খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে যেকোনো দলিল রেজিস্ট্রির সময় সামান্য ত্রুটি-বিচ্যুতির অজুহাত দেখিয়ে রেজিস্ট্রি আটকে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। তবে টাকা দিলে সবকিছু নির্বিঘেœ সম্পন্ন হচ্ছে বলে ভুক্তভোগীরা জানিয়েছেন। ফলে স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় রেজিস্ট্রির সুযোগ চান সেবা প্রত্যাশীরা।
উপজেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে জমির দলিল করতে আসা ক্রেতা-বিক্রেতা ও দলিল লেখকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বহু বছর ধরে জমি (ভূমি) রেজিস্ট্রি করতে ‘অফিস খরচসহ বিভিন্ন নামে কিছু টাকা দেওয়ার রেওয়াজটি মেনেই এখানে দলিল রেজিস্ট্রির কাজ চলছিল। কিন্তু গত ৩০ এপ্রিল-২০২৫ সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে মো. নাহিদুজ্জামান ডুমুরিয়ায় যোগ দেওয়ার পর থেকেই সামান্য আইনি ত্রুটি বা নামের বানানে ভুল বের করেই ‘এ দলিল রেজিস্ট্রি হবে না’ বলে আটকে দিচ্ছে। তখন সংশ্লিষ্ট দলিল লেখক তার কাজ উদ্ধারের জন্য সাব-রেজিস্ট্রারের একান্তজন (নকল নবিস) তপন ম-লের সঙ্গে কথা বলে ১০ হাজার থেকে লাখ টাকা দিতে পারলে সেই জমি রেজিস্ট্রি হয়ে যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
নাম-প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক দলিল লেখক বলেন, আমরা বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় নিয়ে অনেক যাচাই-বাছাই করে একটা দলিল তৈরি করে সাব-রেজিস্ট্রারের সামনে দাখিল করি। এরপর তিনি খুঁজতে থাকেন, কোথাও কোনো ত্রুটি আছে কি-না। অনেক ক্ষেত্রে জমির পরচায় যে নাম লেখা থাকে, দাতার এন.আই.ডি কার্ডে কোনো না কোনো ভুল বের করেই বলেন, যাও এ দলিল হবে না। ভুল-সংশোধন করে নিয়ে এসো। কিন্তু নাম-সংশোধন তো মুখের কথা নয়। তাই ঝামেলা থেকে বাঁচতে তপনের মাধ্যমে সর্বনি¤œ ১০ হাজার থেকে শুরু করে সমস্যার গুরুত্বানুসারে টাকা দিলেই রেজিস্ট্রি হচ্ছে। এ ছাড়া তিনি নামপত্তন রেকর্ড থাকার পরও, বহু পূর্বের পিট দলিল, এস.এ খতিয়ানের অনলাইন চাইবে, মৌজার নাম ভুল থাকলে বা মৌজার জে.এল নম্বর নিয়ে আর.এস পরচায় এক-রকম তো এস.এ পরচায় অন্যরকম থাকলেই রেজিস্ট্রি আটকে দেবে। কোনো জমিতে বাড়ি উল্লেখ থাকলে সেই জমির আংশিক বিক্রি করতে গেলেই তিনি বলেন ৬% উৎস কর দিতে হবে। আর গুটুদিয়া ইউনিয়নের কোনো জমি (প্লট বিবেচনায়) হলেই বলবে, ২% ভ্যাট দিতে হবে, তা-না হলে রেজিস্ট্রি বন্ধ। তা ছাড়া যত সমস্যাই বের হোক, তিনি বলবেন, ‘তপনের সঙ্গে আলোচনা কর।’
এ প্রসঙ্গে ডুমুরিয়া দলিল লেখক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন খান বলেন, সর্বশেষ জরিপ (আর.এস) হয়ে যাওয়ার পরও তিনি নেটের এস.এ পরচা, মূল-দলিল, নামের ভুল পেলে, ১০-২০ হাজার টাকা দিলে দলিল ছাড়ে। এ ছাড়া লাখে (জমির মূল্য) ৩-৪শ টাকা তো এমনিই নেয়।
দলিল লেখক সমিতির সভাপতি ফারুক খান বলেন, ডুমুরিয়ার ৭০ জন লেখকের কাছে আলাদা করে জিজ্ঞাসা করলে এই সাহেবের আসহনীয় দুর্নীতির কথা জানতে পারবেন। তিনি দলিলে কোনো না কোনো ভুল বের করে টাকা চাচ্ছে। এক-কথায় ডুমুরিয়ার রেকর্ডে এমন দুর্নীতিগ্রস্ত অফিসার আগে আর কখনো আসেনি।
খুলনা জেলা দলিল লেখক সমিতির সাবেক সভাপতি বাহাউদ্দিন খন্দকার বলেন, ডুমুরিয়ার সাব-রেজিস্ট্রারের কাছে যেকোনো দলিল নিয়ে গেলে তিনি যেকোনো পন্থায় সর্ব-নি¤œ ১০ হাজার টাকা নেবেন।
সাব-রেজিস্ট্রার মো. নাহিদুজ্জামান তার বিরুদ্ধে ওঠা সব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, এস.এ পরচা থেকে বর্তমান পর্যন্ত মালিকানার হিস্ট্রি যাচাই-বাছাই করেই দলিল করা আমার দায়িত্ব। কোনো কোনো সময় মানবিক সহায়তা করার ক্ষেত্রে কেউ কেউ ভুল বুঝতে পারে। তবে আমার বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ যথার্থ নয়।
ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ আল-আমিন বলেন, জনস্বার্থ বিঘিœত হচ্ছে এমন অভিযোগ পেলে আমরা যথাযথ ব্যবস্থা নেব। খুলনা জেলা রেজিস্ট্রার মো. মিজানুর রহমান বলেন, দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে আমরা আইনানুগ ব্যবস্থা নেব।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন