃষকদের জন্য শ্রাবণ মাস মানেই তুলা চাষের সঠিক সময়। সময়মতো বপন, সঠিক পরিচর্যা এবং বিজ্ঞানভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে পারলে তুলার খেত হবে কৃষকের সমৃদ্ধির প্রতীক, আর শ্রাবণের বৃষ্টিই হয়ে উঠবে সেই সাফল্যের প্রথম আশীর্বাদ।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন