ছয় বছর পর কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ ও হল সংসদ নির্বাচন ঘিরে সরগরম ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইতিমধ্যে ১০টি প্যানেলের প্রতিদ্বন্দ্বীরা নির্বাচনের মাঠে জমজমাট প্রচারণা চালাচ্ছেন। প্যানেলের বাইরেও স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন অনেকেই। নির্বাচনে মোট প্রার্থীসংখ্যা ৪৭১ জন। সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্যানেল সাজালেও এবার কোনো প্যানেলেরই সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা কমই দেখেছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীরা। কারণ শিক্ষার্থীদের কাছে এবার প্যানেলের চেয়ে ব্যক্তিই ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়া আঞ্চলিকতা, হল ও কোন ডিপার্টমেন্টে পড়াশোনা করছেন, তা-ও ভোটের মাঠে প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন তারা।
গতকাল শুক্রবার সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও চতুর্থ দিনের মতো জোর প্রচারণা চালাচ্ছেন ডাকসুর প্রার্থীরা। সকালে ক্যাম্পাসে ঢিলেঢালা প্রচারণা থাকলেও বাদ জুমা গতি পায় বিভিন্ন পদে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রচারণা। বাদ জুমা হলে হলে প্রচারণা চালান প্রার্থীরা। এ সময় নানা প্রতিশ্রুতি দিতে দেখা যায় তাদের। ভোটারও তাদের প্রত্যাশার কথা জানাচ্ছেন ভোট চাইতে আসা প্রার্থীদের কাছে। ইশতেহারকে প্রেমিকার কাছে প্রেমিকের করা প্রতিশ্রুতি; যা মানুষ কখনোই বাস্তবায়ন করে না বলে দাবি করেছেন নির্বাচনের স্বতন্ত্র সহসাধারণ সম্পাদক (এজিএস) পদপ্রার্থী মহিউদ্দিন রনি।
এদিকে কোনো কোনো প্রার্থী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিয়ে দাবি জানান ভোটকেন্দ্র বাড়ানোর। আবার কোনো প্রার্থীর অভিযোগ সাইবার আক্রমণ নিয়ে। যারা সাইবার আক্রমণ চালাচ্ছে, তাদের রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করতে ব্যর্থ হচ্ছেন বলেও অভিযোগ করেন। গত কয়েক দিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শিক্ষার্থীর সঙ্গে আলাপ করে জানা যায়, জুলাই-পরবর্তী সময়ে রাজনীতিতে বড় পরিবর্তন এসেছে। কোনো দলেরই এবার একক আধিপত্য নেই ক্যাম্পাসে। তবে নির্বাচনে বড় যেসব প্যানেল অংশগ্রহণ করেছে তারা সবাই যোগ্য, মেধাবী ও শিক্ষার্থীবান্ধব প্রার্থী দেওয়ার চেষ্টা করেছে। প্রার্থী তালিকায় চমকও আনার চেষ্টা করেছেন অনেকে। তবে কোনো প্যানেলই এককভাবে হালে পানি পাচ্ছে না। তারা বলছেন, আমরা কোনো প্যানেল নয়, যাকে যোগ্য মনে করব তাকে ভোট দেব।
বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী সালমা ইসলাম বলেন, এবার যারা প্রার্থী হয়েছেন, তাদের অধিকাংশই ক্যাম্পাসের পরিচিত মুখ। বিগত দিনে তাদের অবস্থান আমরা দেখেছি। তাই কোনো একক প্যানেলকে নয়, যারা শিক্ষার্থীদের পাশে ছিলেন তাদের ভোট দেব।
একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলার শিক্ষার্থী তারেক খান বলেন, যারা নির্বাচন করছেন তাদের অধিকাংশই যোগ্য প্রার্থী। তবে কোনো প্যানেলকে এককভাবে নয়, আমার সব প্যানেল দেখে যারা অপেক্ষাকৃত যোগ্য, তাদের ভোট দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। সবাইকে যাচাই করছি।
বিশ্ববিদ্যালয়ের আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ভোটের মাঠে শুধু দল নয়, আঞ্চলিকতা, আবাসিক হল, কোন বিভাগে পড়াশোনা করেন তা-ও বড় ফ্যাক্টর। এবার শীর্ষ পদের মধ্যে ভিপি পদে নির্বাচন করছেন, ছাত্রদলের প্যানেল থেকে আবিদুল ইসলাম খান, শিবিরের প্যানেল থেকে সাদিক কায়েম, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদ ব্যানারে আব্দুল কাদের, স্বতন্ত্র শিক্ষার্থী ঐক্য ব্যানারে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক ও মুখপাত্র উমামা ফাতেমা, ছাত্র ইউনিয়ন একাংশসহ কয়েকটি বাম ছাত্রসংগঠনের প্যানেল প্রতিরোধ পর্ষদ ব্যানারে শেখ তাসনিম আফরোজ ইমি, ছাত্র অধিকার পরিষদের নেতৃত্বে ডাকসু ফর চেঞ্জ ব্যানারে বিন ইয়ামিন মোল্লা, ইসলামী ছাত্র আন্দোলনের সচেতন শিক্ষার্থী সংসদের ব্যানারে ইয়াসিন আরাফাত, সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদ ব্যানারে জামালুদ্দীন মুহাম্মদ খালিদ, ছাত্র ইউনিয়ন অপরাংশসহ কয়েকটি বাম ছাত্রসংগঠনের অপরাজেয় ৭১ অদম্য ২৪ ব্যানারে নাঈম হাসান।
এর মধ্যে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের আবিদুল ইসলাম খান, শিবিরের সাদিক কায়েম, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়ক আব্দুল কাদের, উমামা ফাতেমা ও ছাত্র অধিকার পরিষদের বিন ইয়ামিন মোল্লা। তবে আবিদুল ছাত্রদল ও সাদিক কায়েম শিবিরের প্রার্থী, বিন ইয়ামিন মোল্লা ছাত্র অধিকার পরিষদের হিসেবে পরিচিত হলেও কাদের ও উমামা বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের হিসেবেই সবার মাঝে পরিচিত। জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন ঐক্যবদ্ধ থাকলেও সম্প্রতি তাদের মধ্যে দেখা দিয়েছে মতবিরোধ।
ডাকসুতে আন্দোলনের সাবেক সমন্বয়করা ঐক্যবদ্ধভাবে প্রার্থী দিতে পারেননি। তিনটি আলাদা প্যানেল থেকে প্রার্থী হয়েছেন তারা। ফলে ছাত্রদল, ছাত্রশিবির ও গণঅধিকার পরিষদের বাইরে সাধারণ ভোটারদের ভোট বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় তাদের ভোটে জয়লাভ করা অনেকটা কষ্টকর হয়ে উঠেছে। অন্যদিকে ছাত্রদলের ক্যাম্পাসে অনেক ভোট থাকলেও এখনো তারা সেভাবে ভোটের মাঠে আওয়াজ তুলতে পারেনি। তবে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ছাত্রদলের আবিদুলের গ্রহণযোগ্যতা অনেক। আর শিবির ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বেশ সংগঠিত থাকলেও মুক্তিযুদ্ধ, নারীদের প্রতি বৈষম্যসহ নানা বিতর্ক তাদের পিছু ছাড়ছে না। অন্য প্রার্থীরা শিবিরকে নানাভাবে বিতর্কিত করার জন্য পুরোনো ইস্যুগুলো সামনে আনছেন। ছাত্র হলগুলোতেও তাদের খুব একটা প্রভাব নেই বলে দাবি সাধারণ শিক্ষার্থীদের। তারপরও শিবিরের প্রার্থীরা বিজয় তাদের ঘরে তোলার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করছেন। ২০১৯ সালের ডাকসু নির্বাচনে নানা প্রতিকূলতার মধ্যে ভিপি নির্বাচিত হয়েছিলেন নুরুল হক নুর। এর পর থেকে ডাকসুতে নুর ও তার দলের একটা প্রভাব রয়েছে। সেই প্রভাব কাজে লাগিয়ে ভোটের মাঠে প্রার্থীদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন বিন ইয়ামিন মোল্লা।
এদিকে ডাকসুতে সাধারণ সম্পাদক বা জিএস পদে অনেক প্রার্থী থাকলেও আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের শেখ তানভীর বারী হামীম, ছাত্রশিবিরের এস এম ফরহাদ, বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের আব্দুল কাদের, সমন্বিত শিক্ষার্থী সংসদের মো. মাহিন সরকার। এর বাইরে বাম ছাত্রসংগঠনগুলোর দুটি প্যানেল নির্বাচন করলেও আলোচনায় একমাত্র প্রতিরোধ পর্ষদ মেঘ মল্লার বসু।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কাদের ও মাহিন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময়ই সামনে আসেন। তাদের মধ্যে বিভক্তি হওয়ায় ভিপির মতো জিএসেও প্রভাব পড়বে। তবে নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার পর মাহিন সরকারকে এনসিপি থেকে বহিষ্কার করায় ভোটের মাঠে সাধারণ শিক্ষার্থীদের মধ্যে একটা সহমর্মিতা তৈরি হয়েছে। আর প্রগতিশীল সব আন্দোলনে সামনে থাকা মেঘ মল্লার বসুকে নিয়েও ভাবছেন অনেকে। হামীম-ফরহাদও দলের বাইরে নিজেদের পরিচিতিকে কাজে লাগিয়ে ভোটারদের মন জয় করার চেষ্টা করছেন। এ ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী আশিকুর রহমান প্রচারণায় নেমেই ভোটারদের মনোযোগ আকর্ষণ করলেও নানা কারণে তা ধরে রাখতে পারেননি।
এ ছাড়া এজিএস পদে আলোচনায় রয়েছেন ছাত্রদলের তানভীর আল হাদী মায়েদ, শিবিরের মহিউদ্দিন খান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র সংসদের আশরেফা খাতুন, বাগছাসের নেতা মো. হাসিবুল ইসলাম, মহিউদ্দিন রনিসহ কয়েকজন। এর বাইরেও অন্য পদগুলোতে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা আলোচনায় রয়েছেন।
আপনার ফেসবুক প্রোফাইল থেকে মতামত লিখুন