২০২৬-২৭ অর্থবছরে ৬ লাখ কোটি টাকা রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। আহরণের এ লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করে রাজস্ব বোর্ড কর্তৃপক্ষ। অতীতের দ্বন্দ্ব ভুলে ‘টিম এনবিআর’-এর সদস্যরা রাজস্ব ফাঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনবেন। তাই নতুন করে আদায় লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নীতি ও কৌশল নির্ধারণ করেছে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটি।
আগারগাঁওয়ের রাজস্ব ভবনে এ বিষয়ে এনবিআরের নতুন ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান আহসান হাবিব সংস্থার সদস্যদের নিয়ে গত সোমবার দ্বিতীয়বারের মতো বৈঠক করেন। একই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
যদিও বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা আদায়ে পিছিয়ে ছিল এনবিআর। তবে চলতি অর্থবছরের বর্ধিত রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে সংশয়ে আছেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা।
গতকালের বৈঠক সূত্রে জানা যায়, বর্ধিত লক্ষ্যমাত্রা ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা অর্জন করা সম্ভব। এ জন্য তামাক খাতের বর্ধিত কর আদায়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি কর-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তিতে বেশি জোর দেওয়া হবে। সে জন্য নতুন করে অ্যাকশন প্ল্যান তৈরি ও বাস্তবায়নের কথাও বৈঠকে বলা হয়। তামাক খাত থেকে সরকার বছরে প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করে। তবে এবার এ খাত থেকে আরও বেশি রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
এনবিআরের একাধিক সদস্য রূপালী বাংলাদেশকে বলেন, ‘৬৬ হাজার করদাতার স্বয়ংক্রিয় (অটোমেটেড) পদ্ধতিতে নির্বাচিত ফাইলের অডিট দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
বিদায়ী অর্থবছরে পিছিয়ে পড়লেও চলতি অর্থবছরে এনবিআরকে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব আদায় করতে হবে, যা সদ্যসমাপ্ত অর্থবছরের তুলনায় প্রায় ৪৫ শতাংশ বেশি। তবে এনবিআরের সেই সক্ষমতা আছে বলে সম্প্রতি রাজস্ব ভবনে মন্তব্য করেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী।
চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের রাজস্ব আদায় নিয়ে তিনি বলেন, ‘জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর্মকর্তারা এ লক্ষ্য অর্জনে প্রস্তুত আছেন। রাজস্ব আদায় ভালো হবে। এনবিআরের সবাই প্রস্তুত। আমরা যে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছি, তা পূরণ হবে।’
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানটির এক সদস্য বলেন, এর জন্য ‘টিম এনবিআর’ হিসেবে কাজ করা প্রয়োজন। এই টিমে কাস্টমস, ভ্যাট ও আয়কর—এই তিনটি বিভাগ সমন্বিতভাবে কাজ করবে। ৬ লাখ কোটি টাকা আহরণের রোডম্যাপ তৈরি করা হচ্ছে। বিভেদ ভুলে টিমওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করলে এবং রাজস্ব ফাঁকি সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনতে পারলে ৬ লাখ কোটি টাকা আদায় করাও সম্ভব।
উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ‘চট্টগ্রাম বন্দরে আসা কন্টেইনারগুলোর সঠিক মূল্যায়ন (ভ্যালুয়েশন) নিশ্চিত করতে পারলে এবং অন্তত ৬০ শতাংশ নিখুঁতভাবে কাজ করতে পারলেই রাজস্ব আদায়ে বড় পরিবর্তন আনা সম্ভব। কর্মকর্তাদের এমনভাবে কাজ করতে হবে, যেন তারা এই প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের লক্ষ্যকে নিজেদের লক্ষ্য হিসেবে ধারণ করেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘কাজের পরিবেশ ও অভ্যন্তরীণ সমন্বয়ের জন্য প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এনবিআরে আলাদা কোনো টিম গঠন করা হবে না। তবে একটি অনানুষ্ঠানিক টিম হিসেবে সবাইকে কাজ করতে হবে।’
বৈঠকের বিষয়ে এনবিআর জানায়, লক্ষ্য অর্জনে মাইক্রো ও ম্যাক্রো—উভয় পর্যায়ের পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষ করে বন্ড ইস্যু, ভ্যাট নিরীক্ষা এবং হাইকোর্টে বিচারাধীন মামলাগুলো নিষ্পত্তির বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিগত অর্থবছরগুলোতে লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হলেও চলতি অর্থবছরের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা। তাদের মতে, রাজস্ব আদায়ে বড় আকারের ঘাটতি ছিল; হঠাৎ করে সেখান থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হবে।
বিদায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪ লাখ ১০ হাজার ৩৯০ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ। লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৯২ হাজার ৬১০ কোটি টাকা আদায়ে পিছিয়ে ছিল এনবিআর। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের শেষ মাসে রাজস্ব আদায় হয়েছে ৪৯ হাজার ৭৫৭ কোটি টাকা। তবে লক্ষ্যমাত্রা পূরণ না হলেও আগের অর্থবছরের তুলনায় রাজস্ব আদায়ে ১০ দশমিক ৬৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে।
আমদানি ও রপ্তানি পর্যায়ে আদায় হয়েছে ১ লাখ ১১ হাজার ৬২৩ কোটি টাকা, আয়কর ও ভ্রমণ কর খাতে ১ লাখ ৪২ হাজার ৬৯৮ কোটি টাকা এবং ভ্যাট থেকে সর্বাধিক ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায় হয়েছে।
২০২৪-২৫ অর্থবছরের তুলনায় গত অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আদায় বেড়েছে ১১ শতাংশ। এদিকে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরে এনবিআরের মোট রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকা।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন