যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে দেওয়া হতে পারে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি। বিশেষ সূত্র ও ছাত্রদলের একাধিক নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমান কমিটিকে বিএনপির চেয়ারম্যান সম্ভবত মৌখিক বিদায় দিয়েছেন। পাশাপাশি বর্তমান কমিটির সুপার ফাইভে যারা রয়েছেন, তাদের কাছে জানতে চেয়েছেন- মাঠে যারা রয়েছে তাদের মধ্যে কারা নেতৃত্বে আসার যোগ্য। এ ছাড়া সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশে আসার গুঞ্জন ও শিবির মোকাবিলায় ছাত্রদলকে শক্তিশালী করতে বিএনপির চেয়ারম্যান নতুন কমিটির দিকে আগ্রহ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে।
সূত্র মতে, ছাত্রসংগঠনটির সভাপতি রাকিবুল ইসলাম রাকিব ও নাছির উদ্দীন নাছির বর্তমান নেতৃত্বে থাকা অবস্থায় দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন, নিষ্ক্রিয়তা, রাজপথের নেতাদের পরিচয় না থাকা, ‘মাই ম্যান’ ও অছাত্র এবং ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে কমিটিতে পদায়নসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত সংগঠনটি। এসব কারণে যেকোনো সময় ছাত্রদলের নতুন কমিটি হওয়ার গুঞ্জন চলছে।
দলীয় বিশেষ সূত্রে জানা গেছে, আগস্টের প্রথম দিকে নতুন কমিটি পাচ্ছে ছাত্রদল। তবে দুই সপ্তাহ পরে নতুন কমিটি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। কমিটি ভাঙার আলোচনা সামনে আসার পাশাপাশি নতুন কমিটি ঘিরে তোড়জোড় শুরু হওয়ায় ব্যস্ত সময় পার করছেন অনেকেই। একাধিক ছাত্রনেতার সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের আধিপত্য, দ্বন্দ্ব ও কমিটি বাণিজ্যের অভিযোগের কারণে বিএনপির চেয়ারম্যান অনেকটা ক্ষুব্ধ। তাই ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি ভেঙে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। এরই মধ্যে ছাত্রদলের কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে। এ কারণে মাঠের নেতাকর্মীরাও নতুন কমিটি চাইছেন।
সভাপতি পদে আলোচনায় যারা
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটি সূত্রে জানা যায়, নেতাকর্মীদের মধ্যে কমিটি ভাঙার আলোচনা এখন তুঙ্গে। খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ব্যক্তিগতভাবে সম্ভাব্য প্রার্থীদের ওপর নজরদারি রাখতে বিশেষ উদ্যোগ নিয়েছেন বলে জানা গেছে।
এরই মধ্যে আলোচনায় শীর্ষে রয়েছেন বেশ কয়েকজন সভাপতি পদপ্রত্যাশীর নাম। তারা হলেন-বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল। রুয়েল দীর্ঘদিনের রাজপথের ত্যাগী ছাত্রনেতা। রুয়েলকে ছাত্রদলের সবাই পছন্দ করেন এবং সভাপতি দেখতে চান। সম্প্রতি রুয়েলের নাম বিএনপির শীর্ষ নেতাদের মুখেও শোনা যাচ্ছে। অনেকেই আশা করছেন, যোগ্যতার কারণে রুয়েল হয়তো ছাত্রদলের হাল ধরতে পারেন।
কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদও রয়েছেন আলোচনায়। রিয়াদ রাজনীতি ও রাজপথ উভয় ক্ষেত্রেই সক্রিয়। এই পদে আরও একজনের নাম শোনা যাচ্ছে, তিনি হলেন সহসভাপতি এইচ এম আবু জাফর। জাফরকেও অনেকে সভাপতি হিসেবে দেখতে চান। জাফর বিগত দিনে সংগঠনের জন্য সব কিছু বিলিয়ে রাজপথে সক্রিয় ছিলেন।
এ ছাড়া সভাপতি পদে আলোচনায় এগিয়ে রয়েছেন ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান। আমানকে বিগত সরকারের সময় পুলিশ ও ছাত্রলীগ ব্যাপক নির্যাতন করেছে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আমানের ত্যাগের বিষয়টি জানেন ও তাকে পছন্দ করেন।
ছাত্রদল করার কারণে আমানের দীর্ঘ সময় কেটেছে জেলে। আমানের আত্মত্যাগের কথা বলতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও। তিনিও আমানের মতো ত্যাগী ছাত্রনেতাকে যোগ্য স্থানে চাইছেন বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সম্ভাব্য আরও সভাপতি প্রার্থীর তালিকায় যাদের নাম ঘুরছে, তাদের মধ্যে অন্যতম বর্তমান কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান। মোস্তাফিজুর ২০১৯ সালে অনুষ্ঠিত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনে ছাত্রদলের পক্ষ থেকে সহ-সভাপতি (ভিপি) পদে প্রার্থী হন।
আওয়ামী দোসরদের মিথ্যা মামলায় ২০১৯ সালে মোস্তাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করা হয়। সে সময় পুলিশ তাকে অনেক নির্যাতন করেছে। দীর্ঘদিন রাজপথে সক্রিয় থাকা এই ছাত্রনেতাকে তৃণমূলের একটি বড় অংশ নেতৃত্বে চাইছেন। আলোচনায় রয়েছেন সহ-সভাপতি শাফি ইসলাম ও খোরশেদ আলম সোহেল। তারাও রাজপথে সক্রিয় ও নির্যাতিত ছাত্রনেতা হিসেবে বিভিন্ন মহলে পরিচিত।
সাধারণ সম্পাদক পদে আলোচনায় যারা
ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক পদেও আলোচনায় রয়েছে কয়েকজনের নাম। তারা হলেন- ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন, কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মমিনুল ইসলাম জিসান, প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভ ও মো. তরিকুল ইসলাম তারিক। পাশাপাশি রয়েছেন- কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সালেহ মো. আদনান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল সভাপতি গণেশ চন্দ্র রায় সাহস, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক শামিম আকতার শুভ, ঢাবির ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাহিদুজ্জামান শিপন, ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সম্পাদক মাসুম বিল্লাহ, সাহিত্য ও প্রকাশনা সম্পাদক মিনহাজ আহমেদ প্রিন্স।
মাঠ পর্যায়ের নেতাদের সূত্র মতে, এর মধ্যে জিসান ও ফারুকের নাম বিভিন্ন মহলে আলোচনার শীর্ষে রয়েছে। জিসান ও ফারুক ৫ আগস্টে সরকার পতনের আন্দোলনে ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। এ ছাড়া এ পদে প্রচার সম্পাদক শরিফ প্রধান শুভও আলোচনায় আছেন। অনেকেই শুভকে এই পদে যোগ্য মনে করেন।
সাংগঠনিক সম্পাদক পদে আলোচনায় যারা
সাংগঠনিক সম্পাদক পদে যাদের নাম শোনা যাচ্ছে, তারা হলেন- কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ছাত্রনেতা রাজু আহমেদ, সোহেল রানা ও ইব্রাহিম খলিল। এর মধ্যে রাজু এগিয়ে রয়েছেন। রাজু হলেন বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী আহমেদের স্নেহধন্য। অন্যদিকে গাজী সাদ্দামও আলোচনার শীর্ষে রয়েছেন। এ ছাড়া এই পদের জন্য নাসির উদ্দিন শাওন ও শামিম আক্তার শুভ বহুল আলোচিত।
এই বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের এক প্রেস সেক্রেটারি জানান, প্রধানমন্ত্রী ছাত্রদলের নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন চিন্তাভাবনা করছেন এবং যোগ্যদের তিনি মূল্যায়নের ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন।
তবে বিএনপির গুলশান অফিস ও নয়াপল্টনের একটি বিশ্বস্ত সূত্রে জানা যায়, বিএনপির নেতৃত্বে নতুন সরকার শুধু ছাত্রদল নয়, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বেশ কয়েকটি অঙ্গসংগঠন মেরামতের হাত দিয়েছেন। কয়েক মাসের মধ্যে বেশ কয়েকটি অঙ্গসংগঠনকে ঢেলে সাজাতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদের কাজ করতে নির্দেশনাও দিয়েছেন।
মূল্যায়ন চান ত্যাগী নেতাকর্মীরা
জুলাই বিপ্লবের পর থেকে বিএনপি সরকার গঠন পর্যন্ত ছাত্রদলে জায়গা পাননি বিগত ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামে যুক্ত থাকা অনেক ত্যাগী নেতাকর্মী। ফলে সংগঠনটি আলোচনা-সমালোচনার শিকার হচ্ছে। পাশাপাশি রাজপথের ছাত্রনেতাদের যথাযথ মূল্যায়ন করতে অপারগতার পরিচয় দিয়েছে বর্তমান কমিটি। এ জন্য বর্তমান মেয়াদোত্তীর্ণ কমিটি ভেঙে নতুন কমিটির নেতৃত্ব চান সারা দেশের ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
নেতাকর্মীরা আরও জানান, ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় সভাপতি এবং সাধারণ সম্পাদকের বডি ল্যাঙ্গুয়েজের সঙ্গে সাধারণ শিক্ষার্থীদের কোনোভাবেই মেশানো যাচ্ছে না। এতে স্থবির হয়ে পড়ছে পুরো সংগঠন। যার কারণে পরিবর্তন চাইছেন সবাই।
সাংগঠনিক অস্থিরতা চরমে
জানতে চাইলে ছাত্রদল কেন্দ্রীয় সংসদের এক সহসভাপতি জানান, ছাত্রদলের নেতৃত্ব ছাড়তে চান রাকিব ও নাছির। তারপরও বিএনপি সরকার হয়তো তাদের জোরপূর্বক রেখেছে, এমনটাও প্রচার রয়েছে। এটা নিয়ে বিভিন্ন মহলে নানা ধরনের প্রশ্ন এবং সমালোচনার শিকার হচ্ছে ছাত্রদল। যদিও এসব বিষয়ে সরাসরি ছাত্রদলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা বলছেন, এ বিষয়ে বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ অতিজরুরি।
জানতে চাইলে ছাত্রদলের এক সহসভাপতি রূপালী বাংলাদেশকে জানান, অনেক নেতাকর্মী রয়েছেন, যারা ১৭ বছর রাজপথে থেকেও নিজস্ব পরিচয় পাননি। বিএনপি সরকার গঠনের পর তাই নিজস্ব পরিচয় চান এসব ত্যাগী নেতাকর্মীরা। তাদের পরিচয় দেওয়ার মতো ক্ষমতা সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের ছাড়া আর কারো নেই।
জানতে চাইলে ছাত্রদলের কেন্দ্রীয় কমিটির এক যুগ্ম সম্পাদক রূপালী বাংলাদেশকে জানান, রাকিব ও নাছিরের বর্তমান নেতৃত্বে থাকা কমিটি দুঃসময়ের ত্যাগী নেতাকর্মীদের অবমূল্যায়ন, নিষ্ক্রিয়তা, রাজপথের নেতাদের পরিচয় না থাকা, ‘মাই ম্যান’ ও অছাত্র এবং ছাত্রলীগের বেশ কিছু নেতাকর্মীকে কমিটিতে পদায়নসহ নানা অভিযোগে অভিযুক্ত। এই কারণে নতুন নেতৃত্ব চান ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা।
জানতে চাইলে ছাত্রদলের বর্তমান কমিটির সহসভাপতি ইজাজুল কবির রুয়েল বলেন, ‘নেতৃত্বের সুযোগ পেলে বাংলাদেশ ছাত্রদলকে সুসংগঠিত করে সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকারে সর্বদা সোচ্চার ও রাজপথে অগ্রণী ভূমিকা রাখব, ইনশাআল্লাহ।’
কেন্দ্রীয় কমিটির সহসভাপতি মঞ্জুরুল আলম রিয়াদ বলেন, ‘সংগঠন ও জনগণের কল্যাণে কেন্দ্রীয় কমিটি নেতৃত্বের সুযোগ দিলে, ইনশাআল্লাহ নিষ্ঠা ও সততার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করব।’
ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ফারুক হোসেন বলেন, ‘নেতৃত্বের সুযোগ পেলে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলকে আরও শক্তিশালী, সুসংগঠিত ও বেগবান করতে রাজপথে সততার সঙ্গে কাজ করে যাব।’
কেন্দ্রীয় সংসদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান (ভিপি) বলেন, ‘আমি দায়িত্ব পেলে ছাত্রদল হবে অন্যরকম, ভিন্নরকম। আমরা সাধারণ শিক্ষার্থীদের অধিকার আদায় ও মেধাভিত্তিক রাজনীতির মাধ্যমে সংগঠনকে একটি আধুনিক ও গতিশীল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করব।’
ছাত্রদলের সাংগঠনিক সম্পাদক আমান উল্লাহ আমান জানান, ‘দায়িত্ব পেলে প্রতিহিংসার রাজনীতি বাদ দিয়ে ছাত্রদের অধিকার রক্ষায় কাজ করব। ক্যাম্পাসগুলোতে মেধার মূল্যায়ন নিশ্চিত করতে এবং সাধারণ শিক্ষার্থীদের সার্বিক কল্যাণে একটি জবাবদিহিমূলক ছাত্ররাজনীতি গড়ে তুলব ইনশাআল্লাহ।’

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন