প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত শক্তি সঞ্চয় করছে এল নিনো। বিশ্বের বিভিন্ন আবহাওয়া সংস্থা, জলবায়ু গবেষক এবং আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, চলতি বছরের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে এটি আরও শক্তিশালী হয়ে ‘সুপার এল নিনো’ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে। এমনটি ঘটলে বিশ্বের বহু দেশে ভয়াবহ খরা, তীব্র তাপপ্রবাহ, আকস্মিক বন্যা, খাদ্য উৎপাদনে বিপর্যয় এবং পানির সংকট দেখা দিতে পারে। বাংলাদেশও এর সম্ভাব্য প্রভাবের বাইরে নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্তমানে পৃথিবী এমনিতেই বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে অস্বাভাবিক তাপমাত্রার মুখোমুখি। এর সঙ্গে শক্তিশালী এল নিনো যুক্ত হলে আবহাওয়ার চরম ঘটনাগুলো আরও ঘন ঘন এবং আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। অনেক গবেষক আশঙ্কা করছেন, এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে আগামী বছরগুলো ইতিহাসের সবচেয়ে উষ্ণ সময়ের মধ্যে স্থান পেতে পারে।
কী এই এল নিনো? এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্র, যা সাধারণত দুই থেকে সাত বছর অন্তর দেখা যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে প্রবাহিত বাণিজ্যিক বায়ু পূর্ব দিক থেকে পশ্চিম দিকে উষ্ণ পানি ঠেলে নিয়ে যায়। কিন্তু কোনো কারণে এই বায়ুপ্রবাহ দুর্বল হয়ে পড়লে উষ্ণ পানি মধ্য ও পূর্ব প্রশান্ত মহাসাগরে জমা হতে থাকে। ফলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় অনেক বেড়ে যায় এবং পৃথিবীর আবহাওয়াব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন শুরু হয়। এই পরিবর্তনের প্রভাব হাজার হাজার কিলোমিটার দূরের অঞ্চলগুলোতেও পৌঁছে যায়। কোথাও দীর্ঘস্থায়ী খরা, কোথাও অস্বাভাবিক বৃষ্টি, কোথাও তীব্র তাপপ্রবাহ কিংবা ভয়াবহ ঝড়ের সৃষ্টি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যখন সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে স্বাভাবিকের তুলনায় দুই ডিগ্রি বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। গত কয়েক দশকে এমন ঘটনা খুব কমবার ঘটেছে, কিন্তু প্রতিবারই তা বিশ্বজুড়ে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে।
রেকর্ড গড়ার পথে নতুন এল নিনো: আবহাওয়াবিদদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বর্তমানে প্রশান্ত মহাসাগরের বিভিন্ন অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক আন্তর্জাতিক পূর্বাভাস মডেল দেখাচ্ছে যে, চলতি বছরের শেষভাগে এল নিনো অত্যন্ত শক্তিশালী রূপ নিতে পারে। বিজ্ঞানীদের একাংশের মতে, এটি গত কয়েক দশকের অন্যতম শক্তিশালী এল নিনো হওয়ার বাস্তব সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কিছু পূর্বাভাসে এর তীব্রতা অতীতের স্মরণীয় শক্তিশালী ঘটনাগুলোর কাছাকাছি পৌঁছানোর ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। জলবায়ু গবেষকদের ভাষায়, এল নিনো একা যতটা ক্ষতি করতে পারে, বর্তমান বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তার প্রভাব কয়েকগুণ বেড়ে যেতে পারে। কারণ উষ্ণ বায়ুম-ল বেশি জলীয় বাষ্প ধারণ করে, ফলে অতিবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকি বাড়ে। আবার একই সঙ্গে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে গিয়ে খরা আরও ভয়াবহ রূপ নেয়।
বিশ্বজুড়ে কী ধরনের প্রভাব দেখা দিতে পারে: এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে ভিন্ন হয়। তবে সামগ্রিকভাবে এটি বিশ্বব্যাপী আবহাওয়ার ভারসাম্যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটায়। মধ্য আমেরিকা, আফ্রিকা, এশিয়া এবং অস্ট্রেলিয়ার বিস্তীর্ণ অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে গিয়ে খরা পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। নদী উপচে পড়া, ভূমিধস এবং ফসলের ব্যাপক ক্ষতির মতো পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ এবং শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে দাবানলের ঝুঁকিও বেড়ে যাবে। বনভূমি, জীববৈচিত্র্য এবং স্থানীয় অর্থনীতি এর ফলে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
খাদ্য নিরাপত্তা নিয়ে বাড়ছে উদ্বেগ : এল নিনোর সবচেয়ে বড় প্রভাবগুলোর একটি হলো খাদ্য উৎপাদনের ওপর এর আঘাত। কৃষি খাত সরাসরি আবহাওয়ার ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় খরা, অতিবৃষ্টি কিংবা অস্বাভাবিক তাপমাত্রা ফসল উৎপাদনকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। বিশ্বের বিভিন্ন কৃষিপ্রধান অঞ্চলে ধান, গম, ভুট্টা, ফলমূল এবং অন্যান্য খাদ্যশস্যের উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
আগাম প্রস্তুতিতে জাতিসংঘ : সম্ভাব্য পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জাতিসংঘ ইতোমধ্যেই আগাম প্রস্তুতির উদ্যোগ নিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো মনে করছে, দুর্যোগ ঘটার পর ত্রাণ দেওয়ার চেয়ে আগে থেকেই ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীকে সহায়তা করা বেশি কার্যকর। এই লক্ষ্যে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোতে কৃষি, খাদ্য নিরাপত্তা, পানি সংরক্ষণ এবং দুর্যোগ প্রস্তুতি কর্মসূচি জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কৃষকদের জন্য খরা ও বন্যা সহনশীল বীজ সরবরাহ, নগদ সহায়তা, পানি ব্যবস্থাপনা এবং আগাম সতর্কবার্তা প্রদানের পরিকল্পনাও রয়েছে। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর মতে, আগাম প্রস্তুতিতে বিনিয়োগ করলে দুর্যোগ-পরবর্তী ক্ষতির পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
বাংলাদেশে কী প্রভাব পড়তে পারে : বাংলাদেশে এল নিনোর প্রভাব নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে সতর্ক আশাবাদ দেখা যাচ্ছে। তাদের মতে, আতঙ্কিত হওয়ার প্রয়োজন নেই, তবে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখা জরুরি। আবহাওয়াবিদদের ধারণা, এল নিনোর কারণে দেশের কিছু অঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমে যেতে পারে এবং তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি থাকতে পারে। ফলে গ্রীষ্ম ও বর্ষা মৌসুমে তাপপ্রবাহের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে মৌসুমি বায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হলে কৃষি উৎপাদনেও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে বৃষ্টিনির্ভর কৃষি অঞ্চলগুলো ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ফলে এল নিনোর উপস্থিতি মানেই যে দেশে ভয়াবহ খরা হবে, এমন ধারণা সঠিক নয়। তবে তাপপ্রবাহ, স্বল্প বৃষ্টিপাত, আকস্মিক অতিবৃষ্টি, নদীর পানিপ্রবাহের পরিবর্তন এবং দক্ষিণাঞ্চলে লবণাক্ততা বৃদ্ধির মতো ঝুঁকিগুলোকে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন গবেষকেরা।
পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি : এল নিনোর আরেকটি বড় প্রভাব পড়ে সমুদ্র ও স্থলভাগের বাস্তুতন্ত্রে। সমুদ্রের তাপমাত্রা বেড়ে গেলে প্রবাল প্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ব্যাপক হারে প্রবাল বিবর্ণ হওয়ার ঘটনা ঘটে। মৎস্যসম্পদও ক্ষতির মুখে পড়ে। কারণ সমুদ্রের উষ্ণতা বৃদ্ধি খাদ্যশৃঙ্খলকে প্রভাবিত করে এবং মাছের স্বাভাবিক বিচরণ ও প্রজনন ব্যাহত হয়। ফলে উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর জীবিকাও ঝুঁকির মধ্যে পড়ে। অন্যদিকে দীর্ঘ খরা ও দাবানল বনজ সম্পদ এবং বন্যপ্রাণীর জন্যও বড় হুমকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
প্রস্তুতির এখনই সময় : বিজ্ঞানীরা বলছেন, এল নিনোর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। ফলে কয়েক মাস আগেই এর পূর্বাভাস পাওয়া সম্ভব হয়। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে সরকার, স্থানীয় প্রশাসন, কৃষি খাত এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো আগাম প্রস্তুতি নিতে পারে। পানি সংরক্ষণ, কৃষি পরিকল্পনা, খাদ্য মজুত, স্বাস্থ্যসেবা প্রস্তুতি এবং দুর্যোগ মোকাবিলা সক্ষমতা বাড়ানোর মতো পদক্ষেপ এখনই গ্রহণ করা প্রয়োজন।

