রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) কোনো নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত করার অভিযোগ উঠলে তার বিচার করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন আছে, প্রক্টরিয়াল বডি আছে, তদন্ত কমিটি আছে। গুরুতর অপরাধ হলে পুলিশ আছে, আছে দেশের প্রচলিত আইন ও আদালত। তাহলে প্রশ্ন উঠছে, ছাত্রসংগঠন কেন আইন নিজের হাতে তুলে নেবে? আর সেই সংগঠনটি যদি হয় শিবির, তাহলে তো প্রশ্ন ওঠে আরও অনেক। প্রশ্ন ওঠে, রাবি তুমি কার?
এক নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের তদন্ত করতে গিয়ে যদি একদল শিক্ষার্থী আরেকদলকে মারধর করে, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে হামলা চালানোর অভিযোগ ওঠে, আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও হামলার অভিযোগ আসে এবং ক্যাম্পাসে প্রকাশ্যে অস্ত্র প্রদর্শনের মতো অভিযোগ সামনে আসে—তাহলে সেটি আর নিছক ছাত্রসংগঠনের বিরোধ থাকে না। সেটি হয়ে ওঠে বিশ্ববিদ্যালয়ের আইনশৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক কর্তৃত্বের জন্য বড় প্রশ্ন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ সেই প্রশ্নই সামনে এনেছে। ক্যাম্পাসে কি আবার ‘মব কালচার’ ফিরে আসছে? আরও বড় প্রশ্ন—বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন প্রয়োগ করবে কে? প্রশাসন ও পুলিশ, নাকি ছাত্রসংগঠনগুলো?
ঘটনার সূত্রপাত সংস্কৃত বিভাগের এক ছাত্রীর অভিযোগকে কেন্দ্র করে। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রের বরাতে জানা গেছে, একই বিভাগের এক শিক্ষার্থী তাকে প্রেমের প্রস্তাব দেওয়ার পর প্রত্যাখ্যাত হন। পরে ওই ছাত্রীকে ভয়ভীতি দেখানো এবং ক্যাম্পাস ছাড়ার হুমকি দেওয়ার অভিযোগ ওঠে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগটি সত্য হলে সেটি নিঃসন্দেহে গুরুতর। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উচিত ছিল অভিযোগটি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া। কিন্তু ঘটনার পরবর্তী গতিপথই এখন উদ্বেগের কারণ।
অভিযুক্ত শিক্ষার্থীর পক্ষে কয়েকজন শিক্ষার্থী প্রক্টরের কার্যালয়ে উপস্থিত হন। সেখানে বাগ্বিতণ্ডার অভিযোগ ওঠে। পরদিনের বৈঠকে তাদের একজনকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করেন রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতারা। তার মুঠোফোনে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে তোলা ছবি দেখিয়ে তাকে মারধর করা হয়—এমন অভিযোগও রয়েছে। এরপর শুরু হয় পাল্টাপাল্টি হামলার অভিযোগ।
অভিযোগ রয়েছে, এর কিছুক্ষণ পর রাকসু ভবনে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মার এবং তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক বি এম নাজমুস সাকিবের ওপর হামলা করেন কয়েকজন শিক্ষার্থী। এতে নাজমুস সাকিব আহত হন বলে জানা গেছে।
এরপর কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের সামনে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। কয়েকজন শিক্ষার্থী পাঠকক্ষের ভেতর আশ্রয় নেন।
অভিযোগ উঠেছে, এরপর রাকসু ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে তাদের মারধর করেন। হামলা ঠেকাতে গিয়ে কয়েকজন সাধারণ শিক্ষার্থীও আহত হন। এমনকি আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার সময়ও হামলার অভিযোগ উঠেছে।
যদি এসব অভিযোগ তদন্তে সত্য প্রমাণিত হয়, তবে প্রশ্ন একটাই—একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারে কীভাবে দলবদ্ধ হামলা চালানোর সুযোগ তৈরি হলো? আরও প্রশ্ন—প্রশাসন কোথায় ছিল? প্রক্টরিয়াল বডি কোথায় ছিল? পুলিশ কেন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসার আগেই কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারল না?
এই ঘটনার মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। সেখানে রাকসুর জিএস সালাউদ্দিন আম্মারকে হাতে বেলচা নিয়ে কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের দিকে তেড়ে যেতে দেখা গেছে বলে দাবি করা হয়েছে। একজন নির্বাচিত ছাত্রপ্রতিনিধির হাতে এমন কোনো বস্তু কেন থাকবে—এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। রাকসু ছাত্রদের প্রতিনিধিত্বের প্রতিষ্ঠান। তার একজন শীর্ষ প্রতিনিধি যদি সংঘাতের পরিস্থিতিতে হাতে বেলচা নিয়ে এগিয়ে যান, তাহলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এর বার্তা কী? এটি কি নেতৃত্বের প্রতীক, নাকি শক্তি প্রদর্শনের? এখানে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে, কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন প্রয়োগের দায়িত্ব কোনো ছাত্রপ্রতিনিধির নয়।
সাম্প্রতিক ঘটনাকে ঘিরে ছাত্রশিবিরের নেতৃত্বের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে। বিশেষ করে ছাত্রশিবিরের সভাপতির হাতে ধারালো অস্ত্র থাকার অভিযোগ। গণমাধ্যমে সেই ছবিও প্রকাশ পেয়েছে। এসব নিয়ে ক্যাম্পাসে সমালোচনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি অবশ্যই নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি রাখে। ধারালো অস্ত্র হাতে ধাওয়া করার ছবিটি যদি এআই দিয়ে বানানো না হয়ে সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে প্রশ্ন আরও গুরুতর।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতির ভাষা হওয়া উচিত যুক্তি, কর্মসূচি ও সংগঠন। সেখানে কোনো নেতার হাতে ধারালো অস্ত্রের উপস্থিতি যদি সত্য হয়, সেটি শুধু শৃঙ্খলাভঙ্গ নয়—ক্যাম্পাসের নিরাপত্তা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ তৈরি করে। প্রশাসনের উচিত ভিডিও ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যের ভিত্তিতে বিষয়টি তদন্ত করা।
এই ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, কাউকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে দাবি করা। কেউ কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত কি না, তা তদন্তের বিষয়। কেউ অপরাধ করেছেন কি না, সেটিও তদন্তের বিষয়। কিন্তু কোনো ছাত্রসংগঠন কাউকে অপরাধী ঘোষণা করে শাস্তি দিতে পারে না। কারও ফোনে কোনো রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ছবি থাকলেই তিনি অপরাধী—এমন সিদ্ধান্তও আইনসম্মত নয়। একইভাবে, কেউ নিষিদ্ধ সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও তার বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে। মারধর করে নয়।
‘মব’ বা দলবদ্ধ জনতার হাতে বিচার একটি ভয়ংকর প্রবণতা। কারণ মব একবার বৈধতা পেয়ে গেলে তার কোনো সীমা থাকে না। আজ একজনকে ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগে পেটানো হলো। কাল অন্য কাউকে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে পেটানো হতে পারে। পরদিন কোনো সাধারণ শিক্ষার্থীও কোনো রাজনৈতিক গোষ্ঠীর রোষানলে পড়তে পারেন। তখন আর বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন থাকবে না। থাকবে পরিচয়ের বিচার। কে কোন দলের—সেটিই হয়ে উঠবে অপরাধের প্রমাণ। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো দেশের অন্যতম প্রধান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এমন পরিস্থিতি তৈরি হলে তার দায় শুধু কোনো একটি ছাত্রসংগঠনের নয়। প্রশাসনেরও। কারণ প্রশাসন যদি প্রথমবারের ঘটনায় কঠোর ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে দ্বিতীয়বার আরও বড় ঘটনা ঘটার সুযোগ তৈরি হয়।
প্রশাসনের সামনে এখন কিছু প্রশ্ন উঠেছে। এটাও স্বাভাবিক। প্রশ্ন হচ্ছে, নারী শিক্ষার্থীকে উত্ত্যক্ত ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হয়েছে কি? প্রক্টরের কার্যালয়ে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগের তদন্ত হচ্ছে কি? রাকসু ভবনে হামলার অভিযোগের তদন্ত কোথায়? কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে ঢুকে শিক্ষার্থীদের মারধরের অভিযোগে কারা জড়িত? আহতদের হাসপাতালে নেওয়ার সময় হামলার অভিযোগের সত্যতা কী? রাকসু জিএসের হাতে বেলচা এবং ছাত্রশিবিরের সভাপতির হাতে ধারালো অস্ত্র থাকার অভিযোগ—এসবের বিষয়ে প্রশাসনের অবস্থান কী? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর না পাওয়া পর্যন্ত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ থেকেই যাবে।
এদিকে মারধরের শিকার তিন শিক্ষার্থীর মধ্যে দুজনকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের ‘সন্ত্রাসী কার্যক্রম’ সংক্রান্ত একটি মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ। তারা চিকিৎসাধীন বলে পুলিশ জানিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, তাদের বিরুদ্ধে আগের মামলার আইনগত প্রক্রিয়া এক বিষয়; কিন্তু সাম্প্রতিক হামলার ঘটনায় তাদের ওপর হামলা বা মারধরের অভিযোগ আরেক বিষয়। দুটি বিষয়কে এক করে দেখার সুযোগ নেই। যদি তারা কোনো অপরাধ করে থাকেন, তার বিচার হবে আইনে। আর তাদের ওপর কেউ হামলা করে থাকলে, সেই হামলারও বিচার হতে হবে।
গণতান্ত্রিক ছাত্র জোট ঘটনাটিকে ‘মব সন্ত্রাস’ আখ্যা দিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে। ছাত্রদলও অভিযুক্তদের বিচারের দাবি জানিয়েছে। বিভিন্ন পক্ষের এমন প্রতিক্রিয়া থেকেই বোঝা যায়, ঘটনাটি এখন আর দুই পক্ষের সংঘর্ষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; এটি ক্যাম্পাসের সামগ্রিক নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক পরিবেশের প্রশ্ন হয়ে উঠেছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এখনই সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়। কারও রাজনৈতিক পরিচয় দেখে নয়, অপরাধের প্রমাণ দেখে ব্যবস্থা নিতে হবে। ছাত্রলীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ থাকলে তদন্ত হোক। ছাত্রশিবিরের কেউ হামলায় জড়িত থাকলে তারও বিচার হোক। রাকসুর কোনো নেতা আইন হাতে তুলে নিলে তার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন সবার জন্য সমান—এই বার্তাটিই এখন সবচেয়ে জরুরি। কারণ আজ কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের পাঠকক্ষে হামলা হয়েছে। কাল হয়তো শ্রেণিকক্ষেও হতে পারে। আজ হাতে বেলচা বা ধারালো অস্ত্রের অভিযোগ উঠেছে। কাল হয়তো আরও ভয়ংকর কিছু দেখা যেতে পারে। তখন প্রশ্ন করারও সুযোগ থাকবে না। প্রশ্ন উঠবে, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় আসলে কার? এই প্রশ্নের উত্তর এখন প্রশাসনকেই দিতে হবে।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন