ইউরোপের আকাশে এখন শুধু রোদের ঝলকানি নয়, লুকিয়ে আছে এক গভীর অস্বস্তি। যে গ্রীষ্ম একসময় ছিল ছুটি, ভ্রমণ আর উৎসবের ঋতু, সেই গ্রীষ্মই এখন বহু মানুষের কাছে ভয়, ক্লান্তি ও অনিশ্চয়তার প্রতীক হয়ে উঠেছে। মহাদেশজুড়ে তীব্র তাপপ্রবাহ এমন এক পর্যায়ে পৌঁছেছে যে কোটি কোটি মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারছেন না। হাসপাতালগুলোতে বাড়ছে গরমজনিত অসুস্থতা, শহরগুলোতে ভেঙে পড়ছে জনজীবন, আর মৃত্যুর মিছিলও ক্রমেই দীর্ঘ হচ্ছে। আবহাওয়াবিদদের হিসাব বলছে, ইউরোপের অন্তত ১০ কোটির বেশি মানুষ ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঊর্ধ্বে তাপমাত্রার মুখোমুখি হয়েছেন। আবার ৩৮ কোটিরও বেশি মানুষ অনুভব করছেন ৩০ ডিগ্রির ওপরে তাপমাত্রা। অনেক অঞ্চলে পরিস্থিতি আফ্রিকার উষ্ণ মরুভূমি এলাকার সঙ্গেও পাল্লা দিচ্ছে।
স্পেনে চার দিনে দুই শতাধিক মৃত্যু : সবচেয়ে উদ্বেগজনক পরিস্থিতির একটি তৈরি হয়েছে স্পেনে। দেশটির সরকারি পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থার তথ্য অনুযায়ী, মাত্র চার দিনে তাপপ্রবাহের সঙ্গে সম্পর্কিত কারণে ২১২ জনের মৃত্যু হয়েছে। দেশটিতে জুন মাসেই গড় তাপমাত্রার একের পর এক রেকর্ড ভাঙছে। দিনের পাশাপাশি রাতের তাপমাত্রাও অস্বাভাবিকভাবে বেশি থাকায় মানুষ পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিতে পারছেন না।
ফ্রান্সে শিশুদের মৃত্যু, পার্কে রাত কাটাচ্ছে মানুষ : ফ্রান্সের পরিস্থিতিও কম ভয়াবহ নয়। দেশটির বহু এলাকায় সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। রাজধানী প্যারিসে তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রির সীমা অতিক্রম করেছে। তীব্র গরমে সবচেয়ে মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে কয়েকটি শিশুর মৃত্যু। পারিবারিক গাড়ির ভেতরে আটকে থাকা শিশুদের মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়েছে। গরমে গাড়ির অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কয়েক মিনিটের মধ্যেই প্রাণঘাতী পর্যায়ে পৌঁছে যায়। অন্যদিকে ঘরের ভেতরের গরম সহ্য করতে না পেরে বহু মানুষ পার্ক, খোলা মাঠ ও উন্মুক্ত স্থানে রাত কাটাতে বাধ্য হয়েছেন।
ইতালিতে মৃত্যু, বিদ্যুৎ সংকট ও পর্যটনে বিপর্যয় : ইতালিতেও দাবদাহ ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। বিভিন্ন অঞ্চলে গরমজনিত কারণে একাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। কৃষক, শ্রমিক ও গৃহহীন মানুষেরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে পড়েছেন। দেশটির কয়েকটি বড় শহরে সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করা হয়েছে। তাপমাত্রা ৪১ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত পৌঁছানোর আশঙ্কা রয়েছে। এই তাপপ্রবাহের প্রভাব পড়েছে পর্যটন খাতেও। বিখ্যাত জাদুঘর ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে দর্শনার্থী প্রবেশ সীমিত করা হয়েছে।
যুক্তরাজ্যেও বন্ধ স্কুল, রেকর্ড তাপমাত্রা : একসময় যাকে শীতল আবহাওয়ার দেশ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, সেই যুক্তরাজ্যও এখন তীব্র দাবদাহে কাঁপছে। দেশটির বহু এলাকায় তাপমাত্রা ৩৬ থেকে ৩৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। ফলে এক হাজারের বেশি স্কুল বন্ধ অথবা আগেভাগে ছুটি ঘোষণা করা হয়েছে।
কেন এত ভয়াবহ এই গরম? : আবহাওয়াবিদদের মতে, বর্তমান পরিস্থিতির পেছনে বড় ভূমিকা পালন করছে একটি বিশেষ আবহাওয়াগত অবস্থা, যার বাংলা অর্থ দাঁড়ায় ‘তাপ বলয়’।
জলবায়ু পরিবর্তনের স্পষ্ট ছাপ : বিশে^র জলবায়ুবিজ্ঞানীরা প্রায় একবাক্যে বলছেন, এই তাপপ্রবাহ কেবল স্বাভাবিক আবহাওয়ার ঘটনা নয়। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রত্যক্ষ সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কয়লা, তেল ও গ্যাস পোড়ানোর ফলে বায়ুম-লে বিপুল পরিমাণ তাপধারণকারী গ্যাস জমেছে। এর ফলে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা শিল্পযুগ-পূর্ব সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে।
সবচেয়ে ঝুঁকিতে কারা? : তীব্র গরম সবার জন্য অস্বস্তিকর হলেও কিছু মানুষের জন্য এটি প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি, দীর্ঘমেয়াদি রোগে আক্রান্ত মানুষ এবং গৃহহীন জনগোষ্ঠী সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন। পানিশূন্যতা, হিটস্ট্রোক, শ^াসকষ্ট এবং হৃদরোগের ঝুঁকি দ্রুত বেড়ে যায়। বৃদ্ধাশ্রমগুলোতে বিশেষ সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। অনেক জায়গায় বাসিন্দাদের নিয়মিত পানি, ফলের রস ও শীতল পরিবেশ নিশ্চিত করার চেষ্টা চলছে। চিকিৎসকেরা সতর্ক করেছেন, রাতের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেশি থাকলে শরীর পর্যাপ্ত বিশ্রাম পায় না। এতে মৃত্যুঝুঁকিও বাড়ে।
দাবানল, বিদ্যুৎ সংকট ও অর্থনৈতিক ক্ষতি : গরম শুধু মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর নয়, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপরও ভয়াবহ চাপ সৃষ্টি করছে। তাপমাত্রা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দাবানলের ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। বিভিন্ন দেশে বনাঞ্চলে আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় জরুরি প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহারের কারণে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা চাপের মুখে পড়েছে।
সামনে কী অপেক্ষা করছে? : আবহাওয়াবিদরা বলছেন, পশ্চিম ইউরোপের কিছু এলাকায় সাময়িক স্বস্তি ফিরলেও পূর্ব ইউরোপে গরম আরও বাড়তে পারে। একই সঙ্গে আকস্মিক বজ্রঝড়, শিলাবৃষ্টি ও বন্যার ঝুঁকিও রয়েছে। বিশ্বের দ্রুত উষ্ণ হয়ে ওঠা মহাদেশগুলোর মধ্যে ইউরোপ অন্যতম। তাই বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই তাপপ্রবাহ কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং ভবিষ্যতের একটি পূর্বাভাস। আজকের ইউরোপ যেন পুরো পৃথিবীর জন্য এক সতর্কবার্তা। শহর, অবকাঠামো, স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং জীবনধারাকে নতুন বাস্তবতার সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর প্রয়োজনীয়তা এখন আর ভবিষ্যতের বিষয় নয়, বর্তমানের জরুরি দাবি। কারণ পৃথিবী যত উষ্ণ হবে, তাপপ্রবাহও তত ঘন ঘন, দীর্ঘ এবং ভয়াবহ হয়ে উঠবে। আর সেই বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানবসভ্যতাকে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবেÑ সংকটের কারণ কমাবে, নাকি কেবল তার পরিণতি সহ্য করবে।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন