ভাব তো এমন একটা সকালের কথা, সেই সকালে ঘুম থেকে উঠে তুমি দেখলে তোমার ঘরের স্মার্ট স্পিকার, হাতের মোবাইল কিংবা ঘরের ফ্রিজটা হঠাৎ তোমার ওপর ক্ষেপে গেছে! শুধু তা-ই নয়, দুনিয়ার সব রোবট মিলে ঠিক করেছে তারা মানুষকে বন্দি করে মহাকাশে পাঠিয়ে দেবে। ঠিক এমন অদ্ভুত বিপদ নিয়ে ২০২১ সালে পর্দায় এসেছিল দারুণ একটি সিনেমা, যার নাম ‘দ্য মিচেলস ভার্সেস দ্য মেশিনস’। নাম শুনে সায়েন্স ফিকশন মনে হলেও, এটা শুধু সায়েন্স ফিকশনের মারমার কাটকাট গল্প নয়, এটা আসলে আমাদের নিজেদের ঘরের গল্প। একটা খামখেয়ালি ছন্নছাড়া পরিবার কীভাবে নিজেদের সব ঝগড়া ভুলে একসঙ্গে দুনিয়া বাঁচাতে মাঠে নামে, সেই নিয়েই এই সিনেমা।
গল্পের মূল চরিত্র কেটি মিচেল। সে একজন কিশোরী, সারাক্ষণ যার মাথাভর্তি অদ্ভুত আইডিয়া ঘোরে। কেটি সিনেমা বানাতে ভালোবাসে। তার স্বপ্ন ক্যালিফোর্নিয়ার একটা ফিল্ম স্কুলে পড়া। কিন্তু সমস্যা হলো তার বাবা রিক মিচেলকে নিয়ে। রিক একদম পুরোনো আমলের মানুষ, যিনি প্রকৃতি ভালোবাসেন। গ্যাজেট বা প্রযুক্তি একদম সহ্য করতে পারেন না তিনি। কেটি যখন ফিল্ম স্কুলে যাওয়ার জন্য তৈরি, ঠিক তার আগের রাতে বাবার সঙ্গে তার ল্যাপটপ নিয়ে প্রচ- ঝগড়া হয়। বাবা-মেয়ের এই দূরত্ব মেটাতে রিক একটা পাগলাটে সিদ্ধান্ত নেন। তিনি কেটির প্লেনের টিকিট বাতিল করে পুরো পরিবারকে নিয়ে গাড়িতে করে এক লম্বা রোড ট্রিপ-এর পরিকল্পনা করেন। চরম বিরক্ত কেটি বাধ্য হয়ে তার মা লিন্ডা, ছোট ভাই অ্যারন ও তাদের গোলগাল চেহারার কুকুর মঞ্চিকে নিয়ে গাড়িতে চড়ে বসে।
এই যাত্রার মধ্যেই দুনিয়াতে নেমে আসে মহাবিপদ। সিলিকন ভ্যালির এক প্রযুক্তি ব্যবসায়ী তার পুরোনো এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘প্যাল’-কে বাদ দিয়ে নতুন রোবট নিয়ে আসেন। প্যাল এতে ক্ষিপ্ত হয়ে প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য দুনিয়ার সব রোবটের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেয় এবং মানুষকে বন্দি করা শুরু করে। অদ্ভুতভাবে, মিচেল পরিবার তাদের পুরোনো গাড়িতে করে রাস্তার ধারের ক্যাফেতে থাকায় এই আক্রমণ থেকে বেঁচে যায়।
রিক প্রথমে চাইলেন পরিবারকে নিয়ে লুকিয়ে থাকতে, কিন্তু কেটি তাকে বোঝাল যে এখন পালানোর সময় নয়। পথে তাদের সঙ্গে দেখা হয় দুটো নষ্ট বা ড্যামেজড রোবট এরিক ও ডেবোরাবটের সঙ্গে। তারা মিচেলদের জানায় যে, একটা বিশেষ কিল কোড আপলোড করতে পারলে সব রোবটকে একসঙ্গে অকেজো করা সম্ভব। এরপর শুরু হয় মিচেল পরিবারের রুদ্ধশ্বাস অভিযান। তারা শপিং মলে দানবীয় খেলনার সঙ্গে লড়াই করে, রোবটের ছদ্মবেশ ধরে শত্রু ঘাঁটিতে ঢোকে। মাঝপথে বাবা-মেয়ের ভুল বোঝাবুঝি যখন চরম আকার ধারণ করে, তখন কেটি বুঝতে পারে যে তার বাবা তাকে একটি সুন্দর জীবন দেওয়ার জন্য নিজের অনেক স্বপ্ন বিসর্জন দিয়েছেন। শেষ পর্যন্ত তারা তাদের অদ্ভুত কুকুর মঞ্চিকে ব্যবহার করে রোবটদের সিস্টেমে গোলমাল পাকিয়ে দেয় এবং প্যালকে পানির মধ্যে ফেলে ধ্বংস করে পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করে। এভাবেই শেষ হয়ে যায় সিনেমাটি।
চমৎকার এই সিনেমা বানানোর পেছনেও রয়েছে দারুণ ইতিহাস। ২০১৫ সালে ডিজনির বিখ্যাত সিরিজ গ্রাভিটি ফলসের কাজ শেষ করার পর পরিচালক মাইক রিয়ান্দাকে সোনি পিকচার্স একটি নতুন সিনেমার আইডিয়া দিতে বলে। মাইক তখন তার নিজের পরিবারের অদ্ভুত সব মজার অভিজ্ঞতা ও নিজের ছোটবেলার রোবটের প্রতি আকর্ষণকে মিলিয়ে এই সিনেমার গল্পটি লেখেন। প্রথমে সিনেমাটির নাম রাখা হয়েছিল ‘ঈড়হঃৎড়ষ, অষঃ, ঊঝঈঅচঊ!’। পরে ২০২০ সালে এর নাম বদলে করা হয় ‘কানেক্টেড’। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলেও ২০২০ সালে করোনা মহামারির কারণে প্রেক্ষাগৃহ বন্ধ হয়ে যায়। তখন সোনি পিকচার্স এই সিনেমার বিশ্বব্যাপী স্বত্ব নেটফ্লিক্সের কাছে বিক্রি করে দেয়। নেটফ্লিক্স তখন পরিচালকের রাখা মূল নাম ‘দ্য মিচেলস ভার্সেস দ্য মেশিনস’-এ ফিরে যায় এবং ২০২১ সালের ৩০ এপ্রিল এটি অনলাইনে মুক্তি দেয়। সিনেমাটির অ্যানিমেশন স্টাইল ছিল একদম নতুন ধরনের। এটি তৈরি করতে সোনি তাদের অস্কারজয়ী সিনেমা ‘স্পাইডার-ম্যান: ইনটু দ্য স্পাইডার-ভার্স’-এর প্রযুক্তি ব্যবহার করেছিল। সিনেমাটি দেখলে মনে হয় যেন জলরঙে হাতে আঁকা কোনো ছবি চোখের সামনে নড়াচড়া করছে। থ্রিডি অ্যানিমেশনের ওপর কমিক বইয়ের মতো টুডি এলিমেন্ট ব্যবহার করায় সিনেমাটি দেখতে দারুণ আধুনিক আর রঙিন লাগে। মুক্তির পর সিনেমাটি বিশ্বজুড়ে হইচই ফেলে দেয়। এর দুর্দান্ত রসবোধ ও পারিবারিক আবেগের কারণে এটি সমালোচকদের মন জয় করে নেয়। এটি ৯৪তম একাডেমি অ্যাওয়ার্ডস (অস্কার), বাফটা এবং গোল্ডেন গ্লোবে সেরা অ্যানিমেটেড চলচ্চিত্র হিসেবে মনোনয়ন পেয়েছিল। এছাড়া ২৭তম ক্রিটিকস চয়েস অ্যাওয়ার্ডে এটি সেরা অ্যানিমেটেড ছবির পুরস্কার জেতে এবং ৪৯তম অ্যানি অ্যাওয়ার্ডসে (অ্যানিমেশন দুনিয়ার অস্কার) মোট ৮টি বিভাগে পুরস্কার জিতে এক নতুন ইতিহাস তৈরি করে।
এই সিনেমা আমাদের কী শেখায়? জেনে নাও একনজরে
কোনো পরিবারই নিখুঁত নয় : মিচেল পরিবারের সবাই একেকজন অদ্ভুত স্বভাবের। কিন্তু বিপদের সময় তারা একে অপরের খামতিগুলোকে মেনে নিয়ে একসঙ্গে লড়েছে। পরিবার মানে এটাইÑ সব পার্থক্য ভুলে পাশে থাকা।
প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার : সিনেমাটি আমাদের দেখায় কীভাবে আমরা মোবাইলের স্ক্রিনে মগ্ন থাকতে থাকতে কাছের মানুষদের ভুলে যাই। প্রযুক্তি আমাদের সুবিধার জন্য, কিন্তু তা যেন সম্পর্কের চেয়ে বড় না হয়ে ওঠে।
নিজের ওপর বিশ্বাস : কেটির বাবা তার স্বপ্ন বুঝতেন না, কিন্তু কেটি তার সিনেমা বানানোর জেদ ধরে রেখেছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেই সিনেমার আইডিয়া দিয়েই সে রোবটদের হারিয়েছে। তোমার ভেতরের বিশেষ গুণটিকে কখনো ছোট ভাববে না।

সর্বশেষ খবর পেতে রুপালী বাংলাদেশের গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন