বিশ্বজুড়ে অভিবাসীদের ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ, উত্তেজনা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। উন্নত থেকে উন্নয়নশীলÑ বিভিন্ন দেশে অভিবাসনবিরোধী নীতি কঠোর হচ্ছে, বাড়ছে ধরপাকড়, সহিংসতা ও রাজনৈতিক প্রচার। অনেক দেশের সরকার অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক সংকট, উচ্চ বেকারত্ব ও নিরাপত্তা সমস্যার জন্য অভিবাসীদের দায়ী করছে। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠনগুলো সতর্ক করছে, এই প্রবণতা বিশ^ব্যাপী বিদ্বেষ ও বৈষম্যকে আরও উসকে দিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে কঠোর অভিযান : যুক্তরাষ্ট্রে অভিবাসনবিরোধী অভিযান নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্যাপক ধরপাকড়, অভিবাসীদের আটক এবং নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কর্মসূচি আরও বিস্তৃত হয়েছে। বিভিন্ন স্থানে ফেডারেল বাহিনীর অভিযানকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভও ছড়িয়ে পড়েছে। এসব অভিযানে হতাহতের ঘটনাও ঘটছে, যা নিয়ে মানবাধিকারকর্মী ও স্থানীয় নেতারা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। সমালোচকদের মতে, অনেক ক্ষেত্রেই কেবল অভিবাসন আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হচ্ছে।
যুক্তরাজ্যে উত্তেজনার কেন্দ্র বেলফাস্ট : উত্তর আয়ারল্যান্ডের বেলফাস্টে ছুরিকাঘাতের ঘটনাকে কেন্দ্র করে পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস হয়ে ওঠে। মুখোশধারী বিক্ষোভকারীরা ঘরবাড়ি ও যানবাহনে আগুন দেয়, বহু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হয়। রাজনৈতিক নেতারা ঘটনাটিকে জাতিগত বিদ্বেষপ্রসূত সহিংসতা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে সরকার জানিয়েছে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
লন্ডনে অভিবাসনবিরোধী সমাবেশ : লন্ডনেও বিশাল অভিবাসনবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে বিপুলসংখ্যক মানুষ অংশ নিয়ে অভিবাসন নিয়ন্ত্রণের দাবি জানান। সমাবেশের শেষদিকে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষে বহু মানুষ আটক হন এবং কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পাল্টা বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মানবাধিকারকর্মীরা বর্ণবাদ ও বিদ্বেষের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন।
দক্ষিণ আফ্রিকায় ভয়াবহ পরিস্থিতি : দক্ষিণ আফ্রিকায় অভিবাসীবিরোধী সহিংসতা সবচেয়ে উদ্বেগজনক রূপ নিয়েছে। বিদেশিদের ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা, লুটপাট ও ভয়ভীতির কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই এক লাখ ষাট হাজারের বেশি বিদেশি দেশটি ছেড়ে নিজ দেশে ফিরে গেছেন। অনেক বৈধ কাগজপত্রধারী অভিবাসীও নিরাপত্তাহীনতায় দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিদেশিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপের আহ্বান জানিয়েছে।
স্পেনে সামাজিক বিভাজন : স্পেনের তোরে পাচেকো শহরে এক বৃদ্ধের ওপর হামলার পর অভিবাসীদের লক্ষ্য করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারের পর সংঘর্ষ শুরু হয়। পুলিশ বহুজনকে আটক করেছে এবং উগ্র রাজনৈতিক গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা তদন্ত করছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসনকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করার প্রবণতাই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
লিবিয়ায় ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ : লিবিয়ার রাজধানীতে জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থার কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ করে অভিবাসীদের দেশ ছাড়ার দাবি জানানো হয়েছে। বিক্ষোভকারীরা অভিযোগ করেন, বিদেশিদের উপস্থিতি দেশের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও জাতিসংঘ এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছে, তাদের কোনো পুনর্বাসন কর্মসূচি সেখানে চালু নেই।
মালয়েশিয়ায় অব্যাহত ধরপাকড় : মালয়েশিয়ায় অবৈধ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে যৌথ অভিযান অব্যাহত রয়েছে। বিভিন্ন নির্মাণ প্রকল্প ও কর্মস্থলে অভিযান চালিয়ে বিপুলসংখ্যক বিদেশি নাগরিককে আটক করা হয়েছে, যাদের বড় অংশ বাংলাদেশি। বৈধ নথিপত্র না থাকা, নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান এবং অন্যান্য আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
রাজনীতিতে অভিবাসন ইস্যুর উত্থান : বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিবাসন প্রশ্ন এখন কেবল সামাজিক বা মানবিক বিষয় নয়; এটি বহু দেশে রাজনৈতিক কৌশলের অন্যতম হাতিয়ার হয়ে উঠেছে। অর্থনৈতিক মন্দা, কর্মসংস্থানের সংকট এবং জনঅসন্তোষের দায় অভিবাসীদের ওপর চাপিয়ে জনসমর্থন অর্জনের চেষ্টা করছে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তি। ফলে বিদ্বেষমূলক বক্তব্য, বিভ্রান্তিকর প্রচার এবং সামাজিক বিভাজন আরও তীব্র হচ্ছে।
মানবাধিকারের প্রশ্ন : মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দাবি, নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব হলেও সেই অজুহাতে কোনো জনগোষ্ঠীকে লক্ষ্যবস্তু বানানো গ্রহণযোগ্য নয়। বৈধ ও অবৈধ অভিবাসীদের মধ্যে পার্থক্য না করে পরিচালিত অভিযান বহু নিরপরাধ মানুষকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে। একই সঙ্গে বর্ণবাদ, বিদেশি বিদ্বেষ এবং ঘৃণামূলক প্রচার সামাজিক সম্প্রীতিকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
অনিশ্চয়তার মুখে কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ : বিশ্বজুড়ে কঠোর অভিবাসননীতি, সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ, ধরপাকড় এবং সহিংসতার ফলে লাখো মানুষের জীবন অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে। একদিকে নিরাপত্তা ও অর্থনৈতিক সংকটের অজুহাতে বিভিন্ন দেশ কঠোর অবস্থান নিচ্ছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো সতর্ক করছেÑ বিদ্বেষ ও বৈষম্যের এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে বৈশি^ক মানবিক সংকট আরও গভীর হতে পারে। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি মানবিক মূল্যবোধ, আইনের শাসন এবং আন্তর্জাতিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।

