× UCB Sticker Card
বৃহস্পতিবার, ০৪ জুন, ২০২৬

ফেসবুক


ইউটিউব


টিকটক

Rupali Bangladesh

ইনস্টাগ্রাম

Rupali Bangladesh

এক্স

Rupali Bangladesh


লিংকডইন

Rupali Bangladesh

পিন্টারেস্ট

Rupali Bangladesh

গুগল নিউজ

Rupali Bangladesh


হোয়াটস অ্যাপ

Rupali Bangladesh

টেলিগ্রাম

Rupali Bangladesh

মেসেঞ্জার গ্রুপ

Rupali Bangladesh


En Bn

ফারহানা খান

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

নীলপরী ও সুবাহা

ফারহানা খান

প্রকাশিত: মে ১৯, ২০২৬, ০৬:০৪ এএম

নীলপরী ও সুবাহা

ছোট্ট একটা মেয়ে সুবাহা। বয়স সাত কি আট। বাবা-মায়ের সঙ্গে শহরের একপ্রান্তে ছোট্ট একটা ফ্ল্যাটে থাকে সে। বাবা সকালবেলা অফিসে যান, মা-ও স্কুলে পড়ান। তাই দিনের বেশিরভাগ সময় সুবাহাকে থাকতে হয় তাদের সাহায্যকারী রুবী খালার সঙ্গে।

রুবী খালা খুব ভালো মানুষ। সুবাহাকে গল্প শোনান, চুল বেঁধে দেন, মজার মজার খাবার বানিয়ে দেন। কিন্তু একটা সমস্যা আছে- রুবী খালা দুপুর হলেই ঘুমিয়ে পড়েন। আর তখন পুরো বাসাটা যেন হঠাৎ চুপচাপ হয়ে যায়। দুপুরের সেই নিস্তব্ধতা সুবাহার একদম ভালো লাগে না। বাইরে রোদের ঝিলিক, দূরে কাকের ডাক, কোথাও কোনো বাচ্চা নেই যে খেলবে। সুবাহা একা একা কখনো আঁকিবুকি কাটে, কখনো পুতুল নিয়ে খেলে। কিন্তু তবুও সময় যেন কাটতেই চায় না।

তেমনি এক শীতের দুপুরে সুবাহা বারান্দা পেরিয়ে ঘরের পাশের ছোট্ট ফুলের বাগানে গেল। বাগানটা তার খুব প্রিয়। সেখানে গাঁদা ফুল ফুটেছে গোল গোল করে, ডালিয়া রং ছড়িয়েছে, পিটুনিয়া হেসে উঠেছে নরম বাতাসে। শিশিরভেজা পাতাগুলো রোদের আলোয় চকচক করছিল।

সুবাহা ভাবল, কয়েকটা ফুল তুলে মালা গাঁথবে।

এমন সময় একটা অদ্ভুত সুন্দর ফুল তার চোখে পড়ল। ফুলটা অন্যসব ফুলের মতো নয়। তার পাপড়িগুলো নীলচে রঙের, যেন আকাশের টুকরো দিয়ে বানানো। মাঝখানে ছোট্ট রুপালি আলো জ্বলছে।

সুবাহা মুগ্ধ হয়ে হাত বাড়াল।

ঠিক তখনই ফুলটা কাঁপতে কাঁপতে বলে উঠলÑ

-আমায় ছিঁড় না!

সুবাহা চমকে দুই পা পিছিয়ে গেল। তার বুক ধুকপুক করতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সাহস করে সে বললÑ

- তুমি... তুমি কথা বলতে পার?

ফুলটা মৃদু হেসে বলল-

- পারি তো।

- ফুল আবার কথা বলে নাকি?

- সব ফুল বলে না। তবে কিছু কিছু ফুল পারে।

সুবাহার ভয় ধীরে ধীরে কৌতূহলে বদলে গেল।

সে কাছে এসে ফিসফিস করে বললÑ

- তুমি কে?

ফুলটা হালকা দুলে উঠল। তারপর এক ঝলক নীল আলো ছড়িয়ে ফুলটার ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো একটা ছোট্ট পরী!

পরীটার পিঠে স্বচ্ছ ডানা, মাথাভরা নীল চুল, আর গায়ে আকাশি রঙের পোশাক। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল যেন সন্ধ্যার আকাশের একটা তারা হঠাৎ মাটিতে নেমে এসেছে।

সুবাহা অবাক হয়ে হাঁ করে তাকিয়ে রইলো।

পরীটা হেসে বললÑ

- আমি নীলপরী।

- তুমি সত্যি সত্যি পরী?

- হ্যাঁ।

- তুমি ফুলের ভেতরে থাক?

- এই ফুলটা আমার ঘর।

সুবাহা আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল।

- আমি কখনো সত্যিকারের পরী দেখিনি!

নীলপরী একটু ঘুরে বাতাসে ভেসে বললÑ

- মানুষ সাধারণত আমাদের দেখতে পায় না। কিন্তু যাদের মন খুব সুন্দর, যারা ফুল-পাতা-প্রকৃতিকে ভালোবাসে, শুধু তারাই দেখতে পায়।

সুবাহা খুশিতে লজ্জা পেল।

তারপর দুজনে গল্প করতে লাগল।

নীলপরী তাকে বললÑ ফুলদের কথা, প্রজাপতিদের কথা, শিশিরের কথা। সে বলল, রাত হলে নাকি ফুলেরা আস্তে আস্তে গান গায়। ভোরবেলায় বাতাস এসে সেই গান নিয়ে যায় আকাশে।

সুবাহা বিস্ময়ে চোখ বড় বড় করে শুনতে লাগল।

এরপর থেকে রোজ দুপুরে রুবী খালা ঘুমিয়ে পড়লে সুবাহা বাগানে চলে আসে। আর নীলপরীর সঙ্গে গল্প করে।

কখনো তারা পিঁপড়েদের সারি দেখে। কখনো প্রজাপতির পেছনে দৌড়ায়। কখনো নীলপরী আকাশে উড়ে ফুলের রেণু এনে সুবাহার হাতে দেয়।

একদিন সুবাহা বলল-

- নীলপরী, তুমি কি সবসময় এখানেই থাকবে?

পরীটা চুপ করে গেল।

তারপর ধীরে বলল-

- না।

- কেন?

- শীত শেষ হলে আমাকে চলে যেতে হবে।

সুবাহার মন খারাপ হয়ে গেল।

- কোথায় যাবে?

- নীল পাহাড়ের ওপারে। সেখানে পরীদের রাজ্য।

- আমাকেও নিয়ে যাবে?

নীলপরী মৃদু হেসে মাথা নাড়লো।

- মানুষ সেখানে যেতে পারে না।

সুবাহা ঠোঁট ফুলিয়ে বসে রইলো।

পরীটা কাছে এসে বলল-

- মন খারাপ কর না। বন্ধুত্ব দূরে গেলেও শেষ হয় না।

সেদিন রাতে সুবাহা অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারলো না। সে ভাবতে লাগলো, নীলপরী যদি সত্যিই চলে যায়? পরদিন দুপুরে সে বাগানে গিয়ে দেখলো নীলপরী খুব চিন্তিত মুখে বসে আছে।

- কি হয়েছে?

নীলপরী বলল-

- বিপদ হয়েছে।

- কীসের বিপদ?

- আমাদের বাগানের জাদু শুকিয়ে যাচ্ছে।

সুবাহা ভয় পেয়ে গেল।

- তাহলে?

-যদি জাদু পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়, সব ফুল শুকিয়ে যাবে। প্রজাপতিরা আসবে না। আমি-ও আর এখানে থাকতে পারব না।

সুবাহার চোখে পানি চলে এলো।

- এখন কী হবে?

নীলপরী বললÑ

- একটা উপায় আছে।

- কি উপায়?

- এই বাগানের সবচেয়ে পুরোনো গাছটার নিচে একটা বোতলে জাদুর শিশির লুকানো আছে। সেটা এনে দিতে পারলে বাগান বাঁচবে।

সুবাহা চারদিকে তাকালো।

বাগানের এক কোণে একটা পুরোনো কাঠগোলাপ গাছ দাঁড়িয়ে আছে। তার ডালগুলো মোটা আর ছায়াগুলো ঘন। কিন্তু জায়গাটা একটু অন্ধকার।

সুবাহার একটু ভয় লাগলো।

নীলপরী বলল-

- তুমি পারবে?

সুবাহা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো।

তারপর সাহস করে বলল-

- পারব!

সে ধীরে ধীরে গাছটার দিকে এগিয়ে গেল।

চারপাশে বাতাস কেমন যেন ঠান্ডা হয়ে উঠল। শুকনো পাতার মচমচ শব্দ হচ্ছিল পায়ের নিচে।

গাছটার কাছে গিয়ে সে দেখলো মাটির ওপর ছোট্ট একটা গর্ত।

সেখানে নীলচে আলো জ্বলছে।

সুবাহা হাত ঢুকিয়ে টেনে বের করল একটা কাঁচের শিশি। ভেতরে রুপালি শিশিরের মতো কিছু চকচক করছে।

ঠিক তখনই হঠাৎ ঝোড়ো বাতাস বইতে শুরু করল। গাছের ডালগুলো দুলে উঠল। সুবাহা ভয় পেয়ে গেলেও শক্ত করে শিশিটা ধরে রাখল।

দৌড়ে এসে সে নীলপরীর হাতে বোতলটা দিল।

নীলপরী খুশিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল।

- তুমি পেরেছো!

তারপর সে শিশিরগুলো ফুলের ওপর ছিটিয়ে দিল।

মুহূর্তেই পুরো বাগানে নীল আলো ছড়িয়ে পড়ল।

শুকিয়ে যাওয়া পাতাগুলো আবার সবুজ হয়ে উঠল। ফুলগুলো মাথা তুলে দাঁড়ালো। কোথা থেকে ঝাঁকে ঝাঁকে প্রজাপতি উড়ে এলো। বাতাসে মিষ্টি গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল।

সুবাহা মুগ্ধ হয়ে চারদিকে তাকিয়ে রইলো।

নীলপরী বলল-

-আজ তুমি শুধু একটা বাগান নয়, অনেক ছোট ছোট প্রাণকে বাঁচিয়েছ।

সুবাহা লাজুক হেসে বলল-

- আমি তো শুধু তোমার বন্ধু।

পরীটা মৃদু হেসে তার কপালে হাত রাখল।

তারপর বলল-

- সত্যিকারের বন্ধুরাই পৃথিবীকে সুন্দর রাখে।

দিনগুলো আবার আনন্দে কাটতে লাগল।

কিন্তু ধীরে ধীরে শীত শেষ হয়ে এলো।

একদিন দুপুরে সুবাহা বাগানে গিয়ে দেখলো নীলপরী চুপচাপ আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।

সুবাহার বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল।

- তুমি কি আজ চলে যাবে?

নীলপরী ধীরে মাথা নেড়ে বলল-

- হ্যাঁ।

সুবাহার চোখ ভিজে গেল।

- তুমি গেলে আমি একা হয়ে যাব।

পরীটা কাছে এসে বলল-

- একা কেন হবে? ফুলেরা থাকবে, বাতাস থাকবে, আকাশ থাকবে। আর আমি... আমি তোমার মনেই থাকব।

- তুমি আবার আসবে?

- যদি তুমি ফুল ভালোবাস, গাছের যতœ নাও, আর মনটা সুন্দর রাখ- তাহলে একদিন আবার দেখা হবে।

সুবাহা কাঁদতে কাঁদতে বলল-

- কথা দাও।

নীলপরী তার ছোট্ট আঙুল বাড়িয়ে দিল।

- কথা দিলাম।

সুবাহাও আঙুল ছুঁইয়ে দিল।

তারপর নীলপরীর চারপাশে নীল আলো জ্বলতে শুরু করল। ধীরে ধীরে সে উপরে উঠতে লাগল। তার ডানাগুলো রোদের আলোয় চিকচিক করছিল। একসময় সে আকাশের নীলের মধ্যে মিলিয়ে গেল।

সুবাহা অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো।

তারপর হঠাৎ সে লক্ষ্য করল-

সেই নীল ফুলটা এখনো বাগানে ফুটে আছে।

হালকা বাতাসে ফুলটা দুলছে।

আর খুব আস্তে আস্তে যেন বলছে-

- আবার দেখা হবে, সুবাহা...

 

রূপালী বাংলাদেশ

Link copied!