× UCB Sticker Card
সোমবার, ২৭ জুলাই, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ১০:৫১ পিএম

সরকারি হাসপাতালে দালালের পোয়াবারো

স্বপ্না চক্রবর্তী

প্রকাশিত: জুলাই ২৬, ২০২৬, ১০:৫১ পিএম

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

ছবি- রূপালী বাংলাদেশ গ্রাফিক্স

দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের অন্যতম বড় ভোগান্তির নাম এখন ‘দালাল চক্র’। হাসপাতালের মূল ফটক থেকে জরুরি বিভাগ, বহির্বিভাগ, এমনকি ওয়ার্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এই চক্র রোগীদের নানা প্রলোভন ও ভুল তথ্য দিয়ে বেসরকারি ক্লিনিক, হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যাচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে সরকারি হাসপাতালে প্রয়োজনীয় সেবা থাকা সত্ত্বেও রোগীদের বাইরে পরীক্ষা করাতে বাধ্য করা হচ্ছে। কোথাও বাইরের ডায়াগনস্টিক থেকেও লোক এনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাচ্ছে এসব দালাল।

এমনকি রক্ত কেনা-বেচার মতো সংবেদনশীল কাজও করছেন তারা। এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা ব্যয় যেমন বাড়ছে, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে সরকারি স্বাস্থ্যসেবার প্রতি মানুষের আস্থা। শুধু আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এসব দালাল আটক হলেও ছাড় পেয়ে যাচ্ছেন কয়েক দিনের মধ্যেই। এতে করে আবারও পূর্ণোদ্যমে করতে পারছেন দালালি। আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

বরিশাল শেরেবাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সম্প্রতি দালালি পেশায় নিয়োজিত তরুণ-তরুণীদের আটক করে বিভিন্ন মেয়াদের দণ্ড দেয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। তাদের বিরুদ্ধে রোগী ভাগিয়ে নেওয়াসহ হাসপাতালে বাইরের ডায়াগনস্টিক থেকে টেকনিশিয়ান এনে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করানোর অভিযোগ ছিল। শুধু তাই নয়, এদের মধ্যে মো. রুবেল জরুরি রোগীদের জন্য রক্ত জোগাড় করে দেওয়ার নাম করে রোগীদের কাছ থেকে অর্থ আদায়ও করতেন। আবার রক্তদাতাকেও প্রলোভন দেখাতো অর্থের। এতে দিনের পর দিন দালালদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকতে হচ্ছে সাধারণ রোগীদের।

শুধু বরিশালের ওই হাসপাতাল নয়, রাজধানীর ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, পঙ্গু হাসপাতাল, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালসহ দেশের এমন কোনো সরকারি হাসপাতাল নেই, যেখানে এসব দালালের দৌরাত্ম্য নেই। অনেক হাসপাতালে কর্তৃপক্ষ নিজেই অসহায় থাকে এসব দালালের কাছে। এসব দালাল নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বা সরকারের কোনো ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কারো কোনো হুঁশিয়ারিতেই কাজ হচ্ছে না। তাই সুপরিকল্পিতভাবে প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে নিয়মিত অভিযান পরিচালনার দাবি বিশেষজ্ঞদের।

রাজধানী ঢাকার দক্ষিণ-পূর্ব এলাকার বাসিন্দাদের রোগে-শোকে ভরসার নাম মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। ৫০০ শয্যার হাসপাতালটিতে পাওয়া যায় প্রায় সব ধরনের রোগের চিকিৎসাসেবা। করোনার সময় থেকেই হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবার ওপর মানুষের আস্থা বেড়ে যায়। পরবর্তীতে ডেঙ্গু রোগীদেরও ভরসার স্থল হয়ে ওঠে এটি। কিন্তু ভোর ৬টা থেকেই হাসপাতাল আঙিনা রোগীদের পাশাপাশি গিজগিজ করতে থাকে দালালরা। হাসপাতাল থেকে বেসরকারি কোনো ডায়াগনস্টিকে রোগী ভাগিয়ে নিতে তাদের তৎপরতা অনেক চেষ্টা করেও থামাতে পারেনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।

সরেজমিনে হাসপাতালটিতে দেখা যায়, জরুরি বিভাগে রক্ত দিতে এসেছেন এক যুবক। এক দালাল তাকে টাকার বিনিময়ে রক্ত দিতে নিয়ে এসেছেন জানিয়ে ওই যুবক বলেন, আমি একটি ফার্মেসিতে চাকরি করি। এখানে রক্ত দিতে এসেছি। ঠিক তখনই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের তাকে আটক করতে দেখা যায়।

শুধু এই যুবক নয়, সুমাইয়া আক্তার, আজাদ শেখ, আজিজুর মুন্সি, আবুল বাসার, আশিক আহম্মেদ, ইলিয়াস, ওহিদুজ্জামান, জীবন ইসলাম, তরিকুল ইসলাম, মোসা. ফারজানাসহ একাধিক দালালচক্র এখানে সক্রিয় থাকে ২৪ ঘণ্টা। এমন তথ্য জানিয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালের এক চিকিৎসক রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, সরকার আসে সরকার যায়। কিন্তু এসব দালালচক্র দমনে কেউই সফল হয় না। অভিযান হয় মাঝে মাঝে। তখন হম্বিতম্বি করে কয়েকজনকে আটক করা হয়। আবার কয়েক দিনের মাথায়ই তারা ছাড়া পেয়ে একই কাজে নিযুক্ত হয়ে পড়ে।

ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রিপন নামের এক দালাল বলেন, তিনি হাসপাতালে এসে রোগীদের সেবা পাইয়ে দিতে আয় করার পথ বেছে নিয়েছেন। তিনি বলেন, অনেক রোগী ঢাকার বাইরে থেকে আসেন, তারা হাসপাতালের কোন ভবনে কী, কোথায় কী করতে হবে। ভর্তির প্রক্রিয়া, ল্যাবে পরীক্ষার কাজ করতে পারেন না। অথবা চিকিৎসকের রুমেও বিড়ম্বনায় পড়েন। কিন্তু তিনি কাজটি স্বাভাবিকভাবে করে দিয়ে কিছু টাকা নেন। এর মাধ্যমে তার সংসার চলে। আর হাসপাতালের বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন তিনি। ফলে রোগীর চিকিৎসাসেবায় হয়রানি কম হয় বলে এই দালালের দাবি।

এ সময় এক রোগীর চিকিৎসাসেবার প্রক্রিয়ার খোঁজ করে দেখা যায়, তার ভর্তি ও পরীক্ষার দায়িত্ব নেন হাসপাতালের একজন কর্মচারী। বিনিময়ে তাকে দিতে হয় ৪০০ টাকা। ফলে এক্স-রে করাতে গিয়ে তাকে কোনো লাইনে দাঁড়াতে হয়নি। সিরিয়ালে ন্যূনতম ২০ জন রোগী থাকলেও এই রোগীকে নিয়ে দালাল সরাসরি এক্স-রেরুমে চলে যান। অবশ্য এ জন্য এক্স-রে রুমের সংশ্লিষ্টদের আরও ১০০ টাকা দিতে হয়। 
শুধু তাই নয়, হাসপাতালের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি নষ্ট থাকার সুযোগটি নিচ্ছে আশপাশের বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো। বিভিন্ন ক্লিনিকের দালালরা ঢামেক হাসপাতালে চিকিৎসারত রোগীদের টেস্টের স্যাম্পল সংগ্রহে এক ধরনের প্রতিযোগিতায় নেমেছে। শুধু ঢামেক হাসপাতালেই বিভিন্ন ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিকের দেড় শতাধিক দালাল সকাল-সন্ধ্যা অফিস ডিউটির মতোই উপস্থিত থাকে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এমনই একটি বেসরকারি হাসপাতালের প্রতিনিধি উজ্জ্বলের (ছদ্মনাম) কাছে রোগীপ্রতি কত টাকা কমিশন পান জানতে চাইলে তিনি বলেন, এই হিসাবটা একটু জটিল। যদি কোনো অপারেশনের রোগী হয় তাহলে মোট খরচের ১০ ভাগ পাই। আর যদি কোনো অপারেশন নয় বরং শুধু চিকিৎসা নেবে সে ক্ষেত্রে ৫ ভাগ টাকা দেয়।

এদিকে এসব বেসরকারি হাসপাতালের আবার বেশির ভাগেরই নেই অনুমোদন। হাসপাতালপাড়া বলে পরিচিত এক শ্যামলী এলাকায়ই সরকারি বেশ কিছু হাসপাতালের পাশাপাশি রয়েছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল। এসব হাসপাতালেই শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল, জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠান (পঙ্গু হাসপাতাল), জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটট ও হাসপাতালসহ অন্যান্য সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে রোগী বাগিয়ে আনে এই দালালরা, এমন অভিযোগ করে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক শহিদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের এক কর্মকর্তা রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এই এলাকায় রয়েছে ১০ থেকে ১৫টি সরকারি হাসপাতাল। এই হাসপাতালগুলোকে কেন্দ্র করে সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের সামনে থেকে শুরু করে শ্যামলী স্কয়ার পর্যন্ত আধাকিলোমিটার রাস্তায় গড়ে উঠেছে শতাধিক বেসরকারি হাসপাতাল। এসবের বেশির ভাগেরই নেই স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অনুমোদন। সরকারি হাসপাতালগুলো থেকে দালালের মাধ্যমে রোগী ভাগিয়ে এনে ফায়দা লাভ করাই এসব হাসপাতালের মূল কাজ।

সরেজমিনে দেখা যায়, বাবর রোড, খিলজি রোড, টিবি হাসপাতাল রোড ঘিরে এসব হাসপাতালের রমরমা ব্যবসা চলছে। আধা কিলোমিটার রাস্তায় বেবি কেয়ার হসপিটাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, ট্রমা সেন্টার অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, অ্যানালিসিস ফিজিওথেরাপি হাসপাতাল, আশিক মাল্টিস্পেশালাইজড, সিগমা মেডিকেল, মনমিতা মানসিক হাসপাতাল, শেফা হাসপাতাল, লাইফ কেয়ার নার্সিং হোম, এলিট ক্লিনিক অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, চেস্ট কেয়ার, শিশু নিরাময়, মক্কা মদিনা জেনারেল হাসপাতাল অ্যান্ড ডায়াগনস্টিক, প্লাজমা মেডিকেল সার্ভিস অ্যান্ড ক্লিনিক, আল মারকাজুল ইসলামী হাসপাতাল, নিউ ওয়েল কেয়ার হাসপাতাল, জয়ীতা মেডি ল্যাব, জনসেবা নার্সিং হোম, মুন ডায়াগনস্টিকসহ অসংখ্য বেসরকারি হাসপাতালকে কেন্দ্র করে শত শত রোগী আর দালালে গিজগিজ করে পুরো এলাকা। জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ঢাকা শিশু হাসপাতাল, জাতীয় কিডনি ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল, ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স, শহীদ সোহ্রাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল এবং জাতীয় বাতজ্বর ও হৃদরোগ নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রসহ এই এলাকায় সরকারি হাসপাতালগুলো ঘিরে দালালদের দৌরাত্ম্যের কথা স্বীকার করেছে খোদ স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, আমরা নিয়মিত এসব দালালের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করি। কিন্তু আইনের সীমাবদ্ধতার কারণে এবং আমাদের আলাদা জনবল না থাকার কারণে এটি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। তবে সম্প্রতি স্বাস্থ্যমন্ত্রী নিজেই অভিযান পরিচালনা করেছেন। যদি আইনে এসব দালালের বিরুদ্ধে কঠিন সাজার ব্যবস্থা থাকত, তাহলে এমনটি হতো না। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানোর কিছুদিন পরেই আবার তারা ছাড়া পেয়ে পুরোদমে দালালি শুরু করে দেয়। ফলে বারবার অভিযান পরিচালনা করেও লাভ কিছুই হয় না।

তবে আইনের সীমাবদ্ধতা দূর করে দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোকে দালালমুক্ত করতে বর্তমান সরকার কাজ করছে উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, এটি বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। তবে আমরা হাসপাতালগুলোতে দালালদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে সর্বোচ্চ তৎপর। সম্প্রতি ডিসি সম্মেলনে স্পষ্ট করে ডিসিদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে- ওষুধের দোকানে ভেজাল ওষুধ বিক্রি বন্ধ, হাসপাতালে অ্যাম্বুলেন্স নিয়ে দালালদের দৌরাত্ম্য বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে। আমি নিজে হাসপাতালে হাসপাতালে যাচ্ছি। পরিবর্তন আসবেই আশা করছি।

Link copied!