পৃথিবী উষ্ণ হচ্ছে। কিন্তু সেই উষ্ণতা এখন আর কেবল বিজ্ঞানীদের গবেষণাগারের বিষয় নয়; তা নেমে এসেছে মানুষের ঘরে, কর্মস্থলে, রাস্তায়, হাসপাতালে। দুপুরের রোদে কয়েক মিনিট দাঁড়ালেই মাথা ঝিমঝিম করা, অতিরিক্ত ঘাম, পানিশূন্যতা, শ্বাসকষ্ট কিংবা ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়া- এসব এখন নগরজীবনের পরিচিত অভিজ্ঞতা।
গত দুদিনে ঢাকার সর্বোচ্চ তাপমাত্রা ছিল ৩৪ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস। কখনো কখনো এর বেশি উঠছে। কাঠফাটা রোদে পুড়ছে রাজধানীসহ পুরো দেশ। মাঝে মাঝে বৃষ্টির দেখা মিললেও ভ্যাপসা গরমে নগরবাসীর নাভিশ্বাস দশা। দেশের তাপমাত্রা বৃদ্ধির পেছনে প্রাকৃতিক কারণের পাশাপাশি পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট কারণও সমানভাবে দায়ী বলে জানাচ্ছেন পরিবেশবিদরা। ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু চক্রের মতো প্রাকৃতিক উপাদানের পাশাপাশি অপরিকল্পিত নগরায়ণ, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ও বৃক্ষনিধন উষ্ণতা তীব্র করার পেছনে অগ্রণী ভূমিকা রাখছে।
প্রাকৃতিক কারণসমূহ উল্লেখ করে ভৌগোলিক অবস্থান সূত্র ধরে আবহাওয়াবিদ আবু নাসের আল আজাদ রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, গ্রীষ্মকালে বাংলাদেশের ওপর সূর্যের খাড়াভাবে কিরণ দেওয়া এবং ট্রপিক্যাল বা ক্রান্তীয় অঞ্চলে অবস্থিত হওয়া একটি অন্যতম কারণ। পাশাপাশি মহাসাগরীয় প্রভাব এল নিনোর মতো বৈশ্বিক জলবায়ু চক্র অস্থায়ীভাবে বায়ুমণ্ডলের তাপমাত্রা বাড়িয়ে দেয়। পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম বায়ুপ্রবাহ বা ভারত থেকে আসা উষ্ণ ও শুষ্ক বায়ুপ্রবাহ এই অঞ্চলে তাপপ্রবাহের মাত্রা বাড়িয়ে তোলে।
পরিবেশগত ও মানবসৃষ্ট কারণসমূহের ব্যাখ্যা দিয়ে পরিবেশবিদ, এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশনের (ইএসডিও) মহাসচিব এবং নগর বাস্তুসংস্থানের গবেষক ড. শাহরিয়ার হোসেন রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, অপরিকল্পিত নগরায়ণ একটা বড় কারণ। গাছপালা ও জলাশয় কেটে চারপাশ কংক্রিটের দালানে ঢেকে ফেলা হয়েছে এবং হচ্ছে, যার ফলে শহরগুলো হিট আইল্যান্ড বা তাপদ্বীপে পরিণত হচ্ছে। একই সঙ্গে অবাধে চলছে বন ও গাছপালা নিধন। নির্বিচারে গাছ কাটার কারণে বাতাস থেকে কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণের প্রাকৃতিক ক্ষমতা কমে গেছে এবং তাপমাত্রা বাড়ছে। এসবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে যানবাহন ও শিল্প দূষণ। কলকারখানা, ইটভাটা এবং যানবাহনের কালো ধোঁয়া ও কার্বন কণা (ব্ল্যাক কার্বন) বায়ুমণ্ডলে তাপ আটকে রাখছে।
পরিবেশবিদদের কথায়, একদিকে বায়ুমণ্ডলে গ্রিনহাউস গ্যাসের ঘনত্ব বাড়ছে, অন্যদিকে পরিকল্পনাহীন নগরায়ণ, ইট-সিমেন্ট-কংক্রিটের বিস্তার, গাছপালা ও জলাভূমি কমে যাওয়া এবং ইটভাটার দূষণ শহরের তাপমাত্রা ও বায়ুর মানকে আরও খারাপ করে তুলছে। ফলে তৈরি হচ্ছে এক ভয়ংকর চক্র- উষ্ণতা বাড়ছে, বাতাস দূষিত হচ্ছে, মানুষের শরীর অসুস্থ হচ্ছে, আর অসুস্থ মানুষের জীবনযাত্রা ও কর্মক্ষমতার ওপর পড়ছে সরাসরি আঘাত। গ্রিনহাউস ইফেক্ট নিজে কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে থাকা কার্বন ডাইঅক্সাইড, মিথেন, নাইট্রাস অক্সাইড ও জলীয়বাষ্পের মতো গ্যাস সূর্যের তাপ ধরে রেখে পৃথিবীকে বাসযোগ্য রাখে। কিন্তু শিল্পায়ন, জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার, বন উজাড় ও বিভিন্ন মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ডের এই গ্যাসের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত তাপ বায়ুমণ্ডলে আটকে যাচ্ছে। এর ফল- বিশ্ব উষ্ণায়ন এবং জলবায়ু পরিবর্তন।
কমিউনিটি মেডিসিন বিশেষজ্ঞ এবং গ্রিন লাইফ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের প্রভাষক ডা. জাকিয়া ফেরদৌসী খান রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, বায়ুমণ্ডল অতিরিক্ত তাপ আটকে যাওয়ায় বাংলাদেশের মতো ঘনবসতিপূর্ণ ও জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশে এর প্রভাব আরও তীব্র হচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টি, অতিবৃষ্টি, বন্যা, ঘূর্ণিঝড় ও লবণাক্ততার মতো ঝুঁকির সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি। তাপমাত্রা বাড়লে মানুষের শরীর স্বাভাবিক তাপমাত্রা ধরে রাখতে বেশি পরিশ্রম করে। ঘামের মাধ্যমে শরীর তাপ কমানোর চেষ্টা করে। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম সহজে শুকাতে পারে না। তখন দেখা দিতে পারে পানিশূন্যতা, মাথা ঘোরা, দুর্বলতা, হিট ক্র্যাম্প, হিট এক্সহর্সন এবং গুরুতর ক্ষেত্রে হিটস্ট্রোক। বয়স্ক মানুষ, শিশু, গর্ভবতী নারী, হৃদ্রোগ, কিডনি বা ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি এবং যারা বাইরে শ্রমসাধ্য কাজ করেন তাদের ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি।
তিনি আরও বলেন, তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকেন রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিক, দিনমজুর, কৃষক, পরিবহনকর্মী, হকার ও পথের অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষ। তাদের অনেকেরই দীর্ঘ সময় সরাসরি রোদে থাকতে হয়। তাপপ্রবাহের সময় শরীর থেকে অতিরিক্ত পানি ও লবণ বেরিয়ে গেলে দুর্বলতা, মাথা ঘোরা ও অজ্ঞান হওয়ার মতো ঘটনা ঘটতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি অতিরিক্ত তাপ কিডনির ওপরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে। বিশেষ করে যারা পর্যাপ্ত পানি পান করতে পারেন না বা কাজের কারণে বিশ্রামের সুযোগ পান না, তাদের ঝুঁকি বাড়ে। অন্যদিকে ঘরের ভেতর থাকা মানুষও নিরাপদ নয়। টিনের ছাদ, অপর্যাপ্ত বায়ু চলাচল এবং ঘনবসতিপূর্ণ ভবনে দিনের তাপ আটকে থাকলে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রাও অস্বস্তিকর পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
ডা. জাকিয়া বলেন, ইটভাটা, নির্মাণকাজ, যানবাহনের ধোঁয়া এবং রাস্তার ধুলা মিলে নগরের বায়ুতে ক্ষতিকর কণা বাড়ায়। বিশেষ করে সূক্ষ্ম কণিকা। এই কণিকা ফুসফুসের গভীরে প্রবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘমেয়াদে হৃদযন্ত্র ও শ্বাসতন্ত্রের ওপর ক্ষতিকর প্রভাব ফেলতে পারে। বায়ুদূষণের কারণে হাঁপানি, দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসকষ্ট, ব্রঙ্কাইটিসসহ বিভিন্ন শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়তে পারে। শিশুদের ফুসফুসের স্বাভাবিক বিকাশও বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। বয়স্ক ও আগে থেকেই শ্বাসতন্ত্রের সমস্যায় ভোগা মানুষের জন্য ঝুঁকি আরও বেশি।
পরিবেশবিদ ড. শাহরিয়ার বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের বৈশ্বিক প্রভাবের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে নগর তাপদ্বীপ। একটি শহরে যখন গাছপালা, খোলা মাটি, জলাধার ও সবুজ এলাকা কমে গিয়ে তার জায়গা নেয় কংক্রিট, ইট, পিচ ও টিনের কাঠামো, তখন দিনের তাপ এসব পৃষ্ঠ শোষণ করে। রাতে সেই তাপ ধীরে ধীরে বের হয়। ফলে শহর রাতেও স্বস্তি পায় না।
তিনি আরও বলেন, ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ নগরে এই সমস্যা আরও প্রকট। উঁচু ভবনের সারি, সরু রাস্তা, অপর্যাপ্ত খোলা জায়গা, যানবাহনের ধোঁয়া এবং যত্রতত্র নির্মাণকাজ মিলিয়ে অনেক এলাকায় তাপ আটকে থাকে। একই সঙ্গে গাছপালা কমে যাওয়ায় প্রাকৃতিক ছায়া ও বাষ্পীভবনের মাধ্যমে ঠান্ডা হওয়ার সুযোগও কমে যায়। অপরিকল্পিত ইটের অবকাঠামো তাই কেবল সৌন্দর্য নষ্ট করছে না; এটি শহরের তাপমাত্রা, বায়ুপ্রবাহ এবং মানুষের জীবনযাত্রার ওপরও প্রভাব ফেলছে।
গ্রিনহাউস ইফেক্ট এবং ইটের অবকাঠামোর সঙ্গে আরেকটি বড় সমস্যা হলো বায়ুদূষণ। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। উষ্ণতা ও বায়ুদূষণ একে অপরকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। গরম আবহাওয়ায় কিছু বায়ুদূষক ও স্থলভাগে ওজোনের মাত্রা বাড়তে পারে, যা শ্বাসতন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর।
অতিরিক্ত তাপ ও দূষণের প্রভাব কেবল হাসপাতালের রোগীর সংখ্যা বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর অর্থনৈতিক মূল্যও আছে। অতিরিক্ত গরমে মানুষের কর্মক্ষমতা কমে যায়। যারা রোদে কাজ করেন, তারা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়েন। ফলে কাজের সময় কমে যায়, উৎপাদনশীলতা কমে এবং আয় ক্ষতিগ্রস্ত হয়। শহরে তীব্র গরমের সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। মানুষ ঘরে ঠান্ডা থাকার জন্য ফ্যান, এয়ার কন্ডিশনার ও অন্যান্য বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহার বাড়ায়। এতে বিদ্যুতের ওপর চাপ তৈরি হয়। একই সঙ্গে যারা এসব সুবিধা কিনতে বা ব্যবহার করতে পারেন না, তারা সবচেয়ে বেশি তাপঝুঁকিতে থাকেন।
রাজধানীর কয়েকজন স্কুলশিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তাপ নিয়ে তারাও নানা সমস্যার কথা জানান। তারা বলেন, দেশের কটি স্কুলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণব্যবস্থা আছে। অনেক স্কুলে তো ফ্যানই নেই। এই অবস্থায় উচ্চ তাপমাত্রা ও বায়ুদূষণের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব শিশুদের ওপর বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। শিশুরা দ্রুত পানিশূন্য হয়ে পড়তে পারে। দূষিত বাতাসে তাদের শ্বাসতন্ত্রের সমস্যা বাড়তে পারে। বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ যদি অতিরিক্ত গরম হয় এবং পর্যাপ্ত বায়ু চলাচল না থাকে, তা হলে শিক্ষার্থীদের মনোযোগ ও শেখার সক্ষমতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে পরিবেশগত সংকট শেষ পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থার ওপরও প্রভাব ফেলে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন