রাজধানীর অন্যতম বড় জলাধার হাতিরঝিলে দেখা মিলেছে ‘রেড ইয়ারড স্লাইডার’ নামীয় কচ্ছপের। এই প্রজাতির কচ্ছপের আদিনিবাস যুক্তরাষ্ট্রের মিসিসিপি নদী অববাহিকায়। কিন্তু বিদেশি এই কচ্ছপই এখন দেখা যাচ্ছে হাতিরঝিল লেকসহ রাজধানীর বেশ কয়েকটি জলাশয় ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পুকুরেও। এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠেছে, দেশের জলাশয়ে কীভাবে এলো এসব কচ্ছপ?
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য, শখের পোষা প্রাণীর বাজারের আড়ালে বিদেশি কচ্ছপের একটি বাণিজ্য তৈরি হয়েছে। চীন ও থাইল্যান্ড হয়ে এসব প্রাণী বাংলাদেশে ঢুকছে। বিমানবন্দরের লাগেজ, স্থলবন্দর, সমুদ্রবন্দর ও সীমান্তপথসহ বিভিন্ন রুটে বিদেশি বন্য প্রাণী দেশে প্রবেশ করে থাকে। এরপর শুরু হয় বাণিজ্যের দ্বিতীয় ধাপ। বেচাকেনা চলে অনলাইন ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের বিভিন্ন পেজে। ছোট কচ্ছপ দেখতে আকর্ষণীয় হওয়ায় শখের বশে অনেকে কিনে নেন। কিন্তু কচ্ছপটি বড় হয়ে গেলে পালনের ঝামেলা বাড়ে। তখন কেউ কেউ সেটিকে পুকুর, লেক বা জলাধারে ছেড়ে দেন। এগুলোও হয়তো সেভাবেই এসেছে।
পরিবেশবিদদের আশঙ্কা, এভাবেই এক জলাশয় থেকে আরেক জলাশয়ে ছড়িয়ে পড়তে পারে রেড ইয়ারড স্লাইডার। একবার যদি নদী-খালের বিস্তৃত জলজ পরিবেশে এর স্থায়ী আবাস তৈরি হয়, তখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়বে। বাংলাদেশ এরই মধ্যে সাকার ফিশ বিস্তারের অভিজ্ঞতা পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, রেড ইয়ারড স্লাইডারের ক্ষেত্রে একই ঘটনা ঘটতে পারে।
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তাদের ভাষ্য, বিদেশি প্রাণী শনাক্ত ও আটকে দেওয়ার ক্ষেত্রে নজরদারির ব্যবস্থা আরো শক্তিশালী করা প্রয়োজন। বিশেষ করে ছোট আকারের কচ্ছপ লাগেজে বহন করা হলে তা শনাক্ত করা কঠিন হতে পারে।
এ সম্পর্কে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের পরিদর্শক অসীম মল্লিক বলেন, মিরপুরে অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক বিদেশি কচ্ছপ উদ্ধারের ঘটনা প্রমাণ করে- দেশে এ ধরনের প্রাণীর চাহিদা ও বাণিজ্য রয়েছে। গত ৩ জুলাই মিরপুরে একটি অভিযানে ১ হাজার ১০৪টি বন্য প্রাণী উদ্ধার করে বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিট। এর মধ্যে ৮৪৬টি ছিল রেড ইয়ারড স্লাইডার কচ্ছপের বাচ্চা। একই অভিযানে ৫৬টি কমন স্ন্যাপিং টার্টলও উদ্ধার করা হয়। এই বিপুলসংখ্যক কচ্ছপ উদ্ধারের ঘটনা সামনে আসার পর প্রশ্ন উঠেছে- দেশে কি বিদেশি কচ্ছপের একটি গোপন বাজার তৈরি হয়েছে?
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তাদের মতে, বিদেশি কচ্ছপের বাণিজ্যের বড় একটি অংশ তৈরি হয়েছে পোষা প্রাণীর বাজারকে কেন্দ্র করে। ছোট অবস্থায় রেড ইয়ারড স্লাইডার দেখতে আকর্ষণীয়। অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা যায়। এ কারণে শহুরে পরিবারের মধ্যে এ ধরনের কচ্ছপ পালনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় কচ্ছপটি বড় হওয়ার পর। একটি ছোট কচ্ছপ যখন কয়েক বছর পর আকারে বড় হয়ে যায়, তখন সেটিকে অ্যাকুয়ারিয়ামে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অনেক মালিক তখন প্রাণীটির দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহী হয়ে ওঠেন। সে সময় কেউ কেউ সহজ সমাধান হিসেবে কচ্ছপটিকে নিকটস্থ পুকুর, লেক বা জলাশয়ে ছেড়ে দেন। তখনই বাধে বিপত্তি।
তাদের মতে, বিদেশি কচ্ছপের বেচাকেনার ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যবহার নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিদেশি প্রাণী কেনাবেচার পেজ রয়েছে। সেখানে নানা ধরনের কচ্ছপ ও অন্যান্য প্রাণী বিক্রির বিজ্ঞাপন দেওয়া হয়। এই বাজারের ক্রেতা কারা, বিক্রেতারা কোথা থেকে প্রাণী সংগ্রহ করেন এবং বিক্রির পর প্রাণীগুলোর শেষ গন্তব্য কোথায়- এসব বিষয়ে নিয়মিত নজরদারি প্রয়োজন।
বন্য প্রাণী অপরাধ দমন ইউনিটের কর্মকর্তাদের মতে, অনলাইনভিত্তিক এই বাণিজ্য শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণে সক্ষমতার ঘাটতি রয়েছে। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নজরের বাইরে থেকে যাচ্ছে এসব লেনদেন। এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় একটি ফাঁক। দেশে প্রাণী ঢোকার পর তা বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা কিনছেন। কিন্তু ক্রেতা পরে প্রাণীটি কোথায় রাখছেন, সে বিষয়ে কার্যকর নজরদারি নেই। ফলে একটি বিদেশি প্রজাতির কচ্ছপ কখন পোষা প্রাণী থেকে পরিবেশের বাসিন্দা হয়ে যাচ্ছে, তা বোঝার উপায় থাকছে না।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ঢাকার জলাশয়ে এই প্রজাতির কচ্ছপের উপস্থিতি নিছক বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ হাতিরঝিলের সঙ্গে রাজধানীর অন্যান্য জলাশয়ের জলজ পরিবেশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। আর কোনো একটি জলাশয়ে প্রজাতিটি টিকে গিয়ে বংশবিস্তার করলে ভবিষ্যতে তা আরও বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রেড ইয়ারড স্লাইডার স্বাদুপানির কচ্ছপ এবং বিশ্বজুড়ে পোষা প্রাণী হিসেবে বহুল বাণিজ্য হওয়া প্রজাতিগুলোর একটি। কিন্তু যে পরিবেশে এটি স্বাভাবিকভাবে বিবর্তিত হয়নি, সেখানে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি বদলে যেতে পারে। তথ্য অনুসারে, এই কচ্ছপ সর্বভুক। অর্থাৎ উদ্ভিদ ও বিভিন্ন প্রাণী- দুই ধরনের খাদ্যই গ্রহণ করে। নতুন পরিবেশে পর্যাপ্ত খাবার পেলে এটি স্থানীয় প্রজাতির সঙ্গে খাদ্য ও আবাসস্থল নিয়ে প্রতিযোগিতায় জড়াতে পারে। ফলে স্থানীয় জলজ প্রাণীর ওপর চাপ তৈরি হতে পারে।
আরেকটি আশঙ্কা রোগজীবাণু নিয়ে। রেড ইয়ারড স্লাইডারের সঙ্গে সালমোনেলা ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের সম্পর্ক নিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে সতর্কতা রয়েছে। প্রজননক্ষমতাও উদ্বেগের কারণ। একটি স্ত্রী কচ্ছপ বছরে একাধিকবার ডিম দিতে পারে। অনুকূল পরিবেশে দ্রুত বংশবৃদ্ধি ঘটলে এদের নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক এম এ আজিজ মনে করেন, হাতিরঝিল ও বিশ্ববিদ্যালয়ের জলাশয়ে বিদেশি কচ্ছপের উপস্থিতিকে গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত। তার মতে, আগ্রাসী বিদেশি প্রজাতির কচ্ছপ একবার কোনো জলজ পরিবেশে স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে পরে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
সাকার ফিশের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, এই মাছ কীভাবে বুড়িগঙ্গা থেকে শীতলক্ষ্যা ও তুরাগ হয়ে মেঘনার মোহনা পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে, তা এখন সবার জানা। রেড ইয়ারড স্লাইডারের ক্ষেত্রেও একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হলে তা দেশের জলজ জীববৈচিত্র্যের জন্য বড় বিপদ ডেকে আনতে পারে।
অধ্যাপক আজিজের মতে, এখনই কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি। যেমন- বিদেশি আগ্রাসী প্রজাতির অবৈধ আমদানি বন্ধ করা; বিমানবন্দর ও স্থলবন্দরে নজরদারি বাড়ানো; অনলাইন ও ফেসবুকভিত্তিক বন্য প্রাণীর বেচাকেনা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া; রাজধানীর জলাশয়গুলোতে জরিপ চালানো; কোথায় কোথায় রেড ইয়ারড স্লাইডার রয়েছে, তার তালিকা তৈরি করা এবং এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়া কচ্ছপ নিয়ন্ত্রণে বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা। রেড ইয়ারড স্লাইডারের পাশাপাশি কমন স্ন্যাপিং টার্টলের উপস্থিতিও নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
মিরপুরের অভিযানে ৫৬টি কমন স্ন্যাপিং টার্টল উদ্ধার করা হয়। কর্মকর্তাদের মতে, এই প্রজাতি আকারে রেড ইয়ারড স্লাইডারের তুলনায় অনেক বড় হতে পারে। ৩৫ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত ওজন হওয়ার তথ্যও রয়েছে। এটিও সর্বভুক। বাংলাদেশের জলজ পরিবেশে যদি এটি অবমুক্ত হয়ে বংশবিস্তার শুরু করে, তাহলে স্থানীয় জীববৈচিত্র্যের ওপর কী ধরনের প্রভাব পড়বে, তা নিয়ে এখনই গবেষণা ও মূল্যায়ন প্রয়োজন বলে মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।
হাতিরঝিল পরিস্থিতি সম্পর্কে পরিবেশবিদদের পরামর্শ, আতঙ্ক ছড়ানোর আগেই জরুরি ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক জরিপ করা প্রয়োজন। প্রথমে শনাক্ত করতে হবে, কোথায় কোথায় এই প্রজাতি কচ্ছপ রয়েছে। এরপর দেখতে হবে তারা শুধু পোষা অবস্থায় রয়েছে, নাকি প্রকৃতিতে বংশবিস্তার শুরু করেছে। যদি বংশবিস্তার শুরু হয়ে থাকে, তাহলে কোন পদ্ধতিতে তাদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, তা নির্ধারণ করতে হবে। কারণ কোনো আগ্রাসী প্রজাতির ক্ষেত্রে সবচেয়ে কার্যকর ব্যবস্থা হলো- প্রথম পর্যায়েই তা নিয়ন্ত্রণ করা। একবার নদী-খাল ও বিস্তৃত জলাভূমিতে ছড়িয়ে পড়ার পর অভিযান চালিয়ে প্রতিটি কচ্ছপ ধরে ফেলা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠতে পারে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন